১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি বন্ডের বাজার উন্নয়নের ‘সমীক্ষায়’ আইএমএফ

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফ মনে করছে, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন হলে ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ হবে উদ্যোক্তাদের। এতে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের চাপ কমে গিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসবে।

সরকারি বন্ডের বাজার উন্নয়নের ‘সমীক্ষায়’ আইএমএফ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Jul 2023, 05:29 PM

Updated : 06 Jul 2023, 10:56 PM

সরকারি বন্ডের বাজার উন্নয়নে সমীক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফের কর্মকর্তারা। তারা এই বন্ডকে অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে দেখছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দলের বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক এ কথা জানান।

আইএমএফ এর ৭ সদস্যর প্রতিনিধি দলে বন্ড বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের দুই জন বিশেষজ্ঞও রয়েছে।

এই সফরের উদ্দেশ্য বন্ড মার্কেট জানিয়ে মেজবাউল হক বলেন, “সরকারি বন্ডের সেকেন্ডারি মার্কেট কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়েই আইএমএফ টিম বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছেন। সরকারি বন্ড মার্কেট উন্নত হলে বেসরকারি বন্ড মার্কেটও উন্নত হবে।”

পুঁজিবাজারে সীমিত পরিসরে সরকারি বন্ডের লেনদেন শুরু হয়েছে সম্প্রতি। সরকারি বন্ডের দ্রুত তালিকাভুক্তি ও লেনদেন সহজ করে বন্ড মার্কেট উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েছে আইএমএফ। এজন্য পুজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় এর সঙ্গেও বৈঠক করছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

পুঁজিবাজারে বন্ডের লেনদেনের সর্বনিম্ন আকার এক লাখ টাকা ও প্রতি লেনদেন ফি এক হাজার টাকা। জনপ্রিয় করতে বন্ডের লটের আকার ও লেনদেন ফি কমিয়ে আনার দাবি করে আসছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফ মনে করছে, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন হলে ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ হবে উদ্যোক্তাদের। এতে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের চাপ কমে গিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসবে।

দেশে বন্ড মার্কেট ততটা শক্তিশালী না হওয়ায় উদ্যোক্তারা এখনও ব্যাংকমুখী। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ-আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের চেয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের অনুপাত অনেক নিচে।

জাপানে এ হার জিডিপির ২৪১ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ১৬৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ১১৫ শতাংশ, ভারতে ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশে এটি ৮ শতাংশ। এই ৮ শতাংশের মধ্যে ৭ দশমিক ৯ শতাংশই সরকারি পর্যায়ের। বেসরকারি খাতে বন্ডের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

Image

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক

আইএমএফ প্রতিনিধি দলের ধারাবাহিক বৈঠক চলবে আগামী ১৭ জুলাই পর্যন্ত।

মূল উদ্দেশ্য বন্ড মার্কেট হলেও এসব বৈঠকের সূচিতে মুদ্রানীতির বাস্তব কার্যকারিতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে তার ফ্রেমওয়ার্ক, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের মতো বিষয় রাখা হয়েছে।

বিনিময় হার বাজারমূখী করা ও মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন ইস্যুতে আইএমএফর প্রতিনিধি দলের কোনো আলোচনা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে মেজাবাউল হক বলেন, “এসব বিষয় নিয়ে এবারে কোনো আলোচনা হয়নি। তারা টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট করতে এসেছেন বন্ড মার্কেট নিয়ে।’’

ঋণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব আইএমএফ এর মান অনুযায়ী ‘বিপিএম সিক্স’ পদ্ধতিতে চলতি জুলাই মাস থেকে সংরক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তা প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

এবারের সফরে বিপিএম সিক্স পদ্ধতি মানা হচ্ছে কি-না তা দেখবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় হবে আগামী অক্টোবর মাসে।

এরই মধ্যে ছাড় করা অর্থের ব্যবহার ও আর্থিক খাতের সংস্কারে নেওয়া উদ্যোগগুলোও দেখবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়ে গত জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ এর সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে যায় বাংলাদেশ।

গত ফেব্রুয়ারিতে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার ছাড় করেছে আইএমএফ। বাকি অর্থ ছাড় করবে আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে।

ঋণ সমঝোতা অনুযায়ী প্রতি কিস্তি ছাড়ের পূর্বে আগের কিস্তিতে দেওয়া অর্থের ব্যবহারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে আইএমএফ।

আন্তর্জাতিক এ সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই ঋণ পেতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোসহ আর্থিক খাতের কাঠামো ও নীতি সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে চলছে বাংলাদেশ।

ঋণ পাওয়ার পর আরো বেশ কিছু পরামর্শ বাস্তবায়ন করে চলছে বাংলাদেশ। মুদ্রানীতির আঙ্গিক বদলে ‘মনিটারি টার্গেটিং’ এর স্থলে ‘ইন্টারেস্ট রেট টার্গেটিং’ করা, ৯ শতাংশে বেধে রাখা ঋণ সুদহার সরিয়ে ১১ শতাংশের মধ্যে রাখা, বিনিময় হার বাজারমুখি করতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদার উপর ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত মে মাসেও আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে ঋণ অর্থ বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখতে।