সামিট-ইউনাইটেড পাওয়ারসহ এবার উঠল ২৩ কোম্পানির ‘ফ্লোর’
যে ১২ কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বহাল আছে, তার মধ্যে আছে বেক্সিমকো লিমিটেড, কেপিসিএল, ইসলামী ব্যাংক, গ্রামীণফোন, রবি, ওরিয়ন ফার্মা, রেনাটা।
শেয়ারের সর্বনিম্ন দর তুলে দেওয়া হলো আরো ২৩টি কোম্পানির। ফলে এখন কেবল ১২টি কোম্পানির দর ‘কৃত্রিমভাবে’ ধরে রাখা হবে।
সাড়ে তিনশরও বেশি কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্য তুলে দেওয়ার পর দুই দিন বাজারের আচরণ দেখে সোমবার এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। মঙ্গলবার থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
যেসব কোম্পানির ফ্লোর নতুন করে তুলে দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ছয়টি বস্ত্র খাতের। এগুলো হল: এনভয় টেক্সটাইল, এইচআর টেক্সটাইল, কাট্টলি টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, সায়হাম কটন ও শাশা ডেনিমস।
এর ফলে এই খাতের ৫৮টি কোম্পানির মধ্যে কোনোটির ফ্লোর প্রাইস থাকছে না।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচটি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। এগুলো হল: বারাকা পাওয়ার, ডরিন পাওয়ার, পদ্মা অয়েল, সামিট পাওয়ার ও ইউনাইটেড পাওয়ার।
ফলে এই খাতের ২৩টি কোম্পানির মধ্যে ২০টির শেয়ারদরে কোনো নিম্ন সীমা নেই।
তৃতীয় সর্বোচ্চ তিনটি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তোলা হয়েছে আর্থিক খাতে। এগুলো হল: ডিবিএইচ, আইডিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স।
এই খাতেরও ২৩টি কোম্পানির কোনোটিতে এখন আর ফ্লোর প্রাইস নেই।
তিনটি কোম্পানির ফ্লোর তোলা হয়েছে প্রকৌশল খাতেও। এগুলো হল: বিএসআরএম স্টিল, কেডিএস এক্সেসরিজ ও ন্যাশনাল পলিমার।
এই খাতের ৪২টি কোম্পানির মধ্যে এখন ৪০টির শেয়ারের কোনো সর্বনিম্ন দর নেই।
এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতের বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি এবং বিবিধ খাতের ইনডেক্স অ্যাগ্রোর ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে।
বীমা খাতের সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স, সিমেন্ট খাতের কনফিডেন্স সিমেন্ট, সিরামিকস খাতের শাইনপুকুর সিরামিকস এবং কাগজ ও প্রকাশনা খাতের সোনালী পেপারের ফ্লোর প্রাইসও তুলে দেওয়া হয়েছে।
এসব খাতে কোনো কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন দর আর রইল না।
যে ১২ কোম্পানিতে এখনো বহাল
মঙ্গলবার থেকে জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বেশি তিনটি কোম্পানিতে ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকবে। এগুলো হল: শাহজিবাজার পাওয়ার, কেপিসিএল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি আছে দুটি করে।
প্রকৌশল খাতের দুই কোম্পানি হল: আনোয়ার গ্যালভানাইজিং ও বিএসআরএম লিমিটেড; টেলিযোগাযোগ খাতের দুই কোম্পানি হল: গ্রামীণফোন ও রবি; ওষুধ ও রসায়ন খাতের দুই কোম্পানি হল: ওরিয়ন ফার্মা ও রেনাটা।
এছাড়া ব্যাংক খাতের ইসলামী ব্যাংক ও খাদ্য খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো এবং বিবিধ খাতের বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারদর বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন সীমার নিচে নামতে পারবে না।
কী বলছে বিএসইসি
এক ডজন কোম্পানির ‘ফ্লোর’ রেখে বাকিগুলো উঠিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ফ্লোর তোলার পূর্বে নানা-হিসেব করে দুটি চ্যালেঞ্জ দেখতে পাই। একটি হচ্ছে মার্জিন ঋণের ফোর্সড সেল আরেকটি হচ্ছে প্যানিক সেল।
‘‘দুটি চ্যালেঞ্জকে সামাল দিতে কমিশনের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রত্যক্ষ পদক্ষেপের মধ্যে ছিল পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল-সিএমএসএফ থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। আর পরোক্ষ পদক্ষেপের মধ্যে বাজার মধ্যস্তকারীদের উৎসাহ দেয়া হয়েছে নতুন বিনিয়োগ করা ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা। প্যানিক সেল (আতঙ্ক হয়ে বিক্রি করা) নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি আমরা। আর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নেয়ায় আশা করছি ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফেরার প্রবণতা বাড়বে।’’
১২টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস রেখে দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে রেজাউল বলেন, ‘‘আগামী কয়েক দিনের লেনদেন ও বাজার পরিস্থিতি দেখে কমিশন ফের সিদ্ধান্ত নেবে। ফ্লোর ধরে রাখা কোম্পানিগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীও রয়েছেন। বাজারের প্রতি তারা যেন নেতিবাচক না হন, তাই পরের ধাপে এসব কোম্পানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’’
৩৫৭ কোম্পানির ফ্লোর তোলার কী প্রভাব
ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর টানা দরপতনের মুখে ২০২২ সালের ৩১ জুলাই দ্বিতীয়বারের মতো সব শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর লেনদেনের খরা নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৩৫টি বাদে সব কোম্পানির ফ্লোর তুলে দেওয়া হয়।
রোববার প্রথম কর্মদিবসে লেনদেনের শুরুতেই বাজার ধপাস করে পড়ে। মুহূর্তেই ডিএসইর সাধারণ সূচক ডিএসইএক্স কমে ২১৬ পয়েন্ট। তবে দিন শেষে সেখান থেকে পুনরুদ্ধার হয় ১২০ পয়েন্ট।
৯৬ পয়েন্ট সূচক পতনের স্মৃতি নিয়ে সোমবার লেনদেনের শুরুতে কমে আরো ৫১ পয়েন্ট। তবে দিন শেষে ১৪ পয়েন্ট যোগ হয়ে শেষ হয় লেনদেন। আগের দিন ৯৬ পয়েন্ট কমে যাওয়ার পর এটি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস যোগাবে বলেই বিশ্বাস করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
কেবল সূচক বৃদ্ধি নয়, ছয় মাস পর লেনদেন আবার হাজার কোটির ঘর ছাড়িয়েছে।
সকালে ১০ শতাংশের কাছাকাছি দর হারিয়ে ফেলা বেশ কিছু কোম্পানির দর দিন শেষে ১০ শতাংশ বেড়েছে, বিপুল সংখ্যক ক্রেতার দেখাও মিলেছে।
এই হিসাবে প্রথম এসব কোম্পানির দর তার আগের ফ্লোর প্রাইসে ফিরে এসেছে, কিন্তু এতদিন ক্রেতা না থাকলেও এখন তা আছে।
আবার ফ্লোর উঠার পর শেয়ারের ক্রেতার দেখা মিলেছে, দামও বেড়েছে, এমন কোম্পানিও আছে।
দিন শেষে লেনদেনের পরিমাণই বলে দিচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সক্রিয় হয়েছেন ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীরাও।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর আতঙ্কে শেয়ারদরের ব্যাপক পতন শুরু হলে ফ্লোর প্রাইস দিয়ে দরপতন ঠেকানো হয়েছিল। ওই বছরের শেষ প্রান্তিকে বাজার চাঙা হয়ে উঠলে ধাপে থাপে ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া হয়।
তবে দ্বিতীয় দফা ফ্লোর প্রাইস থাকল দেড় বছরেরও বেশি।
