শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে জিতেও জার্মানির মুখে হাসি নেই

গ্রুপের অন্য ম্যাচে যে স্পেনকে হারিয়ে দিয়েছে জাপান!

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Dec 2022, 07:55 PM
Updated : 1 Dec 2022, 07:55 PM

অবিশ্বাস্য সব নাটকীয়তায় ভরা এক লড়াইয়ের সাক্ষী হলো আল বাইত স্টেডিয়াম। না, না…এর সঙ্গে যে পুরোটা সময় জড়িয়ে রইল খলিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামের আরেক রোমাঞ্চকর ম্যাচও। দুইয়ে মিলে ক্ষণে ক্ষণে বদলাল লড়াইয়ের রূপ, হৃৎস্পন্দন বাড়ল সমর্থকদের, পয়েন্ট টেবিলে চলল ওঠানামা। কোস্টা রিকার বিপক্ষে লড়াইয়ে শুরুতে জার্মানদের মুখে হাসি, বিরতির পর তাদের মুখে ভর করল হতাশা, কোস্টা রিকার হাসি হলো চাওড়া। তবে, শেষ বেলায় দুই শিবিরেই ভর করল কালো মেঘ।

আল খোরের আল বাইত স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার রাতে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে জার্মানির জয় ৪-২ গোলে। কিন্তু তাতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে পড়া এড়াতে পারল না জার্মানরা।

রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হেরে ছিটকে গিয়েছিল আসরে চ্যাম্পিয়নের মর্যাদায় খেলতে আসা জার্মানি।

এবার নকআউট পর্বের টিকেট কাটতে জার্মানির জন্য প্রথম শর্ত ছিল জিততে হবে। সঙ্গে প্রার্থনা করতে হবে অন্য ম্যাচের ফল যেন পক্ষে আসে। চোখজুড়ানো ফুটবলে নিজেদের কাজটা তারা ঠিকঠাক করলেও সমীকরণ পক্ষে এলো না। আরেক ম্যাচে যে চমক জাগানিয়া ফুটবলে স্পেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে গেছে জাপান। পরের ধাপে তাদের সঙ্গী ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নরা।

তিন ম্যাচে দুই জয়ে জাপানের পয়েন্ট ৬। এক জয় ও এক ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ স্পেন।

জার্মানির পয়েন্টও স্পেনের সমান ৪; কিন্তু গোল ব্যবধানে অনেক পিছিয়ে জার্মানরা। কোস্টা রিকা শেষ করল ৩ পয়েন্ট নিয়ে।

গোলের নেশায় প্রথম মিনিট থেকে আক্রমণ শাণানো জার্মানি এগিয়ে যেতে পারত দ্বিতীয় মিনিটেই। তবে জামাল মুসিয়ালার জোরাল শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক। পাঁচ মিনিট পর লেয়ন গোরেটস্কার শট হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট। নবম মিনিটে ভালো পজিশন থেকে টমাস মুলারের হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বাড়ে হতাশা।

পরের মিনিটেই অবশ্য জার্মান শিবিরে যোগ হয় এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ। ডাভিড রাউমের ক্রসে হেডে গোলটি করেন বায়ার্ন মিউনিখের ফরোয়ার্ড জিনাব্রি।

পরের মিনিটে তাদের আনন্দ হয়ে যায় দ্বিগুণ; আল রাইয়ানে যে তখন আলভারো মোরাতার গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। এই অবস্থায় পয়েন্ট টেবিলেও এক লাফে দুইয়ে উঠে আসে হান্স ফ্লিকের দল।

প্রথম ১০ মিনিটের মতো অতটা বিধ্বংসী না হলেও আক্রমণ চলতে থাকে জার্মানির। কোস্টা রিকা পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও তেতে ওঠা প্রতিপক্ষের সামনে সুবিধা করতে পারছিল না।

৩৬তম মিনিটে মুসিয়ালার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার তিন মিনিট পর জিনাব্রির দূরের পোস্টে নেওয়া শট একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

গোল আর না মিললেও দাপুটে ফুটবলে নিয়ন্ত্রণ হাতেই থাকে জার্মানির। কিন্তু বিরতির খানিক আগে তাদের যেন মনোসংযোগে একটু বিঘ্ন ঘটে। রক্ষণে দুবার মারাত্মক ভুল করে বসে দলটি। প্রথমবার তো গোল প্রায় খেতেই যাচ্ছিল; ডিফেন্ডার রুডিগারের দুর্বলতায় বল ধরে ওয়ান-অন-ওয়ানে শট নেন কেইসার ফুয়ের। কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান গোলরক্ষক মানুয়েল নয়ার।

