Published : 03 Sep 2026, 03:40 PM
মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতিতে স্যাটেলাইটবিরোধী অস্ত্র, ধাওয়াকারী হান্টার স্যাটেলাইট ও লেজার প্রযুক্তি বিকাশে গতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট বিকল বা কক্ষপথ থেকে ধরে ফেলার এ মহড়াকে ঘিরে মহাকাশে তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামরিক যুদ্ধের ক্ষেত্র।
জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এড়িয়ে পৃথিবীর শত শত মাইল ওপরে বাণিজ্যিক ও সামরিক স্যাটেলাইটে ঠাসা কক্ষপথে ছোট এক স্যাটেলাইট বসিয়েছে চীনের রহস্যময় এক মানববিহীন স্পেসপ্লেন।
মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন কোম্পানি ‘লিওল্যাবস’-এর তথ্য অনুসারে, বস্তুটি অন্য এক চীনা স্যাটেলাইটের আশপাশে চক্কর দিয়ে পুনরায় ওই স্পেসপ্লেনের দিকে ফিরে আসে।
এ স্যাটেলাইট বা মিশনটি ঠিক কী উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে সে সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীও একইরকম ছোট শাটল আকৃতির মানববিহীন রহস্যময় স্পেসপ্লেন পরিচালনা করে।
রয়টার্সের পর্যালোচিত নথিপত্র, মহাকাশ ট্র্যাকিং ডেটা এবং সাবেক ও বর্তমান সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, দুটি প্রোগ্রামই সামরিক মহাকাশ অভিযানের দ্রুত বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে বেইজিং ও ওয়াশিংটন সম্ভাব্য মহাকাশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রয়টার্সের সংগৃহীত পেটেন্ট নথি, কেনাকাটার নোটিশ ও গবেষণাপত্রের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চীনা সামরিক বাহিনীর গবেষকরা এমন সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন, যার মাধ্যমে অন্য মহাকাশযানকে ধাওয়া, বন্দি বা কব্জা করা সম্ভব। একইসঙ্গে এসব মিশন পরিচালনার সময় জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যিক মহাকাশ ট্র্যাকিং ডেটা অনুসারে, সন্দেহভাজন এক চীনা নজরদারি স্যাটেলাইটের গতিপথে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নিজেদের প্রথম যৌথ সামরিক মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করেছে।
জুলাইয়ে অবসরে যাওয়া মার্কিন স্পেস ফোর্সের চিফ অফ স্পেস অপারেশনস জেনারেল চ্যান্স সল্টজম্যান বলেছেন, “চীনারা নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে।”
এর মধ্যে ভূমি ও মহাকাশভিত্তিক এমন সব অস্ত্র রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুতে বাধা তৈরি করতে বা ধ্বংস করে দিতে পারে। চীনের এ হুমকিকে ‘যথেষ্ট উদ্বেগজনক’ বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
ইউক্রেইন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে প্রমাণ মিলেছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কয়েক দশক ধরে এগুলো সামরিক বাহিনীকে যোগাযোগ, ন্যাভিগেশন ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে আসছে এবং এরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের নির্দিষ্ট পথেই অবস্থান করত।
বর্তমানে বিভিন্ন সামরিক বাহিনী এগুলোকে সক্রিয় অস্ত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, যা জ্যামিং, লেজার লাইট মেরে বিভ্রান্ত বা প্রতিপক্ষের মহাকাশযান বন্দি করার মাধ্যমে আক্রমণ চালাতে পারে।
ইউএস এয়ার ফোর্স এয়ার ওয়ার কলেজের সাবেক অধ্যাপক এভারেট ডলম্যান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা ব্যাহত হলে তা ‘স্থলভাগে থাকা বড় সামরিক বাহিনীকে অচল করে দেবে’, যা নজরদারি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবকিছুক ওপরই প্রভাব ফেলবে।
স্পেসপ্লেন সাধারণত দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং স্যাটেলাইট বা মালামাল বহন করতে পারায় প্রতিপক্ষের কাছে এগুলোকে সম্ভাব্য ‘স্পেস ফাইটার’ বা মহাকাশ যোদ্ধা মনে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে মিত্র দেশগুলো
পৃথিবীর কক্ষপথ দিন দিন আরও ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গেই তীব্র হচ্ছে এ প্রতিযোগিতা।
শেয়ারবাজারে সদ্য পথ চলতে শুরু করা ‘স্পেসএক্স’ বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে। ‘ইলন মাস্কের কোম্পানিটি’ মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইওয়ালা বড় আকারের ডেটা সেন্টার বসানোর পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, চীনও তাদের নিজস্ব প্রতিদ্বন্দ্বী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির আওতায় মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের মহাকাশ সক্ষমতা প্রতিনিয়ত ঝালিয়ে নিচ্ছে।
মহাকাশবিষয়ক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী কোম্পানি ‘স্লিংসট অ্যারোস্পেস’ বলেছে, গেল বছরের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত মার্কিন-যুক্তরাজ্য যৌথ অভিযানে কলোরাডোর এক ঘাঁটি থেকে নির্দেশ দিয়ে মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইটকে যুক্তরাজ্যের একটি স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়।
ওই সময় চীনের ‘শিয়ান ১২-০১’ স্যাটেলাইটটি তাদের ঠিক ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করছিল। ওই উচ্চতায় এ দূরত্বকে প্রযুক্তিগতভাবে বেশ বিপজ্জনক ও নিকটবর্তী হিসেবেই ধরে নেন বিশেষজ্ঞরা।
সামরিক কাজে থাকা তিনজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ও মহাকাশ ট্র্যাকিং সংগঠন ‘কমসপক’-এর বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনাটি স্পষ্টতই বেইজিংকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্য ঘটানো হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বর্তমান মহাকাশ বিষয়ক পরামর্শক অ্যান্ড্রু টার্নার বলেছেন, এমনটা ‘প্রায় নিশ্চিতভাবেই চীনকে দেওয়া এক কৌশলগত বার্তা’, যার মাধ্যমে মিত্রদের ঐক্য ও সক্ষমতা দেখানোর পাশাপাশি ব্রিটিশ স্যাটেলাইটে হানা না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল।
‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের দুই দেশের মধ্যে পরিচালিত প্রথম এ যৌথ সামরিক অভিযান প্রকাশ্যে এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।
তবে সেটি যে চীনা মহাকাশযানের একেবারে কাছে সংঘটিত হয়েছিল তা গোপন রাখা হয়। গোয়েন্দা সুরক্ষার স্বার্থেই মহাকাশে ঘটা ঘটনার বেশিরভাগ তথ্য গোপন তালিকায় থাকে।
মার্কিন স্পেস কমান্ড বলেছে, মিশনটি মহাকাশে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করার নতুন সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, সামরিক কার্যক্রমের জন্য মহাকাশ দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং নিজস্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে উন্নত কক্ষপথ অভিযান চালাচ্ছে।
চীনা স্যাটেলাইটের এত কাছে যাওয়ার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি দুই দেশের কেউই।
এ অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন মার্কিন স্পেস ফোর্সের পরবর্তী চিফ অফ স্পেস অপারেশনস লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাস শাইস।
অভিযানের পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অন্য এক মহাকাশযানের খুব কাছাকাছি গিয়ে পরিচালনা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে মিত্রদের স্যাটেলাইট ঠিকঠাক কাজ করছে কি না বা প্রতিপক্ষ ‘এমন কিছু করছে কি না যা তাদের করা উচিত নয়’। তবে ওই সময় ওই স্থানে অন্য কোনো দেশের স্যাটেলাইট অবস্থান করছিল কি না সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য বলেছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরিচালিত একটি নৌ-মহড়ার সঙ্গেই মহাকাশ মিশনটি পরিচালিত হয়েছিল।
এপ্রিলে এক সম্মেলনে ইউকে স্পেস কমান্ডের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল পল টেডম্যান বলেছেন, “পৃথিবীর বুকে পরিচালিত সামরিক অভিযানে সহায়তা করা ছাড়াও মহাকাশকে সরাসরি যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে ব্যবহার করা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।”
পরবর্তীতে তিনিও সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন।
চীন সরকার বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের এ যৌথ অভিযানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ তাদের জানা নেই। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেইজিং মহাকাশে অস্ত্রের ব্যবহার বা সামরিকীকরণের কঠোর বিরোধী এবং এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বিশ্বাসী।
পাশিাপাশি ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটন সেখানে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা উসকে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে বেইজিং।
‘শিয়ান ১২-০১’ স্যাটেলাইট ও চীনা স্পেসপ্লেন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি।
এদিকে, ‘শিয়ান ১২-০১’কে মহাকাশ পরিবেশ জরিপকারী হিসেবে ও স্পেসপ্লেনটিকে মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সমর্থক এক পরীক্ষামূলক যান হিসেবে বর্ণনা করে আসছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা সিনহুয়া।
অন্যদিকে, মার্কিন স্পেস ফোর্স বলেছে, তাদের নিজস্ব স্পেসপ্লেনটি বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
স্পেসপ্লেন দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন ও স্যাটেলাইট বা মালামাল বহন করতে পারায় প্রতিপক্ষের কাছে এগুলোকে সম্ভাব্য ‘স্পেস ফাইটার’ মনে হতে পারে
মহাকাশের অস্ত্র তৈরি ও প্রয়োগ
মার্কিন স্পেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকাশের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরে সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিপক্ষ দেশগুলো এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে মূল সিস্টেমগুলো ব্যবহারে বাধা দিতে ও তাদের সামরিক কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
তার ভাষ্য, যে কোনো সংঘাতের শুরুতেই প্রতিপক্ষ সম্ভবত মার্কিন মহাকাশ সম্পদগুলোকে টার্গেট করার চেষ্টা করবে।
এ ধরনের হুমকি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে আরও সক্রিয় যুদ্ধের অবস্থান নিতে হবে বলে মত হোয়াইটিংয়ের। যার মানে কেবল মার্কিন প্রযুক্তি বা সিস্টেম রক্ষা করাই নয়, বরং প্রয়োজনবোধে শত্রুপক্ষের সম্পদে আঘাত হানতে বা হুমকি দিতে প্রস্তুত থাকা। তিনি অরবিটাল ইন্টারসেপ্টর ও অন্যান্য মহাকাশ অস্ত্রের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এপ্রিলে এক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “মহাকাশে সংঘাতের জন্য আমাদের শতভাগ প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি ব্যর্থ হয়, আমরা লড়াই করব ও জয়ী হব।”
পশ্চিমা কর্মকর্তারা নানা ধরনের হুমকির বিষয়ে সতর্ক করছেন, যার মধ্যে রয়েছে ভূমিভিত্তিক লেজার অস্ত্র, ইলেকট্রনিক জ্যামার, সাইবার হামলা ও স্যাটেলাইটবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র।
বর্তমানে মহাকাশের কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া তিন দেশই গতিপথ পরিবর্তনযোগ্য বিশেষ স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে, যা অন্য মহাকাশযানের খুব কাছাকাছি যেতে ও সেগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে।
এসব প্রযুক্তিকে লেজার বা প্রজেক্টাইলসহ বিভিন্ন অস্ত্র বহনের উপযোগী করে তৈরি করা সম্ভব। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের স্যাটেলাইটের জন্য হুমকি হতে পারে এমন প্রযুক্তির প্রদর্শন ইতোমধ্যেই চালিয়েছে বেইজিং ও মস্কো।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে স্যাটেলাইটবিরোধী এক পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ এনেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে পারে এমন স্যাটেলাইট। তবে কক্ষপথে এ ধরনের কোনো স্যাটেলাইটভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র বিকাশের কথা অস্বীকার করেছে মস্কো।
শরতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের সাবেক স্পেস প্রধান টেডম্যান বলেছেন, সামরিক বাহিনীগুলো এখন স্যাটেলাইটকে কেবল সংযোগ মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ‘অস্ত্র ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখছে, যা লড়াই ও অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। মহাকাশে ‘আমাদের কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখতে পশ্চিমারা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে’।
কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, অন্য মহাকাশযান দিয়ে সরাসরি আক্রমণের চেয়ে পৃথিবী থেকেই স্যাটেলাইটের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা বা অচল করে দেওয়া এখন সহজ।
নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশের একটি বিরল ঘটনার উল্লেখ করে গেল জুনে মার্কিন স্পেস ফোর্স বলেছে, তারা ‘এলথ্রিহ্যারিস টেকনোলজিস’-এর তৈরি একটি ভূমিভিত্তিক ইলেকট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র যোগ করেছে, যা প্রতিপক্ষের বিভিন্ন স্যাটেলাইটকে অচল বা বিকল করে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা।
‘ডগফাইটিং’ ও হান্টার স্যাটেলাইট
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের শীর্ষ মহাকাশ শক্তি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও চীন তাদের স্যাটেলাইটের সংখ্যা ও মিশনের জটিলতা উভয়ই দ্রুতগতিতে বাড়াচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, চীনা স্যাটেলাইটগুলো মহাকাশের কক্ষপথে ‘ডগফাইটিং’ বা একের পর এক আক্রমণাত্মক মহড়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যেখানে একাধিক স্যাটেলাইট কাছাকাছি থেকে সমন্বিতভাবে গতিবিধি পরিবর্তন করেছে।
এ ছাড়া, নিষ্ক্রিয় বা অকেজো স্যাটেলাইটকে ধরে তা অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়ার মতো জটিল কৌশলও দেখিয়েছে চীনা মহাকাশযান।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গেল বছর চীন কক্ষপথেই জ্বালানি রিফুয়েলিংয়ের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। মহাকাশ অভিযানে এ প্রযুক্তি বড় সাফল্য আনতে পারে। কারণ স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে যে জ্বালানি নিয়ে উৎক্ষেপিত হয় সেটির ওপরই নির্ভর করে। জ্বালানি রিফুয়েলিংয়ের এ সক্ষমতাই নির্ধারণ করে দেবে একটি মহাকাশযান ‘শিকারি’ নাকি নিজেই ‘শিকার’ হিসেবে থেকে যাবে।
চীনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ নতুন সক্ষমতা পেতে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। পেটেন্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, চীনের সবচেয়ে উন্নত সামরিক প্লেনের নির্মাতা কোম্পানি এমন এক প্রযুক্তি পেয়েছে, যা অন্য মহাকাশযানকে তাড়া করার সময় স্যাটেলাইটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব করতে সাহায্য করে।
এদিকে, চীনের ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ডিফেন্স টেকনোলজি’র এক প্রযুক্তি হস্তান্তর নোটিশে দেখা গেছে, তারা শত শত স্যাটেলাইটকে প্রতিরক্ষা ও সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে পরিচালনার মতো এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা আরেক বড় ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা তাড়া করতে সক্ষম এমন ‘হান্টার স্যাটেলাইট’ প্রযুক্তি তৈরি করছেন। পেটেন্ট নথিতে জাল ব্যাবহার করে লক্ষ্যবস্তু বন্দি করার মতো ধারণাও উঠে এসেছে।
তবে এসব নথির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি চীনা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ। মহাকাশে জ্বালানি ভরা বা অন্য স্যাটেলাইট ধরে ফেলার মতো প্রযুক্তিগুলোর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।
চীনের সরকারি সামরিক সংবাদপত্র ‘পিএলএ ডেইলি’ ২০২২ সালের এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখা ও যুদ্ধে বিজয়ের জন্য মহাকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ।