১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মানুষের চেয়ে এআইয়ের লেখা গল্প বেশি পছন্দ পাঠকদের: গবেষণা

পাঠকদের গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা এই অনুমানের নির্ভুলতায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। তবে এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা যাদের বেশি তারা নিখুঁত অনুমান করতে পেরেছেন।

মানুষের চেয়ে এআইয়ের লেখা গল্প বেশি পছন্দ পাঠকদের: গবেষণা
এআই সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা পাঠকরা চ্যাটজিপিটির লেখা গল্পে উচ্চ রেটিং দিয়েছেন। ছবি: এআই

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2026, 02:35 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

হোমারের অডিসি থেকে শুরু করে আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা গল্প। বইয়ের সেলফ সমৃদ্ধ করতে যুগে যুগে অগুণতি গল্প তৈরি করেছে মানুষ।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেই জায়গায় মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্যে এবার বড় ধরনের ভাগ বসাতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, চ্যাটজিপিটি বা এআইয়ের তৈরি ছোটগল্প মানুষের লেখা গল্পের চেয়ে বেশি মানসম্মত বলে মনে করছেন পাঠকরা– এমনই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘জাজমেন্ট অ্যান্ড ডিসিশন মেকিং’ সাময়িকীতে।

এ গবেষণায় ১ হাজার ৬৮২ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ছয়টি ছোটগল্পের যে কোনো একটি পড়তে দেওয়া হয়। যার মধ্যে তিনটি গল্প লিখেছেন মানুষেরা, আর বাকি তিনটি তৈরি করেছে ওপেনএআইয়ের এআই চ্যাটজিপিটি।

পাঠকদেরকে দেওয়া প্রতিটি এআইনির্মিত গল্পের বিষয়বস্তু ছিল মানুষের লেখা গল্পগুলোর মতোই। গবেষক দল পাঠকদের আগেই জানিয়ে দিয়েছিল কোনটি মানুষের আর কোনটি এআইয়ের লেখা গল্প। তবে এক্ষেত্রে সব তথ্য সঠিক ছিল না।

এরপর গল্পটি পড়তে পাঠক কতটা মগ্ন ছিলেন, কতটুকু আকর্ষণীয় এবং এর সার্বিক মান কেমন সে বিষয়ে রেটিং দিতে বলা হয়।

গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, যারা এআইয়ের তৈরি গল্প পড়েছেন তারা এটাকে মানুষের লেখা গল্পের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও উন্নতমানের বলে রেটিং দিয়েছেন। এদিকে, এআইয়ের যে গল্পটি ‘মানুষের লেখা’ বলে পাঠকদের জানানো হয়েছিল সেটাকে তারা সার্বিকভাবে বেশি রেটিং দিয়েছেন।

এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও ‘ভিলানোভা ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’র ড. ডিনা স্কোলনিক ওয়াইসবার্গ বলেছেন, “এসব এআই সিস্টেম এখনই এমন ছোটগল্প তৈরি করতে পারে, যা মানুষের লেখা গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ভালো। ফলে এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনা উচিত।”

তবে নিজে একজন সৃজনশীল লেখক হওয়ায় ড. ওয়াইসবার্গ এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এর মানে এই নয় যে লেখালেখির পুরো দায়িত্ব এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

তার ভাষ্য, প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন উপন্যাস মানুষের লেখা উপন্যাস থেকে শেষ পর্যন্ত কিছুটা ভিন্ন ধাঁচেরই হবে।

ড. ওয়াইসবার্গ বলেছেন, “ভবিষ্যতে এআইয়ের তৈরি বা এআই ও মানুষের যৌথ প্রয়াসে লেখা উপন্যাসের জন্য আমাদের জায়গা করে দিতে হতে পারে। তবে মানুষের নিজস্ব সৃজনশীলতাকে কদর করার দিন শেষ হয়ে গেছে বিষয়টি এমন নয়।

“মানুষ নিজের সৃজনশীল অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে, নিজেকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে অনুধাবনের তাগিদ থেকেই লেখালেখি করে। এআই মানুষের মতো গল্প তৈরি করতে পারছে বলেই সেই সত্য বদলে যায় না।”

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, এআই সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা পাঠকরা চ্যাটজিপিটির লেখা গল্পে উচ্চ রেটিং দিয়েছেন, যা থেকে প্রমাণ মেলে প্রযুক্তির প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত মনোভাব মূল্যায়নের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

এরপর আরও দুটি পরীক্ষা চালিয়েছেন গবেষকরা, যেখানে ৯০৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে ছয়টি গল্পের মধ্যে একই বিষয়ের দুটি করে গল্প দেওয়া হয়, যার একটি মানুষের ও অন্যটি এআইয়ের তৈরি। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোনটি মানুষের ও কোনটি এআইয়ের লেখা।

পরীক্ষায় কেবল ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিলেন, যা অনুমানের চেয়েও খারাপ ফল। অন্যদিকে দ্বিতীয় পরীক্ষায় প্রায় ৫২ শতাংশ সঠিক অনুমান করেন।

গবেষকরা লিখেছেন, “পাঠকরা মানুষের লেখা ও এআইয়ের তৈরি গল্পের পার্থক্য সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছেন এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।”

পাঠকদের গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা অনুমানের নির্ভুলতায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। তবে এআই প্রযুক্তি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা যাদের বেশি ছিল তারা নিখুঁত অনুমান করতে পেরেছেন।

এ বিষয়ে ড. ওয়াইসবার্গ বলেছেন, “এআইয়ের লেখার নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে, যা চর্চার মাধ্যমে চিনে নেওয়া সম্ভব, ঠিক যেভাবে আমরা বিভিন্ন লেখকের লেখার নিজস্ব ভঙ্গি চিনে নিই।”

তিনি বলেছেন, মানুষের লেখা গল্পের প্রতি পাঠকদের মানসিক আগ্রহ থাকে ‘মৌলিকত্ব’ বা ‘অকৃত্রিমতার’ টানে। তবে বাস্তবে তারা এআইয়ের লেখা গল্প বেশি পছন্দ করছেন, কারণ সেগুলো পড়তে ও বুঝতে সহজ।

তবে ‘ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম’-এর ফিল্ম অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিভাগের অধ্যাপক লুক কেনার্ড বিষয়টিকে তীব্র বিতর্কিত বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, “আমরা মানুষ বলে স্বভাববশতই এআইকে মানবিক রূপ দিয়ে চিন্তা করি এবং এটাকে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ বা নিরপেক্ষ অবয়বের উজ্জ্বল রোবট মনে করি।

“অথচ বাস্তবে এআই চুরি করা বড় ডেটাবেইসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি উৎপাদক কোড ছাড়া কিছুই নয়। পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও ডেটা সেন্টারে এসব চালিত হয়, যার আশপাশের এলাকার মানুষের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব রয়েছে।”

এআইকে বানান সংশোধন বা প্রতিশব্দ খোঁজার মতো সাধারণ কোনো ‘টুল’ না বলে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন কেনার্ড। 

তিনি এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

“সঠিক প্রম্পট ও ঘষাঘষির পর এআই চমৎকার ও উপভোগ্য কবিতা বানিয়ে দিতেই পারে। হাজার বছরের মানব সভ্যতা তৈরির ওপর ভিত্তি করে যাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তার পক্ষে এমনটা না পারাটাই লজ্জার বিষয় হত। ফলে আমাদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত এত কিছুর পর এআই কি সত্যিই মূল্যবান? উত্তর হচ্ছে, কোনোভাবেই নয়।”