১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: আর্লিং হলান্ড

বিশ্বকাপে নিজের ছাপ ফেলার অপেক্ষায় ক্লাব ও দেশের হয়ে গোলের পর গোল করে চলা দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার।

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: আর্লিং হলান্ড
বিশ্বকাপে নরওয়ের স্বপ্নের সারথি হয়ে উঠতে পারেন আর্লিং হলান্ড। ছবি: ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:18 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতেই যে ঝলক দেখিয়েছিলেন আর্লিং হলান্ড, সময়ের সঙ্গে তার দ‍্যুতি কেবলই বাড়ছে। ক্লাব ফুটবলে হয়ে উঠেছেন সময়ের সেরাদের একজন। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে- ম্যাচের পর ম্যাচে অসাধারণ সব পারফরম্যান্সে দেশকে ফিরিয়েছেন বিশ্বকাপে। বাছাই পর্ব পার হওয়ার পর এবারের মঞ্চটা আরও বড়, চ্যালেঞ্জ আর প্রত্যাশাও তাই বেশি। তবে প্রতিপক্ষের গোলমুখে নিজেকে যে ভয়ঙ্কর রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি, তাতে তার পক্ষে বাজি ধরার লোকের অভাব নেই।

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন নরওয়ের ফরোয়ার্ড আর্লিং হলান্ড।

প্রায় তিন দশক পর নরওয়ের আবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পেছনে পরিষ্কারভাবেই সবচেয়ে বড় অবদান হলান্ডের। যে দারুণ ছন্দে আছেন তিনি, তাতে জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় এবারের বৈশ্বিক আসরেও নরওয়ের স্বপ্নের সারথি হয়ে উঠতে পারেন তিনি।

অন্তত সেই সামর্থ্য যে তার যথাযথই আছে, ইতোমধ্যে তা শতভাগ প্রমাণ করেছেন হলান্ড। পরিসংখ্যানের আলোয়, ফুটবলের সাবেক-বর্তমান কোচ-খেলোয়াড়দের কথায় সেই চিত্রটাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে ফিফা।

অর্জন ও দক্ষতা

গত দশকের দ্বিতীয়ার্ধে টিকটক বাজারে এসেই যেভাবে ঝড় তোলে, আর্লিং হলান্ডের আগমনও ছিল অনেকটা একইরকম। প্রযুক্তি দুনিয়া আর ফুটবলে এই দুই বিস্ময়ের অভিষেক হয় একই বছরে, ২০১৬ সালে।

পেশাদার ফুটবলে হলান্ডের যাত্রা শুরু ব্রানের হয়ে। পরের বছর নরওয়ের আরেক ক্লাব মোল্ডার জার্সিতে অভিষেকেই করেন গোল। দেশের দুই ক্লাবে ঝলক দেখিয়ে পাড়ি জমান তিনি রেড বুল সালসবুর্কে। অস্ট্রিয়ার এই ক্লাবে একমাত্র পূর্ণ মৌসুমে (২০১৯-২০) ২২ ম্যাচে করেন ২৮ গোল!

২০১৯ সালে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে হন্ডুরাসের বিপক্ষে নরওয়ের ১২-০ ব্যবধানের জয়ে একাই ৯ গোল করেন হলান্ড।

সালসবুর্কে অমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরের মৌসুমেই হলান্ডকে কিনে নেয় বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। জার্মানিতেও প্রতিপক্ষের রক্ষণে তার তাণ্ডব চলতে থাকে। ডর্টমুন্ডে প্রথম মৌসুমেই জার্মান কাপের ফাইনালে লাইপজিগকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পথে জোড়া গোল করেন হলান্ড।

ডর্টমুন্ডের জার্সিতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ৮৯ ম্যাচে করেন ৮৬ গোল। মূলত সেখান থেকেই তার নামের পাশে জুড়ে যায় ‘গোলমেশিন’ তকমা। ম্যানচেস্টার সিটিতে এসে যা আরও পোক্ত করেন হলান্ড।

সিটির জার্সিতে প্রথম মৌসুমেই গোলের বন্যা বইয়ে দেন তিনি; দলটির প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পথে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ওই মৌসুমে ট্রেবল জয়ের স্বাদও পান তিনি, প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপসহ। টানা দুই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন দীর্ঘদেহী এই ফুটবলার এবং টানা দ্বিতীয় মৌসুমেও জয় করেন লিগ শিরোপা।

নরওয়ে জাতীয় দলের হয়েও গোল করতে থাকেন নিয়মিত। এবারের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আট ম্যাচেই ১৬ গোল করেন তিনি।

নরওয়ের হয়ে ৪৬ ম্যাচেই ৫০ গোল পূর্ণ করেন হলান্ড। ছবি: ফিফা

নরওয়ের হয়ে ৪৬ ম্যাচেই ৫০ গোল পূর্ণ করেন হলান্ড

তাদের চোখে হলান্ড

“এটা অনেকটা (লিওনেল) মেসি কিংবা ক্রিস্তিয়ানোর (রোনালদো) সঙ্গে খেলার মতো। মাঠে তার প্রভাব অনেক। দলকে সে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে যায়। মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো এটা ১৫ বছর ধরে করেছে। হলান্ডও সেই পর্যায়ে।”

