Published : 03 Sep 2026, 05:35 PM
দক্ষিণ চিলির ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মনতে ভার্দে’তে প্রাচীন মানুষের পা রাখার সময়কাল নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বৈজ্ঞানিক দ্বিমত। অঞ্চলটি প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগের পুরানো বলে দীর্ঘদিন ধরে জানা গেলেও সম্প্রতি এক গবেষণায় সেটাকে সাম্প্রতিককালের বলে দাবি করা হয়।
তবে মূল গবেষণা দল সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে প্রত্নস্থলটির প্রাচীনত্বের পক্ষেই শক্ত যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেছে, যা আমেরিকায় মানব জাতির প্রথম আগমন ও বসতি গড়ার ইতিহাস অনুধাবনে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
দক্ষিণ চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দূরে নদী উপত্যকায় অবস্থিত প্রত্নস্থলটি ১৯৭০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঘোষণা হয়, প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের পদচারণা ছিল। এ আবিষ্কারের পর আমেরিকা অঞ্চলে মানুষের পা রাখার প্রচলিত ধারণার চেয়েও অনেক আগের ইতিহাসের ইঙ্গিত মেলে।
তবে, এ বছরের মার্চে ভিন্ন পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত এক গবেষণা সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। নতুন গবেষণার গবেষকদের দাবি, মনতে ভার্দে প্রত্নস্থলটির বয়স আসলে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে।
এবার বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘প্যালিওআমেরিকা’-তে প্রকাশ পাওয়া আলাদা দুটি বিশ্লেষণে ভিন্ন দুই গবেষক দল দাবি করেছে, আগের বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশ পাওয়া সেই গবেষণাটিতে মৌলিক কিছু গুরুতর ভুল রয়েছে।
তবে, ১৯৭০-এর দশক থেকে মনতে ভার্দে নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করা ‘ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি’র নৃবিজ্ঞানী টম ডিলেহে বলেছেন, “ওই স্থান সম্পর্কে মূল ভূ-তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যে ভুল ছিল তারা তা প্রমাণ করতে পারেনি।”
অন্যদিকে, মনতে ভার্দেকে অনেক পরের বলে দাবি করা গবেষণার মূল লেখক ও ‘ইউনভার্সিটি অফ ওয়াইওমিং’-এর প্রত্নতাত্ত্বিক টড সুরোভেল নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেছেন, “আমি আমাদের গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফলের প্রতি এখন পূর্ণ আস্থা রাখছি।”
সুরোভেলের এ দাবি সঠিক প্রমাণিত হলে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের প্রথম ছড়িয়ে পড়ার সময়কাল নির্ধারণে মনতে ভার্দে’র গুরুত্ব হারিয়ে যাবে।
কারণ, মনতে ভার্দেকে ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগের পুরানো ধরা হলে তা উত্তর আমেরিকার বরফে ঢাকা অঞ্চলগুলোর ঠিক দক্ষিণে পাওয়া অন্যান্য প্রাচীন বসতিগুলোর চেয়ে অন্তত দেড় হাজার বছর আগের হয়ে দাঁড়ায়।
সেই বরফযুগের বিভিন্ন বসতিকে উত্তর আমেরিকার ‘ক্লোভিস সংস্কৃতি’র সঙ্গে যোগ করা হয়, যার নামকরণ হয়েছিল নিউ মেক্সিকোর এক এলাকার নামানুসারে।
যেহেতু মনতে ভার্দে ক্লোভিস সংস্কৃতি অঞ্চলের চেয়ে বহু হাজার মাইল দক্ষিণে ও অনেক আগের বলে ধরা হত ফলে বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, ইউরেশিয়া থেকে মানুষ ক্লোভিস সংস্কৃতির চেয়েও আগে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করেছিল।
মনতে ভার্দে থেকে মিলল কাঠ, উদ্ভিদ ও প্রাচীন জীবনযাত্রার নজির
মনতে ভার্দে প্রত্নস্থলের বয়স ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বৈজ্ঞানিক বিতর্ককে স্বাগত জানিয়েছেন ‘ওয়াইওমিং ইউনিভার্সিটি’র প্রত্নতাত্ত্বিক টড সুরোভেল।
তার ভাষ্য, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষকদের আরও গবেষণার মাধ্যমেই এ প্রশ্নের সঠিক সমাধান বের করা সম্ভব।
“আমাদের গবেষণা এখন ব্যাপক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা এত গুরুত্বপূর্ণ এক দাবির ক্ষেত্রে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের পদ্ধতি, উপাত্ত বা যুক্তিতে বড় কোনো গলদ থাকলে তা এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে উঠত। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সমালোচনা আমি দেখিনি, যা আমাদের মূল সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে পারে।”
অন্যদিকে, প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে স্থানটির গুরুত্বের কথা আবারও বলেছেন গবেষক টম ডিলেহে।
“মনতে ভার্দে ব্যতিক্রমীভাবে সংরক্ষিত থাকায় এখানে এমন কিছু উপাদান পাওয়া গেছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে কদাচিৎ মেলে। যার মধ্যে রয়েছে খোদাই করা কাঠ, কাঠামোর অবশিষ্টাংশ, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক শৈবাল ও অন্যান্য জৈব পদার্থ।
“এগুলো লেট প্লায়োস্টোসিন যুগে, অর্থাৎ শেষ বরফযুগে দক্ষিণ চিলিতে বসবাসকারী মানব সমাজের জীবনযাত্রা ও তাদের পাওয়া জ্ঞান সম্পর্কে এক অসাধারণ ধারণা দিয়েছে।”
এ প্রত্নস্থলে চুলা বা অগ্নিকুণ্ডের পাশে প্রাচীন মানুষের পায়ের ছাপ, আগুনের অবশিষ্টাংশ, কাঠের তৈরি হাতিয়ার ও খুঁটি, সেই সঙ্গে আলু এবং পশুর হাড় ও মাংসের অবশিষ্টাংশও উদ্ধার হয়েছে।
গবেষক ডিলেহে বলেছেন, “মনতে ভার্দে এলাকাটি বাতাসহীন অক্সিজেনমুক্ত স্তর দিয়ে ভালোভাবে ঢাকা থাকায় সেখানকার বিভিন্ন জৈব পদার্থ নষ্ট হয়নি। ফলে তখনকার মানুষের প্রযুক্তি ও তাদের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে আমরা গভীর ধারণা পেয়েছি।
“তারা খাবারের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ের ওপর নির্ভর করত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে শুরু করে আন্দিজ পর্বতমালা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াত।”