নতুন চেহারার বার্সা, পুরনোতে ভরসা রিয়ালের

ওসাসুনা-সেভিয়া ম্যাচ দিয়ে শুক্রবার মাঠে গড়াচ্ছে ২০২২-২৩ মৌসুমের লা লিগা।

Md. Majharul Islamবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 August 2022, 01:49 PM
Updated : 11 August 2022, 01:49 PM

লা লিগা নাকি দুই ঘোড়ার দ্বৈরথ, যে লড়াইয়ে মাঝে মধ্যে বাড়তি মাত্রা যোগ হয় আতলেতিকো মাদ্রিদের উত্থানে। অনেক বছর পর গত আসরে তার ব্যত্যয় ঘটে; লিওনেল মেসিসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেককে হারিয়ে শুরু থেকেই ধুঁকতে থাকে বার্সেলোনা। পরে শাভি এরনান্দেসের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ালেও ততদিনে দেরি হয়ে যায়। কয়েক ম্যাচ হাতে রেখে শিরোপা নিশ্চিত করে রিয়াল মাদ্রিদ। এবার অবশ্য আটঘাট বেঁধে লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছে কাতালান ক্লাবটি। স্কোয়াডের শক্তি ও গভীরতা বাড়িয়েছে অনেক, কিন্তু রিয়াল আছে অনেকটা আগের চেহারাতেই।

আর্থিক সমস্যার মাঝেও এবার তারা দলে টেনেছে রবের্ত লেভানদোভস্কির মতো তারকাকে। মাঝমাঠ ও রক্ষণেও শক্তি বাড়িয়েছে। দলবদলের বাজারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীরা ব্যস্ত সময় কাটালেও রিয়াল একরকম নিরবই থাকে। কিলিয়ান এমবাপেকে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা আর কোনো বড় বা প্রতিষ্ঠিত তারকাকে দলে টানার চেষ্টা করেনি।

গত মৌসুমে শুরু থেকে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে চার ম্যাচ হাতে রেখে লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলে রিয়াল। রানার্সআপ বার্সেলোনার একটা সময়ে তো শীর্ষ চারে থাকাটাই দুরূহ ব্যাপার হয়ে পড়েছিল। সাবেক কোচ রোনাল্ড কুমানকে যখন গত অক্টোবরে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন লিগে ৯ নম্বর স্থানে ছিল দলটি।

গত নভেম্বরে বার্সেলোনার কোচ হওয়া শাভির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দলকে কক্ষপথে ফেরানো ও পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা নিশ্চিত করা। সেটা ভালোভাবে করতে পারলেও ২০২১-২২ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্ব থেকে দলের ছিটকে পড়া আটকাতে পারেননি তিনি। এরপর ইউরোপা লিগে তারা বিদায় নেয় কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে।

জানুয়ারির দলবদলে আসা নতুন খেলোয়াড়রা যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। এতে এক সময়ে রিয়ালকে লিগ শিরোপা লড়াইয়ে টক্কর দেওয়ার স্বপ্নও দেখতে শুরু করে তারা। শেষ পর্যন্ত যদিও তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায়।

ওই মৌসুমের শুরুতে কার্লো আনচেলত্তি যখন রিয়ালের ডাগআউটে ফিরেছিলেন, তখন তাদের নিয়েও আশা ছিল সামান্যই। দলে বড় কোনো গোলস্কোরারের অনুপস্থিতি, মাঝমাঠের তারকা লুকা মদ্রিচ, টনি ক্রুসদের বয়স-সবকিছুই বড় স্বপ্নের পথে ছিল ‘বাধা’ হয়ে।

তবে অভিযান শুরু হতেই সব পাল্টে যায়। বয়সের বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে মদ্রিচ আবারও নিজেকে মাঝমাঠে সেরা হিসেবে মেলে ধরেন, টনি ক্রুস-কাসেমিরো মাঝে মধ্যে ভুগলেও শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসেন তরুণ ফেদে ভালভেরদে, কামাভিঙ্গারা। আর দলটির আক্রমণভাগের রূপ বদলে যাওয়াটা ছিল বিষ্ময়কর। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো চলে যাওয়ার পর করিম বেনজেমা নিয়মিত গোল করছিলেন ঠিকই, তবে গত মৌসুমে তিনি যা করেন তা সত্যিই অভাবনীয় ছিল।

লা লিগায় আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা তো বটেই, পুরো মৌসুমেই নিয়মিত গোলের মধ্যে ছিলেন তিনি। ‘পিচিচি ট্রফি’ জেতা তারকা পার করেন ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম। লিগে ৩২ ম্যাচে করেন সর্বোচ্চ ২৭ গোল। রিয়ালের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৪ বার জালের দেখা পান তিনি।

তার সঙ্গে বিধ্বংসী জুটি গড়ে তোলেন তরুণ ফরোয়ার্ড ভিনিসিউস জুনিয়র। লিগে এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড জালের দেখা পান ১৭ বার।

শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে আবারও রিয়ালের ভরসা হতে যাচ্ছেন বেনজেমা-ভিনিসিউস জুটিই। তাদের সঙ্গে থাকবেন রদ্রিগো, মার্কো আসেনসিও, এদেন আজার ও মারিয়ানো দিয়াসরা। আর অভিজ্ঞ মিডফিল্ড ত্রয়ী মদ্রিচ, কাসেমিরো ও ক্রুস তো রয়েছেনই।

পুরনোদের ওপরই ভরসা রাখা রিয়াল এবারের দলবদলে এখন পর্যন্ত দলে টেনেছে মাত্র দুই খেলোয়াড়। তারা হলেন জার্মান ডিফেন্ডার আন্টোনিও রুডিগার ও ফরাসি মিডফিল্ডার অহেরিয়া চুয়ামেনি।

ক্লাব ছেড়েছেন ডিফেন্ডার মার্সেলো, মিডফিল্ডার ইসকো এবং দুই ফরোয়ার্ড গ্যারেথ বেল ও লুকা ইয়োভিচ। বেল ও ইয়োভিচের বিদায়ের পরও আক্রমণে নতুন কাউকে দলে টানার চেষ্টা করেনি রিয়াল। প্রাক-মৌসুম চলাকালীন আনচেলত্তি কয়েকবার বলেছেন, দল এখন যেভাবে আছে তাতেই সন্তুষ্ট তিনি।

রিয়াল আক্রমণে ধার বাড়াতে ব্যর্থ হলেও এখানে পুরোপুরি সফল বার্সেলোনা। অনেক নাটকীয়তার পর বায়ার্ন মিউনিখ থেকে তারা দলে টানে লেভানদোভস্কিকে। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫০ গোল করা পোলিশ স্ট্রাইকারকে ধরা হয়ে থাকে সময়ের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে। তার অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে বার্সেলোনাকে সমৃদ্ধ করবে অনেকটাই।

এছাড়া বার্সেলোনা দলে টেনেছে ফঁক কেসিয়ে, আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেন, রাফিনিয়া ও জুল কুন্দেকে। ক্লাবটি আরও কয়েকজন খেলোয়াড়কে দলে টানার চেষ্টা করছে বলেও শোনা যাচ্ছে।

২০২০-২১ আসরের চ্যাম্পিয়ন আতলেতিকো মাদ্রিদ কোনো এক অজানা কারণে গত মৌসুমে শুরু থেকেই পথ হারিয়ে ফেলে। তাদের ঘিরেও শীর্ষ চারে থাকতে না পারার শঙ্কা জাগে এসময়। শেষ পর্যন্ত তা যদিও হয়নি, তবে শিরোপা লড়াইয়ে তাদের নাম কখনোই উচ্চারিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে থেকে লা লিগা শেষ করেছিল তারা। এবারের দলবদলে এখন পর্যন্ত বড় তারকা দলে না টানলেও ঘর মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন দিয়েগো সিমেওনে।

ইউভেন্তুসে ধারের মেয়াদ শেষে ক্লাবে ফিরেছেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড আলভারো মোরাতা। উদিনেসে ছেড়ে আতলেতিকোতে যোগ দিয়েছেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নাউয়েল মোলিনা। এছাড়া নতুনদের মধ্যে রয়েছেন মিডফিল্ডার আক্সেল উইটসেল ও ফরোয়ার্ড সামুয়েল লিনো।

চমক দেখাতে পারে সেভিয়াও। ‘ইউরোপা লিগ স্পেশালিষ্ট’ ক্লাবটি গত মৌসুমে একটা সময় পর্যন্ত লিগের শিরোপা লড়াইয়ে ছিল রিয়ালের পেছনেই। এরপর শেষের দিকে গিয়ে তারা খেই হারিয়ে ফেলে। শেষ করে চার নম্বরে থেকে।

হুলেন লোপেতেগির কোচিংয়ে এবার দারুণ কিছুর আশা করতেই পারে সেভিয়া। দলবদলে মিডফিল্ডে শক্তি বাড়াতে ফ্রি ট্রান্সফারে দলে টেনেছে রিয়ালের সাবেক মিডফিল্ডার ইসকোকে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে এক বছরের জন্য ধারে যোগ দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার আলেক্স তেলেস।

এছাড়াও নজর থাকবে রিয়াল বেতিস, রিয়াল সোসিয়েদাদ ও ভিয়ারিয়ালের মতো দলগুলোর ওপর। শিরোপার জন্য চ্যালেঞ্জ না জানাতে পারলেও বড় দলগুলোর পথচলা কঠিন করে দিতে পারে তারা।

লা লিগা থেকে গতবার অবনমন হয়ে গেছে লেভান্তে, আলাভেস ও গ্রানাদার। তাদের জায়গায় এসেছে আলমেরিয়া, জিরোনা ও রিয়াল ভাইয়াদলিদ। এই ভাইয়াদলিদের মালিকানা আছে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী সাবেক ফরোয়ার্ড রোনালদোর।

বার্সেলোনার শক্তি বাড়ানো ও অন্য দলগুলোর সামর্থ্য বিবেচনায় বলাই যায়, শিরোপা ধরে রাখার অভিযান সহজ হবে না রিয়ালের জন্য। সব মিলিয়ে দারুণ জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের সম্ভাবনায় লা লিগা শুরু হতে যাচ্ছে শুক্রবার।

প্রথম দিনে ম্যাচ হবে একটি; ওসাসুনার বিপক্ষে মাঠে নামবে সেভিয়া।

পরদিন নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বার্সেলোনা। কাম্প নউয়ে তাদের প্রতিপক্ষ রায়ো ভাইয়েকানো। পরদিন আলমেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মাঠে নামবে রিয়াল। আর সোমবার মাদ্রিদের আরেক ক্লাব আতলেতিকোর প্রতিপক্ষ গেতাফে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক