১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২৪ কোটি বছরের প্রাচীন জীবাশ্মে মিলল বিরল অক্ষত অন্ত্র

আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষভাগে ঘটে যাওয়া মহাবিলুপ্তির পর পৃথিবীতে নতুন উদ্যমে জীবনের উত্থান ঘটে।

২৪ কোটি বছরের প্রাচীন জীবাশ্মে মিলল বিরল অক্ষত অন্ত্র
ট্রায়াসিক যুগের ‘অস্ট্রোনাগা মিনিটাস’ প্রজাতির এ প্রাণীর জীবাশ্মটি দক্ষিণ চীনের ইউনান প্রদেশে পাওয়া গেছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Aug 2026, 02:18 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

চীনে ২৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের দীর্ঘ ঘাড়ওয়ালা এক প্রাচীন সামুদ্রিক সরীসৃপের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা।

চমৎকারভাবে সংরক্ষিত এ জীবাশ্মটিতে প্রাণীটির পেট, লাল রঙের যকৃৎ ও পুরো পরিপাকতন্ত্র অক্ষত অবস্থায় ভেসে উঠেছে, যা ডাইনোসরদের আবির্ভাবের আগের যুগের সরীসৃপদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থান সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

গবেষকরা বলছেন, ট্রায়াসিক যুগের ‘অস্ট্রোনাগা মিনিটাস’ প্রজাতির এ প্রাণীর জীবাশ্মটি দক্ষিণ চীনের ইউনান প্রদেশে পাওয়া গেছে। অঞ্চলটি সংরক্ষিত জীবাশ্ম পাওয়ার জন্য সুপরিচিত, যেখানে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণবিলুপ্তির পর জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক বিবর্তনীয় পরিবর্তনের অনেক প্রমাণ মিলেছে।

উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে জানা গেছ, এ অস্ট্রোনাগার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দুই ফুট। এর মাথাটি তুলনামূলক ছোট ও সরু মুখে তীক্ষ্ণ দাঁত সাজানো ছিল, যা পিচ্ছিল মাছ শিকারের জন্য কার্যকর ছিল।

প্রাণীটির ছিল দীর্ঘ ঘাড় ও দীর্ঘ দেহকাণ্ড এবং দেহের চেয়েও দীর্ঘ একটি লেজ। সাঁতার কাটার জন্য এর সামনের দিক জুড়ে ছিল বড় আকারের ফ্লিপার বা হাত-পা ও পেছনের অংশজুড়ে ছোট আকারের ফ্লিপার।

স্থলে বসবাসকারী সরীসৃপ থেকে বিবর্তিত হওয়া এ প্রাণীটি বেশ ক্ষিপ্র সাঁতারু ছিল। মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রাণীটি লেজ ব্যবহার করত এবং দিক নিয়ন্ত্রণে ডানা সদৃশ সামনের বড় ফ্লিপার দুটি কাজে লাগাত। দীর্ঘ ঘাড় বাড়িয়ে পানির ভেতর সহজেই মাছ ধরে ফেলত প্রাণীটি।

‘আর্কোসর’ নামের এক বিশেষ সরীসৃপ গোষ্ঠীর সঙ্গে অস্ট্রোনাগার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা রয়েছে। এ শ্রেণিতে রয়েছে বর্তমানের কুমির, বিলুপ্ত ডাইনোসর, উড়ুক্কু সরীসৃপ টেরোসর ও আধুনিক পাখি।

জলজ জীবনযাপনে অভিযোজিত হলেও অন্যান্য সামুদ্রিক সরীসৃপদের তুলনায় আর্কোসর পরিবারের এ দলটিই পানিতে টিকে থাকার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিবর্তিত হয়েছিল।

জীবাশ্মটিতে প্রাণীটির কঙ্কালের বেশিরভাগ অংশই এমনভাবে ছিল, যেমনটা এর বেঁচে থাকার সময় থাকার কথা। তবে এ আবিষ্কারটিকে সবচেয়ে অনন্য করে তুলেছে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গের অক্ষত উপস্থিতি, বিশেষ করে সম্পূর্ণ ‘গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইন’ বা পরিপাকতন্ত্রের সুস্পষ্ট উপস্থিতি, যা বিরল এক আবিষ্কার।

জার্মানির ‘স্টুটগার্ট স্টেট মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ হোহেনহাইম’-এর জীবাশ্মবিদ ও গবেষণা নিবন্ধের অন্যতম লেখক স্টিফান স্পিকম্যান বলেছেন, “আমাদের জানামতে, সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যে কোনো সরীসৃপের মধ্যে এটাই এখন পর্যন্ত পরিপাকতন্ত্রের সবচেয়ে পুরানো নিদর্শন।”

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।

জীবাশ্মটি থেকে দেখা গেছে, আধুনিক পাখি, কুমির ও কিছু ডাইনোসরের মতো দ্বি-প্রকোষ্ঠওয়ালা পাকস্থলী ছিল না অস্ট্রোনাগার, বরং ছিল থলে আকৃতির এক প্রকোষ্ঠের পাকস্থলী, অর্থাৎ খাবার হজমের জন্য প্রাণীটির দেহে কেবল একটিমাত্র প্রকোষ্ঠ দিয়ে গঠিত সহজ পরিপাক ব্যবস্থা ছিল।

স্পিকম্যান বলেছেন, “এ তথ্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, প্রাথমিক আর্কোসর বিবর্তনের সূচনালগ্নেই দ্বি-প্রকোষ্ঠওয়ালা পাকস্থলীর তৈরি হয়নি, বরং তা আরও পরের ধাপে, পাখি ও কুমিরের পূর্বপুরুষ তৈরি হওয়ার সময়ে বিবর্তিত হয়েছিল।”

পাকস্থলীর পেছনে ছিল প্রাণীটির কলিজা বা যকৃৎ, যা পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করা, শক্তির ভারসাম্য রক্ষা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজ করে। বিস্ময়ভাবে, জীবাশ্ম হলেও এর যকৃতের লাল রং এখনও টিকে রয়েছে।

স্পিকম্যান বলেছেন, “পাকস্থলীর ঠিক পেছনে এর অবস্থান থাকাটা কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে জীবাশ্মের সংরক্ষণের মান, প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ বছর পুরানো জীবাশ্মের মধ্যে আয়রন বা লৌহওয়ালা হিমোগ্লোবিনের অবশিষ্টাংশ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব।”

হিমোগ্লোবিন হচ্ছে লোহিত রক্তকণিকায় থাকা এক ধরনের প্রোটিন, যা ফুসফুস থেকে রক্তে অক্সিজেন বহন করে দেহের সব অংশে পৌঁছে দেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ফেরত নিয়ে আসে। এর ভেতরে থাকা লোহার উপস্থিতির কারণেই রক্তের রং লাল হয়ে থাকে।

যকৃতের পেছনে ছিল দীর্ঘ এক নল সদৃশ অংশ, যা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্র গঠন করেছে, এর থেকে প্রমাণ মেলে, প্রাণীটির পরিপাকতন্ত্র গঠনে বেশ সরল ছিল।

স্পিকম্যান বলেছেন, “বিশেষ করে অন্ত্রের আকৃতি আমাদের ধারণা দেওয়া এক শিকারী সরীসৃপের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই মেলে। কারণ নিরামিষাশী প্রাণীদের তুলনায় শিকারী প্রাণীদের অন্ত্র অনেক সরল হয়ে থাকে। উদ্ভিজ্জ খাবারের চেয়ে মাংস, যার মধ্যে মাছও অন্তর্ভুক্ত, যা হজম করা সহজ।

“পরবর্তী যুগের আর্কোসর ও ডাইনোসরদের মধ্যে আমরা আরও জটিল, দীর্ঘ ও পেঁচানো অন্ত্র দেখতে পাই। অন্যদিকে অস্ট্রোনাগার ক্ষেত্রে আমরা সোজা নলের মতো পরিপাকনালী পেয়েছি।”

পৃথিবীতে ডাইনোসরদের প্রথম আগমন ঘটেছিল আনুমানিক ২৩ কোটি বছর আগে।

মাছ দিয়ে নৈশভোজ!

অস্ট্রোনাগারের নমুনাটির অন্ত্রের ভেতর মাছের আঁশের মতো খাবারের অবশিষ্টাংশের সন্ধান মিলেছে, যা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষভাগে ঘটে যাওয়া মহাবিলুপ্তির পর পৃথিবীতে নতুন উদ্যমে জীবনের উত্থান ঘটে।

ওই সময় ডাঙার বেশ কয়েকটি সরীসৃপ গোষ্ঠী সমুদ্রের জলজ পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। এদের মধ্যে অস্ট্রোনাগার মতো বেশ কয়েকটি প্রজাতির দীর্ঘ ঘাড় ছিল, যা মাছ শিকারের ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোজন কৌশল বলে প্রমাণিত।

অস্ট্রোনাগার বিচরণ ছিল বিষুবরেখা সংলগ্ন উষ্ণ ও অগভীর সমুদ্রে, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও বহু সামুদ্রিক সরীসৃপের সমাগম ছিল। ওই সময় সমুদ্রের শীর্ষ শিকারিদের অন্যতম ছিল ভয়াল চোয়ালের ‘নোথোসর’, যা লম্বায় প্রায় ১৬ ফুট পর্যন্ত হত।

তবে উদ্ধার হওয়া অস্ট্রোনাগা প্রাণীটি পূর্ণ বয়স্ক ছিল কি না তা নিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত নন।

স্পিকম্যান বলেন, “মৃত্যুর সময় প্রাণীটি শতভাগ বেড়েছিল কি না সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। ফলে এ প্রজাতির আকৃতি আরও কিছুটা বড় হওয়া সম্ভব। তবে এটা সম্ভবত ছোট আকারের এক সামুদ্রিক সরীসৃপ ছিল এবং কয়েক মিটার দীর্ঘ হওয়ার মতো বড় ছিল না।”