Published : 04 Jun 2026, 02:04 PM
পুঁজিবাজারকে ‘নতুনভাবে সাজানোর’ অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে হিসাববিদ ও ঝানু করপোরেট পেশাদার মাসুদ খানকে বেছে নিল বিএনপি সরকার।
আর এই যাত্রায় কমিশনার হিসেবে তার সঙ্গী হচ্ছেন নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক।
মাসুদ খান ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের বোর্ডে প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া নাফিজ আল তারিক এতদিন ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ২০১০ সালে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। আর তানভীর হাবিব রহমান আশা ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বৃহস্পতিবার সকালে পদত্যাগ করেন। একইদিন চার কমিশনারও দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন।
এর কয়েক ঘণ্টা বাদে মাসুদ খানকে চেয়ারম্যানের এবং তিনজনকে কমিশনারের দায়িত্ব দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
আদেশে বলা হয়, অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হল।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষপদে পরিবর্তনের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকার রাশেদ মাকসুদকে ২০২৪ সালের ১৮ অগাস্ট বিএসইসির নেতৃত্বে আনে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
এর আগে ২০২৪ সালের ২ জুন মু. মহসীন চৌধুরী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৮ অগাস্ট মো. আলী আকবর, ৩ সেপ্টেম্বর ফারজানা লালারুখ এবং ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই মো. সাইফুদ্দিন কমিশরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর নতুন করে ঢেলে সাজানো শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নতুন মুখ এলে বিএসইসির শীর্ষ পদেও পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল সংসদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল ২০২৬ পাস হয়, যার মাধ্যমে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বয়সসীমা তুলে নেওয়া হয়।
তখন আলোচনা শুরু হয়, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ পেশাজীবীদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই সরকার ওই বয়সসীমা তুলে দিয়েছে।
সেই সময় ৭০ বছরের বেশি বয়সি এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খানের নাম সবার সামনে চলে আসে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গত মাসেই বলেছিলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
এর মধ্যে গেল ২ জুন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও দুই সপ্তাহের মধ্যে পুনর্গঠন করা হবে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে।
“আমরা বাজারকে নতুনভাবে সাজাচ্ছি। নিয়োগ পেতে যাওয়া একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের সবাই পেশাদার ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকেই পুঁজিবাজার বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ।”
এসব আলোচনা চললেও রাশেদ মাকসুদ স্বাভাবিক নিয়মেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারভিত্তিক সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ঈদ পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় করার কথা ছিল।
বেলা ১১টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মধ্যে কেউ অফিসে আসেননি। বিষয়টি নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যেই রাশেদ মাকসুদ পদত্যাগের কথা জানিয়ে মুখপাত্রের মাধ্যমে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠান।
সেখানে বলা হয়, “গত ২১ মাস ধরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও কাজে মনোনিবেশ করার জন্য এই সরকারি পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
চেয়ারম্যানের পাশাপাশি কমিশনার পদে থাকা মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিনও এদিন পদত্যাগ করেন। এরপর নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান চার দশকের বেশি সময় শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় কোম্পানিতে কাজ করেছেন ।
ইউনিলিভার কনজুমারের আগে তিনি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশে চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে ফাইন্যান্স ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে তিনি কাজ করেছেন ২০ বছর।
মাসুদ খান সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড এবং কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) স্বতন্ত্র পরিচালক এবং নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন।
চার দশকের বেশি সময় ধরে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশে (আইসিএবি) পাঠদান করে আসছেন মাসুদ খান।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খান কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব কমার্স (অনার্স) ডিগ্রি পান। ১৯৭৭ সালে সর্বভারতীয় সিএ পরীক্ষায় তিনি রৌপ্য পদক অর্জন করেছিলেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব সার্টিফায়েড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসের (অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড) একজন ফেলো।