Published : 19 Aug 2026, 06:12 PM
মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শিশুদের ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আসক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা।
রয়টার্স লিখেছে, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বিভিন্ন অ্যাপের ভোল বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মামলার শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের তোলা এই বিস্ফোরক দাবি নাকচ করলো কোম্পানিটি।
মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের একটি দ্বিপক্ষীয় বা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান জোট।
মামলায় কোম্পানিটির কাছ থেকে লাখ কোটি ডলার জরিমানা দাবির পাশাপাশি তাদের ব্যবসাপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
মামলার নেতৃত্ব দেওয়া চারটি অঙ্গরাজ্য হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি। অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছে, তরুণ ব্যবহারকারীদের আসক্ত করার উদ্দেশ্যেই ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ডিজাইন এমনভাবে তৈরি করেছে কোম্পানিটি।
এতে করে টিনএজারদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও নিজের জীবনাবসানের প্রবণতা বাড়ছে। সেইসঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে মেটা ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এ ছাড়া শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করে মেটা মার্কিন কেন্দ্রীয় আইন লঙ্ঘন করেছে বলে একযোগে দাবি করেছে ২৯টি অঙ্গরাজ্যই।
মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। মামলাটিকে খুদে ব্যবহারকারীদের ওপর সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব সংক্রান্ত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আইনি লড়াই হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
কেবল মেটাই নয়, স্ন্যাপ, টিকটকের মূল কোম্পানি বাইটড্যান্স ও ইউটিউবের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেটের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও একই ধরনের হাজার হাজার মামলার মুখে পড়ছে।
মার্কিন অঙ্গরাজ্য, স্থানীয় পৌরসভা, স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের ভুক্তভোগীরা এসব প্ল্যাটফর্মের ক্ষতির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।
আদালতে আট সদস্যের জুরির সামনে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও’নিল মেটার ব্যবসায়িক নীতির কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, “মেটার আসল উদ্দেশ্যই ব্যবহারকারীদের অ্যাপে আসক্ত করা, যত বেশি সময় সম্ভব তাদের আটকে রাখা, তথ্য হাতিয়ে নেওয়া ও সাধারণের কাছে আসল সত্য গোপন করা।
“শিশুদের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিস্ময়কর রকম সফল হয়েছে। মেটার কাছে শিশুই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ফলে শিশুদের অভিভাবক ও স্বজনদের কাছে তাদের নিরাপত্তার মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল।”
অন্যদিকে মেটার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন তাদের আইনজীবী পল স্মিথ।
তিনি বলেছেন, কিছু ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে জটিলতার মুখে পড়তে পারেন। তবে ‘টিনএজারদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ গবেষণায় মেলেনি’।
পল স্মিথ আরও বলেছেন, মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সবসময়ই তাদের সেবার মান উন্নত করতে চান, প্ল্যাটফর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে নয়।
“গ্রাহকরা তাদের সেবা পছন্দ না করলে ব্যবসায়ের উন্নতি সম্ভব নয়, এ বিষয়ে মেটা শতভাগ স্পষ্ট।”
ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বড় পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন বিচারক
জুরি সদস্যরা কেবল একটি পরামর্শমূলক রায় দিলেও মেটা অপরাধী কি না তার চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ করবেন মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ ইভন গঞ্জালেজ রজার্স।
বিচারের রায়ে মেটা দোষী সাব্যস্ত হলে মেটার ওপর লাখ কোটি ডলারের দেওয়ানি জরিমানা আরোপ করতে এবং ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ফিচারে বড় ধরনের পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন বিচারক রজার্স।
ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্টটি দাবি করেছে, এ মামলায় তাদের ওপর সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে, যা তাদের সার্বিক বাজারমূল্যের কাছাকাছি।
তবে গেল সপ্তাহের এক শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেলরা বলেছেন, জরিমানার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি হতে পারে, যা মেটার প্রায় তিন বছরের কর-পরবর্তী নিট মুনাফার সমান।
মামলাকারী চার অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি চায় মেটা যেন তাদের ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনে।
