Published : 15 May 2026, 12:57 PM
মার্কিন সরকার প্রায় ১০টি চীনা কোম্পানিকে এনভিডিয়ার শক্তিশালী এআই চিপ কেনার অনুমতি দিলেও বাস্তবে তার একটিও এখনো চীনে পৌঁছায়নি।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, বড় মাপের এ প্রযুক্তি চুক্তিটি বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। আর এমন এক সংকটময় মুহূর্তে কার্যকর সমাধানের আশায় এ সপ্তাহে চীনে পৌঁছেছেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং।
হোয়াইট হাউজের প্রাথমিক প্রতিনিধি দলে জেনসেন হুয়াংয়ের নাম ছিল না। তবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আমন্ত্রণে তিনি এই সফরে সঙ্গী হন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পথে ট্রাম্প আলাস্কা থেকে হুয়াংকে নিজের উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে তুলে নিয়েছেন। এ বিশেষ উদ্যোগের পর ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ‘এইচ২০০’ চিপ বিক্রির পথ এবার হয়ত সুগম হতে যাচ্ছে।
পুরো ঘটনাটি এমন এক সত্যকে সামনে এনেছে, যেখানে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত লড়াই এখন এতটাই তীব্র যে, সরকারিভাবে অনুমোদিত বাণিজ্যও এর কবলে পড়ে থমকে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে দামী চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি এখন দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার আগে চীনের উন্নত চিপ বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল এনভিডিয়ার দখলে। একসময় তাদের মোট আয়ের ১৩ শতাংশই আসত চীন থেকে।
হুয়াংয়ের ধারণা অনুসারে, এ বছর কেবল চীনের এআই চিপের বাজারই হতে পারত প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইটড্যান্স ও জেডি ডটকম’সহ প্রায় ১০টি চীনা কোম্পানিকে এনভিডিয়ার ‘এইচ২০০’ চিপ কেনার অনুমতি দিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ।
পাশাপাশি লেনোভো ও ফক্সকন’সহ হাতেগোনা কয়েকটি উৎপাদক কোম্পানিকেও এ চিপ সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শর্ত অনুসারে, অনুমোদিত ক্রেতারা সরাসরি এনভিডিয়া থেকে বা এসব মধ্যস্থতাকারী কোম্পানির মাধ্যমে চিপ কিনতে পারবেন। লাইসেন্সের শর্ত মেনে প্রতিটি কোম্পানি সর্বোচ্চ ৭৫ হাজারটি পর্যন্ত চিপ কেনার সুযোগ পাবে।
এর আগে, জনপ্রিয় এ এআই চিপ কেনার জন্য অনুমোদিত ক্রেতাদের নাম ও এনভিডিয়া বা উৎপাদকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরন সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তদারকির দায়িত্বে থাকা মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়। একইভাবে চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে লেনোভো এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, “এনভিডিয়ার রপ্তানি লাইসেন্সের আওতায় চীনে এইচ২০০ চিপ বিক্রির অনুমোদন পাওয়া কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে তারাও একটি।”
অন্যদিকে, এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এনভিডিয়া, আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইটড্যান্স, জেডি ডটকম ও ফক্সকন।
বৃহস্পতিবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুয়াং বলেছেন, বেইজিংয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাদের সুসম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে সহায়ক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চিপ বিক্রি সম্ভব হয়নি।
একটি সূত্র বলেছে, চীন সরকারের দিক থেকে বিশেষ নির্দেশনা আসার পর দেশটির বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এই চিপ কেনা থেকে পিছিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু নীতিগত পরিবর্তনের কারণে চীনের এ অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। তবে সেই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট ধরন সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।
বেইজিংয়ের আরেকটি সূত্র বলেছে, চিপ কেনার অর্ডারগুলো আটকে দেওয়ার বা কঠোরভাবে যাচাইয়ের জন্য বর্তমানে সরকারের ওপর প্রবল চাপ রয়েছে।
গেল মাসে এক সিনেট শুনানিতে একই সুর মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বলেছেন, “চীন সরকার তাদের বিভিন্ন কোম্পানিকে এখনও এসব চিপ কিনতে দিচ্ছে না। কারণ তারা তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিশিল্পে ধরে রাখতে চাইছে।”
বেইজিংয়ের এ সিদ্ধান্ত তাদের কৌশলগত এক হিসাবেরই অংশ। তারা আশঙ্কা করছে, বিদেশি চিপ আমদানি করলে তাদের নিজেদের এআই চিপ তৈরির প্রচেষ্টায় ভাটা পড়তে পারে।
চীনের স্থানীয় এআই চিপগুলো এখনও এনভিডিয়ার তুলনায় পিছিয়ে আছে। যদিও ডিপসিকের মতো কোম্পানিগুলো এখন হুয়াওয়ের মতো দেশীয় কোম্পানির তৈরি চিপের ওপর তাদের নির্ভরতার কথা জোর দিয়ে প্রচার করছে।
হুয়াওয়ের দিকে এই ঝুঁকে পড়া চীনের বাজারে এনভিডিয়ার টালমাটাল অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
এরইমধ্যে হুয়াং সতর্ক করে বলেছেন, বাজারে তাদের অবস্থানকে ধ্বংস করছে যুক্তরাষ্ট্রের এ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি। চীনের এআই এক্সিলারেটর বাজারে এনভিডিয়ার পার্টনারশিপ বর্তমানে কার্যকরভাবে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
জটিল শর্ত ও বাণিজ্যের পথে বাধা
চিপ বিক্রির এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পথে উভয় দেশের পক্ষ থেকেই নানাবিধ কঠিন শর্ত ও আইনি মারপ্যাঁচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানুয়ারিতে জারি করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম অনুসারে, চীনা ক্রেতাদের প্রমাণ করতে হবে, তাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ রয়েছে এবং তারা এসব চিপ কোনোভাবেই সামরিক কাজে ব্যবহার করবে না। একইসঙ্গে, এনভিডিয়াকেও নিশ্চিত করতে হবে, তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে এ চিপের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন এক বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে এ চিপ বিক্রির আয়ের ২৫ শতাংশ পাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যেহেতু মার্কিন আইন অনুসারে সরাসরি রপ্তানি শুল্ক বা ফি আরোপ করা কঠিন। ফলে এ নিয়মটি কার্যকর করতে চিপগুলোকে প্রথমে মার্কিন ভূখণ্ডে নিতে হবে এবং সেখান থেকে চীনে পাঠাতে হবে।
তবে এ নতুন ব্যবস্থা বেইজিংয়ের মনে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে। এ প্রক্রিয়াটি কেবল আইনি জটিলতা এড়ানোর কৌশল হিসেবে দাবি করা হলেও চীন সরকারের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ফলে এসব চিপে কোনো গোপন দুর্বলতা বা কারিগরি পরিবর্তন ঘটানো হতে পারে।
চতুর্থ সূত্র বলেছে, চীনের ‘স্টেট কাউন্সিল’ সম্প্রতি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে দুটি নতুন নিয়ম জারি করায় নজরদারি আরও কঠোর করা হয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে বিদেশি নির্ভরশীলতা চিহ্নিত করে তা পুরোপুরি দূর করার জন্য চীনা সরকার দেশজুড়ে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে।
চিপ সরবরাহে এ দীর্ঘসূত্রতাকে ওয়াশিংটনের চীন-বিরোধী কট্টরপন্থীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, এ চিপ বিক্রির ফলে চীনারা মার্কিন চিপ উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তবে সমালোচকরা এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর চীন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ক্রিস ম্যাকগুয়ার বলেছেন, “এনভিডিয়াকে চীনে আরও চিপ বিক্রির অনুমতি দেওয়ার মানে, মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানির জন্য চিপের সরবরাহ কমে যাওয়া ও এআইয়ের দৌড়ে চীনের তুলনায় আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব কমে আসা।
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বারবার আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের চেয়ে এনভিডিয়ার ব্যবসায়িক লাভকে প্রাধান্য দিতে রাজি করানো হচ্ছে, বিষয়টি বিস্ময়কর।”
আরও পড়ুন…