১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পুঁজিবাজার ও বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রধানের বয়সসীমা তুলে বিল পাস

নিজেদের লোক বসাতেই এ উদ্যোগ কি না, প্রশ্ন বিরোধী দলের।

পুঁজিবাজার ও বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রধানের বয়সসীমা তুলে বিল পাস
ফাইল ছবি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Apr 2026, 01:17 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বয়সসীমা তুলে দিতে আনা দুটি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে বিল দুটি পাস হয়। 

নিজেদের মত করে লোক বসাতেই আইন দুটিতে সংশোধনী আনা হলো কি না তা নিয়ে বিল পাসের পর উদ্বেগ জানান এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। জবাবে বিল আনার কারণ ব্যাখ্যা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

পাস হওয়া বিল দুটি হল—বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, ২০২৬।

আখতার হোসেন বলেন, সরকার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চাইলে আইন পাস করতে পারে। তবে যে দুটি বিল পাস হল, তার বিষয়বস্তু নিয়ে যথেষ্ট ব্যাখ্যা হয়নি।

এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, “বিষয়বস্তু হল যে এই যে, সিকিউরিটিস এক্সচেঞ্জ কমিশনের যে আইনটি এবং এই যে বীমা করপোরেশনের যে আইন দুইটা- আইনের বয়সের যে বাধ্যতাকতা ছিল, সেই বাধ্যতাগুলোকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, বিলের ভাষা সংক্ষিপ্ত হওয়ায় দেখে মনে হতে পারে বড় কিছু হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে ৬৭ বছরের বয়সসীমা ছিল, সেটিই তুলে দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার বলেন, সরকার বলছে যোগ্য ও দক্ষ লোক আনার জন্য বয়সসীমা তোলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হল, এটি কোনো নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট কাউকে সামনে রেখে করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা নিয়োগ হয়েছে, সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদের মাথায় রেখে এই আইনে বয়সের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটাকে যদি উঠিয়ে দেওয়া হয়—তাহলে মাননীয় মন্ত্রী যেমন দক্ষ এবং যোগ্য লোকের কথা বলেছেন, সেই জায়গাটাতে কিন্তু একটা কন্ট্রাডিকশন তৈরি করবে।”

রংপুর-৪ আসনের এমপি আখতার বলেন, “এই যে শেয়ার মার্কেটের মত একটা জায়গায় নিজেদের মত করে লোক বসানো হবে—এই চিন্তাতেই যদি বয়সের বাস্তবতা একেবারে উঠিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে বয়সের আর কোনো বার রাখা হলো না। বীমা করপোরেশনের ক্ষেত্রে কোনো বার রাখা হলো না।”

তার ভাষায়, “এগুলো কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থ সম্পদগুলো যদি এখান থেকে লুটপাটের মত কোনো পরিবেশ ভবিষ্যতে তৈরি হয়, তার জন্য কিন্তু সরকার দলকে দায়ী থাকতে হবে।”

স্পিকার এই সংসদ সদস্যের উদ্বেগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে জবাব দিতে বলেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিল দুটি কেন আনা হয়েছে, তা তিনি আগেই স্পষ্ট করেছেন। 

তার ভাষ্য, আইনটি যখন ১৯৯৩ সালে করা হয়, তখন গড় বয়স ও কর্মক্ষমতার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল।

“আপনার এই বিলটা যখন ’৯৩-তে হলো সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের, তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর... এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদশের এই নাগরিক গুলোকে এই অভিজ্ঞ লোকগুলোকে, তাদেরকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান?”

তিনি এও বলেন, “বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাকসেসফুলি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে, তাদের এখানে কোন এইজ বার নাই। তারা সফলভাবে এইগুলো পরিচালনা করছে।”

তার মতে, পেশাদার প্রতিষ্ঠানে বয়সসীমা বেঁধে দিলে যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই যুক্তি বীমা খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “এখানে ইমোশনের কোনো কিছু নাই। দিস ইজ এ প্রফেশনাল জব এবং একটা ইকোনমিকে প্রফেশনালে চালাতে গেলে এই পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশে।”

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যোগ্যতার নামে বাছাই এভাবেই চললে দেশ কীভাবে এগোবে?

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমরা তো কার ইনটেনশন কী, সেটা দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার... আমরা দেখব তার প্রকাশটাকে বাস্তবায়নটাকে কীভাবে এটা রিফ্লেক্ট করতেছে সমাজে।”

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল পাস হওয়ার পর এ ধরনের আলোচনা কার্যপ্রণালী বিধির বাইরে, তবু প্রশ্ন ওঠায় তিনি উত্তর দিচ্ছেন। 

তিনি দাবি করেন, বিগত বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সব নিয়োগই ছিল ‘নন পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট’।

তিনি বলেন, “বিএনপির অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো কোনো সময় পলিটিক্যাল কনসিডারেশনে হয় নাই এবং যোগ্য ব্যক্তিতে সেখানে দেওয়া হয়েছে। সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে।”

একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘ফিনান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে না’।

পরে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত থাকলে তারা সেটিকে স্বাগত জানান। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তার জানা আছে এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া ‘তথ্যগত বিভ্রান্তি’ দূর হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, গভর্নর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন বলে যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নীতির আলোকে তার জায়গায় নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া উচিত।

স্পিকার তখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে সেটি দলীয় পরিচয় কি না।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক না।”

আমির খসরু বলেন, কোনো দলের নির্বাচনি কার্যক্রমে সহায়তা করা মানেই ওই ব্যক্তি দলের সদস্য নন। 

তার ভাষায়, বাংলাদেশে নির্বাচনি কার্যক্রম বড় পরিসরের কাজ; সেখানে সমর্থক অনেকেই অংশ নেন, কিন্তু তাতে তারা দলীয় সদস্য হয়ে যান না।