এর মধ্যে রয়েছে পোস্টের লাইক বাটন ও নিরবচ্ছিন্ন স্ক্রলিং সুবিধা বাতিল করা, তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া এবং ১৩ বছরের কম বয়সি শিশুরা যাতে অনলাইনে প্রবেশ করতে না পারে সে সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
উদ্বোধনী যুক্তিতর্ক শেষে মেটার সাবেক সেইফটি ইঞ্জিনিয়ার আরতুরো বেজার অঙ্গরাজ্যগুলোর পক্ষে প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন।
বেজার দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, শিশুদের সুরক্ষায় মেটার নিজস্ব বিভিন্ন সরঞ্জাম যে কার্যকর নয় তা তাদের জানা ছিল। এর আগেও, চারটি মামলায় মেটার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে সিগনাল অ্যাপের মেসেজ মুছে ফেলার অভিযোগ তুলে মেটা তার সাক্ষ্য দিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিচারক রজার্স সেই আবেদন বাতিল করেছেন।
জুরিদের উদ্দেশ্যে বেজার বলেছেন, মেটার মূল মন্ত্রই ছিল ‘দ্রুত এগোও এবং ভেঙে ফেলো’। ১৩ বছরের কম বয়সি শিশুরা অনলাইনে রয়েছে কি না তা নজরদারির ক্ষেত্রে তারা ‘জানতেও চাইবো না, বলবও না’ নীতি অনুসরণ করেছে।
“রিলসের মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর অনেক ফিচার বাজারে নিয়ে আসা হলেও শুরুর দিকে সেগুলোর রূপায়নে নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা চিন্তাই করা হয়নি।”
ছয় সপ্তাহব্যাপী চলতে যাওয়া এই বিচারে মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ও ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরির সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বিচারের শুরুতে মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে মেটার শেয়ারের দাম চার দশমিক চার শতাংশ কমে ৫৪৩.৬৭ ডলারে নেমেছে।
আদালতের বাইরে বিক্ষোভ
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও’নিল বলেছেন, মার্কিন এই চার অঙ্গরাজ্য মেটাকে ব্যবসা থেকে সরিয়ে দিতে চায় না। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু সুফলও রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেছেন, শিশুরা কীভাবে অনলাইন উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এবং অ্যাপে সময় কাটায় তা গবেষণার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে তাদের শোষণ করেছে মেটা।
ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরিকে পাঠানো অভ্যন্তরীণ এক ইমেইলের কথা উল্লেখ করে ও’নিল বলেছেন, তাদের একমাত্র লক্ষ্য ‘টিনএজারদের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় আটকে রাখা’। মেটার কর্মীরা নিজেরাই ইনস্টাগ্রামকে ‘মাদক’ ও নিজেদের ‘মাদক কারবারি’ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
“মেটা দেখেছে, যত কম বয়সে একটি শিশু এই অ্যাপ ব্যবহার শুরু করবে তাদের ব্যবসার জন্য তত বেশি লাভ।”
অন্যদিকে, মেটার আইনজীবী পল স্মিথ বলেছেন, ব্যক্তিগত যোগাযোগে কর্মীরা হয়ত অনানুষ্ঠানিক বা চটকদার ভাষা ব্যবহার করে থাকতে পারেন। তবে তিনি দাবি করেছেন, মেটার বিভিন্ন পণ্য আসক্তিকর নয়। যেসব কর্মী ইনস্টাগ্রামকে ‘মাদক’ বলেছিলেন তারা অ্যাপটিকে নিরাপদ করতে বাস্তবে কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা জুরি সদস্যরা বিচারে শুনতে পাবেন।
এ মামলার বিচার শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আদালতের বাইরে মেটাবিরোধী সমালোচক ও ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের একজন মেরি রোড বলেছেন, ২০২১ সালে ফেইসবুকে এক সাইবার শিকারীর হাত ধরে বিভ্রান্ত হয়ে তার ১৫ বছরের ছেলে রাইলি ব্যাসফোর্ড আত্মহত্যা করে।
“মেটা বিষয়টিকে আকস্মিক আত্মহত্যা বলেছে। কিন্তু আমি বলছি এটা করপোরেট ব্যবস্থার নির্মম পরিণতি, যে ব্যবস্থা শিশুদের বদলে বড় বিভিন্ন কোম্পানিকে সুরক্ষা দেয়।”
২০২৩ সালে মামলাটি শুরু হলেও এর সূত্রপাত ঘটে ২০২১ সালে। ওই সময় মেটার সাবেক কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার ফ্রান্সেস হাউগেন মার্কিন সেনেট কমিটির কাছে বলেছেন, মেটা খুব ভালো করেই জানত তাদের প্ল্যাটফর্ম শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। এরপরও কেবল মুনাফা বাড়াতে তারা কোনো সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেয়নি।
এদিকে, এ বছরের মার্চে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক জুরি প্যানেল মেটা ও গুগলকে নির্দেশ দিয়েছে তারা যেন ক্ষতির শিকার এক তরুণীকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। ওই তরুণীর অভিযোগ, শৈশবে তিনি ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এ মাসের শুরুতেও নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বর্ণনা করে সেখানকার এক বিচারক টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণে মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা করেছেন।
টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেলও ইনস্টাগ্রামের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা লড়ছেন, যা বর্তমানে ন্যাশভিলের আদালতে বিচারাধীন।