Published : 10 Dec 2025, 01:26 PM
সবচেয়ে বিপজ্জনক ও চিকিৎসা করা কঠিন এমন ক্যান্সারের মধ্যে একটি হচ্ছে প্যানক্রিয়াটিক বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার। এত মারাত্মক হওয়ার কারণ, বেশিরভাগ সময় শরীরে নীরবে বাড়ে ও প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্যান্সার শনাক্ত করা কঠিন।
এ রোগের কারণ কী তা বোঝার জন্য এবং জীবনধারার কিছু অভ্যাস যেমন মদ্যপান এ রোগের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন অনেক বিজ্ঞানী।
কোনো ডিনার পার্টিতে, উৎসবে বা কাজের পর আরামের জন্য দেশেবিদেশে অনেকের জন্যই মাঝেমধ্যে অ্যালকোহল পানের বিষয়টি সাধারণ। তবে জানা জরুরি, অ্যালকোহল শরীরের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে অগ্ন্যাশয়ের ওপর। আকারে ছোট হলেও দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ অগ্ন্যাশয়, যা মানুষের খাবার হজমে সাহায্য করে ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, অ্যালকোহল শরীরে প্রবেশ করলে তা দ্রুত রক্তপ্রবাহে মিশে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে যায়, যার মধ্যে অগ্ন্যাশয়ও রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান অগ্ন্যাশয়কে উত্তেজিত করে এবং সেখানে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। এ প্রদাহকেই বলে প্যানক্রিয়াটাইটিস।
কেউ দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে এই প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যা সহজে সেরে ওঠে না। এ অবস্থাকে বলে ‘ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস’, যা প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় বলে নানা গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে।
অন্যভাবে বললে, অ্যালকোহল নিজে সরাসরি প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের কারণ নয়, বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ তৈরি করে যে ক্ষতি করে সেটিই মূল ঝুঁকির কারণ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে যারা অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসে ভোগেন পরবর্তীতে তাদের প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
তবে, অ্যালকোহল পান করলে সবাই যে প্যানক্রিয়াটাইটিস বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন বিষয়টি এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে একজন মানুষ কতটা ও কত ঘন ঘন অ্যালকোহল পান করেন তার ওপর। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডোজ-নির্ভর’ প্রভাব, অর্থাৎ যত বেশি পরিমাণে ও দীর্ঘ সময় ধরে কেউ অ্যালকোহল পান করবেন ঝুঁকি তত বাড়বে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমিত পরিমাণে অ্যালকোহল পান, যেমন নারীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ একটি ও পুরুষদের সর্বোচ্চ দুটি ড্রিংক সাধারণত বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় না। তবে অতিরিক্ত মদ্যপান বা ‘বিঞ্জ ড্রিংকিং’ বা দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল পানের বিষয়টি ভিন্ন। এসব অভ্যাসের সঙ্গে প্যানক্রিয়াটাইটিস ও প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার উভয়েরই স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।
এর সঠিক কারণ এখনও গবেষণাধীন পর্যায়ে রয়েছে। তবে অন্যতম কারণ হল প্রদাহ। দীর্ঘ সময় ধরে অ্যালকোহলের কারণে অগ্ন্যাশয়ে বারবার উত্তেজনা ও প্রদাহ হলে সেখানে দাগ পড়ে ও টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও ক্ষতি কোষের ভেতরে পরিবর্তন আনতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। কিছু মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা যদি অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করেন তবে তাদের অগ্ন্যাশয়ে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতার মতো বিভিন্ন অভ্যাস অতিরিক্ত মদ্যপানের সঙ্গে মিলে হয়ে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
সুখবর হচ্ছে এসব ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিতভাবে অ্যালকোহল পান বা পান না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের অগ্ন্যাশয়কে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে এবং প্রদাহ বা ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়।
গবেষকরা বলছেন, কারও যদি আগে থেকেই অগ্ন্যাশয়ের সমস্যা থাকে বা পরিবারের কারও এই রোগের ইতিহাস থাকে তবে অ্যালকোহল বন্ধ করাই বুদ্ধিমান ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।