১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদ অভিযানের ধরন বদলে দেবে এই পিৎজা আকারের রোবট?

চাঁদে ‘বিশাল এক মানমন্দির তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে গবেষণা দলটি, যার আওতায় চাঁদের পৃষ্ঠের ৭৭ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এক লাখ অ্যান্টেনা বসানো হবে।

চাঁদ অভিযানের ধরন বদলে দেবে এই পিৎজা আকারের রোবট?
ছবি: ‘আর্মস্ট্রং’ নামের ছোট ও তিন চাকার রোবটটি তৈরি করেছে গবেষণা দলটি। ছবি: ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Jul 2025, 05:28 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:19 PM

এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা, যেটি পিৎজার মতো ছোট আকারের রোবট ও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর-এর সাহায্যে চাঁদে অভিযানের ধরন আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে পারে বলে দাবি তাদের।

গবেষকরা বলছেন, একদিন হয়ত এসব রোবট চাঁদের পৃষ্ঠে হেঁটে বেড়াবে ও নভোচারীদের বিজ্ঞান গবেষণাগার বা ভবিষ্যতের বাসস্থান তৈরিতে সাহায্য করবে। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন নিয়ে প্রাথমিক কিছু কাজ চলছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার’-এর সাধারণ চেহারার এক অফিসে।

সেখানে রয়েছে ছোট ও তিন চাকার একটি রোবট, যার নাম ‘আর্মস্ট্রং’। এটি ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিকের ব্লক তুলে নেয় ও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তা সরিয়ে রাখে।

বিষয়টি অনেক বড় কিছু না হলেও এই রোবট আর এর সঙ্গে কাজ করা শিক্ষার্থীরা মহাকাশ গবেষণার এক নতুন যুগের ভিত্তি তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।

‘আর্মস্ট্রং’ রোবটটিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন ভিআর হেডসেট পরা শিক্ষার্থীরা। তাদের একজন জাভিয়ের ও’কাফি। সম্প্রতি ‘সিইউ বোল্ডার’ থেকে স্নাতক করে এখন ‘অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ে মাস্টার্স করছেন তিনি।

পাশের একটি ঘর থেকে ভিআর চশমা পড়ে রোবটের ক্যামেরার ভেতর দিয়ে আশপাশ দেখছেন ও’কাফি। যেন রোবটের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখছেন তিনি। এরপর রোবটটিকে অফিসের ভেতরে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ান তিনি। মূল ধারণা হচ্ছে, এভাবে পৃথিবীতে বসে নভোচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদের এমনভাবে শেখানো যাতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, যেমন চাঁদে, তারা নিরাপদে রোবট পরিচালনা করতে পারেন।

তাদের এ গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাডভান্সেস ইন স্পেস রিসার্চ’-এ।

গবেষণায় ও’কাফি ও তার দল বলছে, ভিআর ব্যবহার করে ‘ডিজিটাল টুইন’ বা বাস্তব জগতের ভার্চুয়াল কপিতে রোবট চালানোর প্রশিক্ষণ নিলে তা কাউকে বাস্তবে রোবট পরিচালনায় আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে ও তাদের মানসিক চাপও কমিয়ে আনতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, এ ধারণাটি ভবিষ্যতের চাঁদে অভিযানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসব মিশন অনেকটাই নির্ভর করবে নভোচারী ও রোবট সহকারীদের ওপর। এ কাজটি বড় এক প্রকল্পের অংশ, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘সিইউ বোল্ডার’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যাক বার্নস ও তার গবেষণা দল।

চাঁদে ‘ফারভিউ’ নামে বিশাল এক মহাকাশ পর্যবেক্ষণ অবজারভেটরি বা মানমন্দির তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বার্নসের দল। এ অবজারভেটরিতে চাঁদের পৃষ্ঠে ৭৭ বর্গমাইল জুড়ে এক লাখ অ্যান্টেনা বসবে, যার মাধ্যমে মহাবিশ্ব সম্পর্কে গবেষণা করবেন তারা।

তবে এমন বিশাল এক মানমন্দির হাত দিয়ে বানাতে গেলে অনেক সময় ও পরিশ্রম দরকার। গবেষকদের পরিকল্পনা হচ্ছে, আর্মস্ট্রং-এর মতো রোবট ব্যবহার করে এই কাজ সহজ ও দ্রুত শেষ করা।

প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভিডিও গেইম ইঞ্জিন ‘ইউনিটি’ ব্যবহার করে তাদের অফিসের এক ভার্চুয়াল কপি তৈরি করেছে গবেষণা দলটি। দেয়াল, কার্পেট থেকে শুরু করে অফিসের প্রতিটি জিনিস, এমনকি আর্মস্ট্রং রোবট কত দ্রুত চলতে পারে সেসব খুব যত্ন সহকারে মিলিয়ে দেখেছেন তারা। পাশাপাশি রোবটটি বাস্তবে এক গজ চলতে যত সময় নেয় ঠিক সেই গতি ভার্চুয়াল জগতেও ঠিক রেখেছে দলটি। যাতে রোবট চালানো শেখা আরও বাস্তব মনে হয়।

এসব রোবট নিয়ে পরীক্ষার সময় ২৪ জন ব্যক্তিকে একটি কাজ করতে বলা হয়েছে, যেখানে আর্মস্ট্রং রোবট ব্যবহার করে একটি প্লাস্টিকের ব্লক তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় সরাতে বলা হয়েছে তাদের।

২৪ জনের মধ্যে অর্ধেক মানুষ আগে থেকে ভিআর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। যারা ভিআর-এর ব্যবহার জানেন এ কাজটি গড়ে তারা ২৮ শতাংশ দ্রুত শেষ করেছেন। তারা বলছেন, এ কাজের সময় অনেক বেশি স্বস্তি অনুভব করেছেন। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ হতে পারে এক অসাধারণ উপায়, যা মানুষকে চাঁদের মতো কঠিন পরিবেশে রোবট নিয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

হাতে-কলমে করা এ গবেষণাটি শিক্ষার্থী দলের জন্য বাস্তব জগতের এক মূল্যবান অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। গবেষণায় তারা দেখেছেন, অনেক অংশগ্রহণকারী অসাবধানতাবশত প্লাস্টিকের এসব ব্লক উল্টে ফেলছিলেন, যা তারা আগে কল্পনাও করেননি। ফলে তাদের পরীক্ষার ধরন আবার নতুন করে ডিজাইন করতে হয়েছে। এটি তাদের জন্য বড় এক শিক্ষার বিষয় যে, মানুষ যখন যন্ত্র বা রোবটের সঙ্গে কাজ করেন তখন অপ্রত্যাশিত অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে।

এখন নিজেদের ‘ডিজিটাল টুইন’ ধারণাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে কাজ করছে গবেষণা দলটি, যেখানে চাঁদের আসল পৃষ্ঠের পরিবেশ অনুকরণ করে সেখানে জটিল উপাদান যেমন চাঁদের ধুলাও যোগ করছে তারা।

এ ধুলা রোভার বা রোবটের চাকা ঘোরার সময় বাতাসে উড়তে পারে ও ক্যামেরা বা সেন্সর ঢেকে দিতে পারে, যা কাজের জন্য বড় বাধা। তবে এমনটি মডেল করা কঠিন। কারণ, চাঁদের ধুলা পৃথিবীতে না থাকায় এটি কেমন আচরণ করে তা বোঝা কঠিন।