Published : 11 Mar 2026, 01:35 PM
গত এক দশকে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ ও একের পর এক সফল অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন। নিজস্ব স্পেস স্টেশন তৈরি থেকে শুরু করে মঙ্গল জয় সবখানেই বেইজিংয়ের জয়জয়কার।
এ লড়াই এখন কেবল মহাকাশে পতাকা ওড়ানোর নয়, বরং প্রযুক্তির শক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার এক নতুন যুদ্ধ।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, চীনের মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রতি বেশ কিছু বড় সাফল্য পেয়েছে। ২০২৫ সালে চীন পৃথিবীর কক্ষপথে ৯০টিরও বেশি উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে, যা এক বছরে তাদের নতুন জাতীয় রেকর্ড।
গেল পাঁচ বছরে প্রথম দেশ হিসাবে চীন চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এনেছে, নিজেদের নিজস্ব লো-আর্থ অরবিট মহাকাশ স্টেশন তৈরি শুরু করেছে এবং মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে একটি রোভারও নামিয়েছে দেশটি।
‘কমার্শিয়াল স্পেস ফেডারেশন’-এর প্রেসিডেন্ট ডেভ কাভোসা বলেছেন, “আমরা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মুখে বারবার তার ‘মহাকাশ জয়ের স্বপ্নের’ কথা শুনছি।
“মহাকাশ বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে চীন এমন দুটি শিল্প হিসেবে দেখছে, যা দেশটিকে বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।”
সম্প্রতি ‘কমার্শিয়াল স্পেস ফেডারেশন’ ও ‘অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ‘নিউস্পেস’ উদ্যোগ যৌথভাবে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের যে একাধিপত্য রয়েছে তা শিগগিরই চীনের কাছে হারিয়ে যেতে পারে।
ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ডেভ কাভোসা বলেছেন, “মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আজও বৈশ্বিক নেতা। আমাদের বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্প ও রকেট উৎক্ষেপণ ক্ষমতা পৃথিবীর মধ্যে সেরা। তবে আমরা দেখছি, চীন আমাদের ধরে ফেলতে খুব দ্রুত এগোচ্ছে। আমরা যদি এখন সঠিক পদক্ষেপ না নেই, তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তারা আমাদের ছাড়িয়ে যাবে।”
মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অরবিটাল গেটওয়ে কনসালটিং’-এর তথ্য অনুসারে, চীনের বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে বিনিয়োগ ছিল কেবল ৩৪ কোটি ডলার, ২০২৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি উৎস মিলিয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮১ কোটি ডলারে।
‘এএসইউ’-এর নিউস্পেস উদ্যোগের গবেষণা বিশ্লেষক ও চীন বিষয়ক মহাকাশ প্রতিবেদনের সহ লেখক জোনাথন রোল বলেছেন, গত এক দশকে চীন তাদের অসামরিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রচেষ্টায় ১০ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
“আপনার মনে তাৎক্ষণিক যে প্রশ্নটি আসবে তা হচ্ছে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কত খরচ করেছে? আমাদের হিসাব বলছে, যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ গুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
“তবে আসল বিষয়টি হচ্ছে, চীন ক্রমাগত নিজেদের খরচের পরিমাণ বাড়িয়েই চলেছে। মহাকাশ বিজ্ঞানে শীর্ষস্থানে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য তাদের রয়েছে সেই দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা।”
চীনে মহাকাশ খাতটি স্থানীয় সরকার, ইউনিভার্সিটি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত এক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে। ফলে পুরো দেশজুড়ে মহাকাশ গবেষণা ও কর্মকাণ্ডের শক্তিশালী এক নেটওয়ার্ক বা হাব তৈরি হয়েছে।
এসব বিশেষ কেন্দ্র বা হাবে রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরির কারখানার পাশাপাশি রয়েছে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও উন্নতমানের ইউনিভার্সিটি।
গবেষক জোনাথন রোল বলেছেন, “২০১৪ সাল থেকে চীনের মহাকাশ খাতে এক অভাবনীয় জোয়ার শুরু হয়েছে। সেই বছর দেশটির এক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ডকুমেন্ট ৬০’ নামে বিশেষ এক নীতিমালা প্রকাশ করে। ওই নীতিমালার মাধ্যমেই মহাকাশ খাতকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও মালিকানার জন্য খুলে দেওয়া হয়।”
চীন এখন রকেট তৈরির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। দেশটিতে বর্তমানে এক ডজনেরও বেশি রকেট প্রস্তুতকারক প্রাইভেট কোম্পানি রয়েছে। যাদের মধ্যে কয়েকটি ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর মতো পুনব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরির কাজ করছে।
স্যাটেলাইট অবকাঠামো তৈরিতেও বড় উন্নতি করছে চীন।
২০২০ সালে চীন নিজেদের নিজস্ব বৈশ্বিক ন্যাভিগেশন সিস্টেম ‘বেইডৌউ’-এর জন্য প্রয়োজনীয় শেষ স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করেছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস-এর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।
এ ছাড়া হাজার হাজার ইন্টারনেট স্যাটেলাইট তৈরির কাজও চলছে। তবে এর বেশিরভাগই এখনও উৎক্ষেপণ করা বাকি, যা ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর ‘স্টারলিংক’-এর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করবে।
মহাকাশ এখন চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগেরও একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে শি জিনপিং এ উদ্যোগটি চালু করেছিলেন, যা চীনের বৈশ্বিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক পরিধি বাড়াতে নেওয়া বড় এক আন্তর্জাতিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি।
গবেষক জোনাথন রোল বলেছন, “চীন দীর্ঘ সময় ধরে অন্য দেশের জন্য স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণ করে আসছে। তবে এখন তারা বিভিন্ন দেশে গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি শুরু করেছে। মিশর ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব স্থাপনা তৈরি করে দিয়েছে।
“পাশাপাশি তারা বেইডৌউ-এর প্রযুক্তি, সেবা ও মানদণ্ড ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক দেশকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসছে। একে এক ধরনের ‘সফট পাওয়ার’ বা কূটনৈতিক পরিভাষায় ‘গ্রে পাওয়ার’ও বলা যেতে পারে।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এখনও অনেক কিছু করার আছে, যার মধ্যে রয়েছে মহাকাশ বন্দরগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ এবং স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা।
ডেভ কাভোসা বলেছেন, “বর্তমান এই মহাকাশ প্রতিযোগিতা কেবল পতাকা ওড়ানো বা চাঁদে পায়ের ছাপ রাখার লড়াই নয়, বরং এ লড়াইয়ে সেই দেশই জিতবে, যারা সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্প গড়ে তুলতে পারবে।”