১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

চমকের পর কি আয়ের মুখও দেখাবে চীনা হিউম্যানয়েড রোবট?

কুংফু কিক করা বা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার পর আবার নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতার জন্য প্রশংসিত ইউনিট্রির বিভিন্ন রোবট।

চমকের পর কি আয়ের মুখও দেখাবে চীনা হিউম্যানয়েড রোবট?
চীনের মূল ভূখণ্ডে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি হতে যাচ্ছে ইউনিট্রি। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Aug 2026, 02:17 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

ব্যাকফ্লিপ বা কুংফু কিক মেরে বিশ্বকে চমকে দেওয়া চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি ইউনিট্রি’র শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

তবে এ উন্মাদনার মধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন সংশয়বাদীরা। তাদের প্রশ্ন, দৌড়ানো বা জিমন্যাস্টিকসের কসরত ছাড়িয়ে এসব রোবট বাস্তবে কোনো দরকারি কাজ করতে আদৌ কতটা প্রস্তুত?

আমেরিকান সংবাদমধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, হাংঝৌভিত্তিক কোম্পানিটি আইপিওর শেয়ার প্রতি দাম নির্ধারণ করেছে ২২.৪ ডলার। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি ৯০ কোটি ডলার মূলধন সংগ্রহ করেছে, যার ফলে কোম্পানিটির বাজারদর পৌঁছেছে ৯০০ কোটি ডলারে।

এ মাসের শেষদিকে সাংহাইয়ের ‘স্টার’ মার্কেটে ইউনিট্রির শেয়ার কেনাবেচা শুরুর উদ্বোধনী দিনেই শেয়ারের দামে বড় লাফ দেখার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। চীনের মূল ভূখণ্ডে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি হতে যাচ্ছে ইউনিট্রি।

সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটে ইউনিট্রির আইপিও ঘিরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নজিরবিহীন আগ্রহ দেখা গেছে। কোম্পানিটির বিক্রয়যোগ্য শেয়ার মূল্যের ৫ হাজার গুণেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে।

ফলে সাধারণ শেয়ার পাওয়ার হার বা লটারি জয়ের সুযোগ নেমে এসেছে সর্বনিম্ন ০.০১৮ শতাংশে। কোম্পানিটির আইপিওতে বিনিয়োগ করেছে জনপ্রিয় এআই স্টার্টআপ ডিপসিকের মতো কৌশলগত পার্টনাররাও।

শেয়ার বাজারে আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরুর আগেই অনেক বিনিয়োগকারী এর ওপর বাজি ধরতে ক্রিপ্টো-ডেরিভেটিভ প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

শুক্রবারে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ‘হাইপারলিকুইড’-এ ইউনিট্রি-সংশ্লিষ্ট প্রি-আইপিও পারপেচুয়াল চুক্তি এর নির্ধারিত আইপিও দামের প্রায় চারগুণ দামে কেনাবেচা হতে দেখা গেছে।

কুংফু কিক মারা বা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার পর আবার নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতার জন্য প্রশংসিত ইউনিট্রির বিভিন্ন রোবট। তবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে এআই ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের ঘাটতি পূরণ করে এগুলোকে আদৌ বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

‘লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর ম্যানেজিং পার্টনার হাওয়া হং বলেছেন, “সত্যি বলতে এসব হিউম্যানয়েড রোবট দারুণ। এরা নাচতে পারে, কসরত দেখাতে পারে তবে, এদের কখনো বাস্তব জীবনের দরকারি কোনো কাজ করতে দেখা যায়নি।”

নিজেদের প্রাথমিক তথ্য বা প্রসপেক্টাসে ইউনিট্রি বলেছে, বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে ধীরগতির হতে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলছে, এসব রোবটের হাতের সূক্ষ্মতা ও স্থায়িত্ব এখনও টেকসই ব্যবহারের উপযোগী নয়।

হং বলেছেন, বাজারে বিনিয়োগের মতো হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স কোম্পানির সংখ্যা কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে খুচরা বিনিয়োগকারীরা এ আইপিওতে লাইন দিচ্ছেন।

‘ভিপি ব্যাংক’-এর ইক্যুইটি অ্যানালিস্ট ডমিনিক প্রোস বলেছেন, সবচেয়ে উন্নতমানের বিভিন্ন হিউম্যানয়েড রোবটও সাধারণত খুব অল্প কিছু নির্দিষ্ট কাজ সামলাতে পারে। ব্যাটারি রিচার্জ করার আগে এগুলো বড়জোড় কয়েক ঘণ্টা চালু থাকে। অলস বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বসিয়ে রাখলেও বেশিরভাগ হিউম্যানয়েড মডেল সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা পর্যন্ত টিকতে পারে।