প্রথমার্ধে এটাই ছিল কোস্টার রিকার প্রথম শট। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে জার্মানি গোলের উদ্দেশ্যে শট নেয় ১২টি, যার চারটি ছিল লক্ষ্যে।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই অন্য ম্যাচ থেকে খারাপ খবর পায় জার্মানি। তিন মিনিটের মধ্যে দুই গোল করে এগিয়ে যায় জাপান।

তাদের আশার পালে আরও দমকা হাওয়া লাগে খানিক বাদে। ৫৮তম মিনিটে দারুণ এক পাল্টা আক্রমণে কেনদাল ওয়াসতনের সোজাসুজি হেডে বল হাতে জমাতে ব্যর্থ হন গোলরক্ষক নয়ার। আলগা বল পেয়ে অনায়াসে জালে পাঠান তেহেদা।

গোল হজম করে মুহুর্মুহু আক্রমণ শুরু করে জার্মানি। দুই মিনিটের মধ্যে তিনটি দারুণ সুযোগ হারায় তারা। ৬১তম মিনিটে মুসিয়ালার শট ভাগ্যের ফেরে লাগে পোস্টে। ১৯ বছর বয়সী এই উইঙ্গার খানিক বাদে মারেন উড়িয়ে আর পরের মিনিটে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় মুলারের বুলেট গতির শট।

পয়েন্ট টেবিলের হিসাব পাল্টে দিতে কোস্টা রিকার তখন আরেক গোল চাই। কিন্তু মরিয়া হয়ে ওঠা জার্মানদের সামনে ঘর সামলানোই যেন দায় হয়ে ওঠে, পাল্টা আক্রমণে উঠবে কী।

শুরু থেকে দুর্দান্ত খেলা মুসিয়ালার পথে দুর্ভাগ্য বাধ সাধে আবারও। ৬৭তম মিনিটে তার আরেকটি বাঁকানো শট পোস্টে বাধা পায়।

এরপর আচমকাই মুহূর্তের জন্য খেলার দিকবদল এবং কোস্টা রিকার গোল। ৭০তম মিনিটে গোলমুখে জটলার মধ্যে বল পেয়ে কোনোমতে এক স্পর্শে স্কোরলাইন ২-১ করেন হুয়ান পাবলো ভারগাস। তাতে পয়েন্ট টেবিলে জার্মানি নেমে যায় চার নম্বরে! তিনে স্পেন!

তবে নাটকীয়তার তখনও অনেক বাকি। জার্মানি শাণাতে থাকে একের পর এক আক্রমণ। তিন মিনিট পর সমতাসূচক গোলও পেয়ে যায় তারা। ডি-বক্সে বল পেয়ে নিখুঁত শটে জালে জড়ান কাই হাভার্টজ।

খানিক বাদে ফের এগিয়ে যেতে পারত তারা। কিন্তু এ দফায় নাভাসের দেয়াল ভাঙতে পারেননি নিকলাস ফুয়েলখুগ। ৮৫তম মিনিটে মিলে যায় গোল; ডান দিক থেকে জিনাব্রির দারুণ ক্রসে ঠাণ্ডা মাথায় আলতো এক টোকায় বাকি কাজ সারেন হাভার্টজ।

এতে পয়েন্ট টেবিলে এক ধাপ উন্নতি হয় জার্মানদের; কিন্তু চাওয়া তো নকআউট পর্বের টিকেট। সেজন্য তো শুধু নিজেদের জিতলেই হতো না তাদের। সেই চাওয়া আর পূরণ হয়নি সবশেষ ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ীদের।

৮৯তম মিনিটে ফুয়েলখুগের আরেকটি গোল তাই জয়ের ব্যবধান বাড়ালেও চিত্রপটে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

অসাধারণ এই ম্যাচটি দিয়ে ছেলেদের বিশ্বকাপে প্রথম নারী রেফারি হিসেবে ইতিহাস গড়েন স্তেফানি ফ্রাপা। ৩৮ বছর বয়সী এই ফরাসির দুই সহাকারীও ছিলেন নারী-ব্রাজিলের নেউজা বাক ও মেক্সিকোর কারেন দিয়াস। বলার অপেক্ষা রাখে না, ছেলেদের বিশ্বকাপে একসঙ্গে তিন নারী রেফারির দায়িত্ব পালনও প্রথমবার দেখল ফুটবল বিশ্ব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক