১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বারবার ক্লোনিংয়ে জেনেটিক ত্রুটি বাড়ে, বলছে দুই দশকের গবেষণা

৫৮তম প্রজন্মের ক্লোন ইঁদুরগুলো জন্ম নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যায়। তবে বাইরে থেকে এদের দেহে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি।

বারবার ক্লোনিংয়ে জেনেটিক ত্রুটি বাড়ে, বলছে দুই দশকের গবেষণা
বারবার ক্লোনিংয়ের ফলে দেহে মারাত্মক জেনেটিক মিউটেশন বা বংশগত পরিবর্তন ঘটে। ছবি: ফ্রিপিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Apr 2026, 02:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:22 PM

ইঁদুরের ওপর দীর্ঘ ২০ বছরের এক গবেষণায় ক্লোনিংয়ের মারাত্মক সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেয়েছেন জাপানি বিজ্ঞানীরা।

তাদের দাবি, টানা ২০ বছর ধরে ইঁদুরের ওপর ক্লোনিং চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বারবার ক্লোনিংয়ের ফলে দেহে মারাত্মক জেনেটিক মিউটেশন বা বংশগত পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমা হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রয়টার্স লিখেছে, ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাপানে পরিচালিত এ গবেষণায় একটি মাত্র দাতা ইঁদুর থেকে মোট ১ হাজার ২০৬টি ক্লোন ইঁদুর তৈরি করা হয়। প্রথম ২৫টি প্রজন্ম পর্যন্ত বাইরে থেকে কোনো সমস্যা বোঝা যায়নি। তবে এরপর থেকে মিউটেশনগুলো এত বেশি জমা হতে থাকে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

৫৮তম প্রজন্মের ক্লোন ইঁদুরগুলো জন্ম নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যায়। তবে বাইরে থেকে এদের দেহে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি।

এ গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, ক্লোন করা প্রাণী কখনোই মূল দাতা প্রাণীর হুবহু নকল নয়। বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ক্ষতি ছাড়া অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্লোনিং চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।

এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ইয়ামানাশি’-এর জীববিজ্ঞানী তেরুহিকো ওয়াকায়ামা বলেছেন, “এর আগে কেউ এত দীর্ঘ সময় ধরে বারবার ক্লোনিং চালিয়ে যাননি। ফলে আমরাই প্রথম বিষয়টি আবিষ্কার করেছি যে, বারবার করা ক্লোনিংয়েরও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা বা শেষ সীমা রয়েছে।

“একসময় ধারণা করা হত, বিভিন্ন ক্লোন হুবহু মূল প্রাণীর মতোই হয়। তবে এ গবেষণায় স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে, স্বাভাবিক প্রজননের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া প্রাণীর তুলনায় ক্লোন করা প্রাণীর দেহে মিউটেশনের হার তিন গুণ বেশি।

“যেহেতু এসব মিউটেশন ক্রমাগত জমা হতে থাকে ফলে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। উদ্ভিদ বা নিম্নস্তরের প্রাণীদের মতো কেন স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে বংশধারা ধরে রাখতে পারে না, এ গবেষণা তার অন্যতম একটি কারণ উন্মোচন করেছে।”

প্রথম ক্লোনটি তৈরির পর গবেষকরা প্রতি তিন থেকে চার মাস অন্তর এ প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তার আগের প্রজন্মের ইঁদুর থেকে ক্লোন করা হয়েছিল। মূল দাতা ইঁদুরটির মতো ক্লোন করা সব ইঁদুরই ছিল বাদামী লোমের মেয়ে ইঁদুর।

২০১৩ সালে গবেষকরা প্রথম ২৫টি প্রজন্মের ওপর ভিত্তি করে এক প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন। ওই সময় দেখা গিয়েছিল, ক্লোনগুলো সুস্থ আছে ও এদের মধ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই।

ওয়াকায়ামা বলেছেন, “ওই সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ক্লোনিং হয়ত অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে সেই গবেষণায় আমরা জিনগত বিন্যাস পরীক্ষা করে দেখিনি। আরও ১৩ বছর আমাদের গবেষণা চালিয়ে যাই ও এর ফলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের আগের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। ক্লোনিংয়ের নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।”

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লোনগুলোর বাচ্চার সংখ্যা কমতে শুরু করে, যা এদের শরীরে জমা হওয়া মিউটেশনের ক্ষতিকর প্রভাবকেই তুলে ধরে। ছবি: রয়টার্স

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লোনগুলোর বাচ্চার সংখ্যা কমতে শুরু করে, যা এদের শরীরে জমা হওয়া মিউটেশনের ক্ষতিকর প্রভাবকেই তুলে ধরে

জেনেটিক স্তরে ঠিক কী ঘটছে তা বোঝার জন্য গবেষকরা বিভিন্ন প্রজন্মের ১০টি ক্লোন ইঁদুরের জিনোম সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএ বিন্যাস পরীক্ষা করেছেন।

তারা দেখতে পান, বারবার ক্লোনিংয়ের বিষয়টি অনেকটা ফটোকপি মেশিন দিয়ে একটি ছবি বারবার কপি করার মতো। প্রথম কপিটি মূল ছবির চেয়ে সামান্য ঝাপসা হয়। সেই কপি থেকে যখন আবার নতুন কপি হয় তখন এর মান আরও কমে যায়। এভাবে বারবার কপি করতে থাকলে এক সময় তা মূল ছবির চেয়ে একদম আলাদা হয়ে যায়।

গবেষকরা বলছেন, গবেষণার এসব ফলাফল থেকে প্রমাণ মেলে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষতিকর জেনেটিক মিউটেশন বা বংশগত ত্রুটি ঠেকাতে স্বাভাবিক যৌন প্রজনন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লোন ইঁদুরগুলোর প্রজনন সক্ষমতা যাচাই করতে গবেষকরা সেগুলোকে সাধারণ পুরুষ ইঁদুরের সঙ্গে মিলন ঘটান। দেখা যায়, ২০তম প্রজন্ম পর্যন্ত তারা সাধারণ মেয়ে ইঁদুরের মতোই গড়ে ১০টি করে বাচ্চার জন্ম দিচ্ছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লোনগুলোর বাচ্চার সংখ্যা কমতে শুরু করে, যা এদের শরীরে জমা হওয়া মিউটেশনের ক্ষতিকর প্রভাবকেই তুলে ধরে।

গবেষকরা এসব ক্লোন তৈরিতে ‘নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ নামের পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে স্কটল্যান্ডের এক গবেষণাগারে প্রথম সফলভাবে ক্লোন করা স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘ডলি’ নামের ভেড়া ও ১৯৯৮ সালে হাওয়াইয়ের এক ল্যাবে প্রথম ক্লোন করা ইঁদুর ‘কিউমুলিনা’ তৈরিতেও একই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল।

‘নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ প্রযুক্তিতে গবেষকরা প্রথমে একটি ডিম্বাণু থেকে এর নিজস্ব নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে ফেলেন। এরপর দাতা বা ডোনার কোষ থেকে নিউক্লিয়াসটি, যা কোষের বংশগত তথ্যের প্রধান আধার তা সেই ডিম্বাণুতে বসিয়ে একটি ভ্রূণ তৈরি করেন।

এ ক্লোনিংয়ের কাজে ‘কিউমুলাস’ নামের বিশেষায়িত এক ডিম্বাশয় কোষ ব্যবহৃত হয়েছিল, যা ডিম্বাণুর চারপাশ জুড়ে থাকে ও এর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

গবেষক ওয়াকায়ামা বলেছেন, “আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, অসীম সংখ্যক ক্লোন তৈরি করা সম্ভব। সে কারণে গবেষণার এসব ফলাফল আমাদের জন্য হতাশাজনক। এই মুহূর্তে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার কোনো উপায় আমাদের জানা নেই। আমার ধারণা, আমাদের এমন এক নতুন পদ্ধতি তৈরি করা দরকার, যা নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার প্রযুক্তিকে উন্নত করবে।”

গবেষণায় ২৭তম প্রজন্ম থেকে বড় ধরনের ক্ষতিকর মিউটেশন বাড়তে শুরু করে, যার মধ্যে ক্রোমোজোমগত অস্বাভাবিকতাও ছিল। যেমন একটি এক্স ক্রোমোজোম হারিয়ে গিয়েছিল। ক্রোমোজোম হচ্ছে সুতার মতো গঠন, যা এক কোষ থেকে অন্য কোষে বংশগত তথ্য বহন করে।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে স্ত্রী প্রাণীরা দুটি এক্স ক্রোমোজোম বহন করে, যার একটি সে তার মায়ের কাছ থেকে ও অন্যটি বাবার কাছ থেকে পায়।

গবেষক ওয়াকায়ামা বলেছেন, “ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রে সব জিন পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। যার অর্থ সব ত্রুটিপূর্ণ জিনও একইভাবে পরবর্তী প্রজন্মে চলে যায়।”