“রোবটকে এর ওপর অর্পিত প্রতিটি কাজের জন্য আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হয় তা যত সহজ কাজই হোক না কেন। সেই সঙ্গে জটিল দৈনন্দিন কাজের মতো সক্ষমতা রোবটের এখনও হয়নি।”

তবে ইউনিট্রি দিয়ে এই খাতের আইপিও যাত্রা শেষ হচ্ছে না। এ ধারায় আরও রোবোটিক্স কোম্পানি যোগ হতে যাচ্ছে। ইউনিট্রির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ‘অ্যাজিবট’ হংকংয়ে ও ‘লেজু রোবোটিক্স’ শেনঝেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, গেল মাসে ‘লিংকস ডায়নামিক্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা উইল ঝাং বলেছেন, আইপিওতে যাওয়া তাদের জন্য এখন ‘একদম আবশ্যিক’।

হিউম্যানয়েডের অর্থনীতি

উৎপাদন খরচ কম হওয়ার সুবাদে রোবোটিক্স খাতে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে চীন।

গবেষণা কোম্পানি ‘উড ম্যাকেঞ্জি’র তথ্য অনুসারে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে হিউম্যানয়েড রোবটের সংখ্যা বার্ষিক ৯০ শতাংশের বেশি হারে বেড়ে ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। সে সময় বাৎসরিক উৎপাদনও ৪০ লাখ ইউনিট পেরোবে। এ খাতে এরইমধ্যে চীন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে।

‘উড ম্যাকেঞ্জি’র তথ্যমতে, বিশ্বে ব্যবহৃত মোট ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটের ৭০ শতাংশের বেশি ও গেল বছর বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া হিউম্যানয়েড রোবটের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল চীনের।

উড ম্যাকেঞ্জি বলেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হিউম্যানয়েড রোবটের গড় দাম ৯৩ শতাংশ কমে ৫৮ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। ইউনিট্রির ফ্লাগশিপ ‘জিওয়ান’ মডেলের দাম ১৬ হাজার ডলার, যা দৈনিক আট ঘণ্টা চালালে বছরে বিদ্যুৎ খরচ হয় কেবল ৮২ ডলার।

গবেষণা কোম্পানিটি সতর্ক করে বলেছে, এআই ডেটা সেন্টারের কারণে এমনিতেই চাপের মুখে থাকা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এই রোবটের বহুল ব্যবহার বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, ‘সেমিঅ্যানালিসিস’-এর তথ্য অনুসারে, গবেষণা ও ডেভেলপমেন্টের উপযোগী ইউনিট্রির কাস্টমাইজেএবল ‘জিওয়ান ইডিইউ’ মডেলের কর-পূর্ব দাম গত বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে ২৭ হাজার ৩০০ ডলার করেছে কোম্পানিটি। এত বড় মূল্যছাড়ের পরও কোম্পানিটি ৬৭ শতাংশ মোট মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে।

আরেক গবেষণা কোম্পানি ‘স্মার্ট অ্যানালিটিক্স গ্লোবাল’ বা এসএজি’র প্রতিষ্ঠাতা লিন্ডা সুই বলেছেন, “রোবটের দাম কমে যাওয়া ও চীন সরকারের নীতিগত সহায়তা, যেমন স্থানীয় নির্মাতাদের কায়িক শ্রমের বদলে অটোমেশনে স্থানান্তরিত হতে সরকারি বিনিয়োগ এই উদীয়মান খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াচ্ছ।”

উৎপাদন বাড়ায় উৎপাদন খরচ কমলেও বাণিজ্যিকভাবে এসব রোবটের বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না তা যাচাই করতে আরও সময়ের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউনিট্রির প্রধান শক্তি তাদের বড় পরিসরের উৎপাদন সক্ষমতা ও সাশ্রয়ী খরচ। গেল বছর কোম্পানিটির রাজস্ব চার গুণেরও বেশি হয়েছে। তবে গবেষণা ও বিপণন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রথম প্রান্তিকে তাদের সমন্বিত মুনাফা ৫২ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

এদিকে, সংশয়বাদীরা বলছেন, ইউনিট্রির রোবটের বর্তমান চাহিদার সিংহভাগই সীমাবদ্ধ গবেষণা ও প্রদর্শনীতে। কোম্পানিটির নথি অনুসারে, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে হিউম্যানয়েড রোবট থেকে আসা রাজস্বের প্রায় তিন- চতুর্থাংশই এসেছে গবেষণা ও শিক্ষা খাত থেকে।

অন্যদিকে, শিল্প খাতের যে ছোট ব্যবসায়িক অংশটি রয়েছে তার অর্ধেকেরও বেশি এসেছে কেবল কর্পোরেট ট্যুর বা প্রদর্শনী থেকে।

‘কয়েনএক্স’-এর প্রধান বিশ্লেষক জেফ কো বলেছেন, “অনেক নতুন রোবোটিক্স কোম্পানির মতো না হয়ে ইউনিট্রির রূপকথাটি রাজস্ব বেড়ে যাওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।”

এরপরও তিনি বলেছেন, কোম্পানিটির ৯০০ কোটি ডলারের বিপুল বাজারদর, যা গেল বছর তাদের উপার্জনের ২০০ গুণেরও বেশি তা ক্রিপ্টো বাজারে আরও উঁচুতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা বাজারদর মূল্যায়নে জল্পনাভিত্তিক প্রবণতাকেই নির্দেশ করছে।

রোবট ঘিরে ভূরাজনীতি

গেল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনভিত্তিক হিউম্যানয়েড ও চারওয়ালা রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পদক্ষেপের পরও ইউনিট্রির আইপিও উন্মাদনা থামেনি।

এসএজি’র মতে, এ নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে ইউনিট্রি। কারণ গত বছর তাদের মোট রাজস্বের ১৩ শতাংশই এসেছিল মার্কিন বাজার থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার কাজের জন্য ইউনিট্রির কম দামি রোবটগুলোই ছিল প্রথম পছন্দ। তবে নতুন এ বিধিনিষেধ নিয়ে গবেষকদের খুব একটা উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। কারণ পরীক্ষা ও গবেষণার কাজে আনা ছোট চালানের ক্ষেত্রে ছাড় বহাল রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন ‘হাউস সিলেক্ট কমিটি’র তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কারাগার এবং সামরিক ক্ষেত্রেও ইউনিট্রির চারওয়ালা রোবট ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসএজি’র লিন্ডা সুই বলেছেন, চীনা রোবোটিক্স বিভিন্ন কোম্পানির জন্য আরেকটি বড় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মার্কিন এআই চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া’র হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ হারানো। রোবট চালনার জন্য এনভিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম যারা প্রথমদিকে ব্যবহার শুরু করেছিল চীনা এসব প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের অন্যতম।

ভিপি ব্যাংকের প্রোস বলেছেন, “চীনা রোবট নির্মাতারা এখনও পশ্চিমের যন্ত্রাংশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা কাটানোর মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি।”

বার্নস্টাইনের বিশ্লেষক দিয়েন ওয়াং বলেছেন, হিউম্যানয়েড রোবটের অ্যাকচুয়েটর ও মোটরে ব্যবহৃত বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ উৎপাদনে চীনের যে বৈশ্বিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তা বিভিন্ন চীনা কোম্পানিকে বৈশ্বিক বাজারে বড় এক কৌশলগত সুবিধা দেয়।

হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স শিল্পকে বহু পথ পেরোতে হবে। তবে এ বড় বাজার সম্ভাবনার কারণে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক রোবোটিক্সে আরও জোর দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেমন্ট কারখানায় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রোডাকশন লাইন বদলে তারা এখন সেখানে ‘অপটিমাস’ হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির দিকে যাচ্ছেন, যার আনুষ্ঠানিক উৎপাদন এ বছরের শেষদিকে শুরুর কথা রয়েছে।

অনেক গবেষক বলছেন, ইউনিট্রির ভবিষ্যৎ কেবল হিউম্যানয়েড রোবটের ওপর নির্ভর করছে না। হিউম্যানয়েড তাদের সবচেয়ে বড় ব্যবসা হলেও চারওয়ালা এসব রোবট এখনও তাদের ব্যবসার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।

নির্দিষ্ট কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এসব রোবট শিল্প কারখানার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে। অনিশ্চিত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কঠিন চ্যালেঞ্জ ঠেকানোর জন্যই এসব হিউম্যানয়েড রোবট সবচেয়ে উপযোগী।