-পেপ গুয়ার্দিওলা

“সে একজন ফেনোমেনন। দৌড়ানোর সময় যে শক্তি সে প্রয়োগ করে, ব্রাজিলের রোনালদোর মতোই অবিশ্বাস্য। (জিনেদিন) জিদান, ব্রাজিলের রোনালদো, পর্তুগিজ রোনালদো, তাদের কাতারেই আছে। সে অসাধারণ। সে যেন প্রায় চারজন খেলোয়াড়ের সমষ্টি।”

-গ্যারি নেভিল

“আপনি মনে করতে পারেন, তার (হলান্ড) সবটাই আপনি দেখে ফেলেছেন; কিন্তু সে দিনে দিনে আরও ভালো হয়ে উঠছে। এমন কিছুই নেই যে সে করতে পারে না। তার পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য”

- আলেকসান্দার সরলথ

“হলান্ড ওইসব খেলোয়াড়দের একজন, যে মাঝমাঠে বল পেয়ে, আপনার সব বাধা পার হয়ে এগিয়ে যায়। সে সব দানবদের মাঝে (সবচেয়ে ভয়ঙ্কর) দানব হয়ে উঠতে পারে।”

-নোয়েল গ্যালাঘার

পরিসংখ্যানের আলোয় হলান্ড

** ডর্টমুন্ডের হয়ে হলান্ড তার প্রথম পাঁচটি গোল করেন কেবল ৫৬ মিনিটের মধ্যে। কালো-হলুদ জার্সিতে ৫০ ম্যাচেই বুন্ডেসলিগায় গোলের অর্ধশতক পূরণ করেন তিনি, ভেঙে দেন ১৯৬৫ সালে টিমো কোনিয়েৎজকার গড়া ৫৯ ম্যাচের রেকর্ড।

পরে বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে রেকর্ডটি দখলে নেন হ্যারি কেইন, ৪৩ ম্যাচে!

** সিটিতে প্রথম মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড গড়েন হলান্ড, ৩৬টি। প্রিমিয়ার লিগে দ্রুততম ৫০ ও ১০০ গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি, যথাক্রমে ৪৮ ও ১১১ ম্যাচে; তিনি ভেঙে দেন অ্যান্ডি কোল (৬৫ ম্যাচে ৫০) ও অ্যালান শিয়েরারের (১২৪ ম্যাচে ১০০) গোলের রেকর্ড দুটি।

** উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৪৯ ম্যাচেই ৫০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছেন হলান্ড, ভেঙে দিয়েছেন রুড ফন নিস্টলরয়ের আগের দ্রুততম ৬২ ম্যাচে গোলের ফিফটি ছোঁয়ার রেকর্ড।

১০০ ম্যাচের কম খেলে ৫০ গোল করার কীর্তি আর আছে লিওনেল মেসি (৬৬), রবের্ত লেভানদোভস্কি (৭৭), কিলিয়ান এমবাপে (৭৯), কারিম বেনজেমা (৮৮), ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো (৯১) ও রাউল গন্সালেসের (৯৭)।

** নরওয়ের হয়ে ৪৬ ম্যাচেই ৫০ গোল করেন হলান্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সব মিলিয়ে ষষ্ঠ এবং ৫৩ বছরের মধ্যে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৫০ এর কম ম্যাচ খেলে এই কীর্তি গড়েন তিনি। এই তালিকার চূড়ায় আছেন ডেনমার্কের পল নিলসেন (৩৬ ম্যাচ)।

বাকিরা হলেন- তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির জার্ড মুলার (৪১), হাঙ্গেরির দুই জন ফেরেঙ্ক পুসকাস (৪১) ও সান্দোর কোচিশ (৪২) এবং ব্রাজিলের পেলে (৪৯)।

** ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ১৭টি গোল করেন হলান্ড, তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা খেলোয়াড়ের চেয়ে ছয়টি বেশি নিয়ে বছর শেষ করেন তিনি।

ইউরোপিয়ান ফুটবলারদের মধ্যে এক পঞ্জিকাবর্ষে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছেন দুই জন; ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির হয়ে ২৩ গোল করেন সান্দোর কোচিশ ও ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে ১৮টি করেন জুস্ত ফঁতেন।

ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়েও দারুণ ছন্দে এগিয়ে চলেছেন হলান্ড। ছবি: ফিফা

ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়েও দারুণ ছন্দে এগিয়ে চলেছেন হলান্ড

নরওয়ের বিশ্বকাপে ইতিহাস ও ২০২৬ ঘিরে প্রত্যাশা

ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নরওয়ের ইতিহাস সমৃদ্ধ নয়। তবে ১৯৩৮ সালে অভিষেক আসরে কিছুটা চমক জাগাতে পেরেছিল দলটি। শিরোপাধারী ইতালিকে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ গোলে আটকে রেখে, পরে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরেছিল তারা।

৫৬ বছর পর ১৯৯৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড ও পোল্যান্ডকে পেছনে ফেলে গ্রুপ সেরা হয়ে মূল পর্বে ওঠে নরওয়ে। মূল মঞ্চে যদিও গ্রুপের বাধা পার হতে পারেনি তারা।

চার বছর পরের আসরে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে, অপরাজিত থেকে নকআউট পর্বে ওঠে নরওয়ে। শেষ ষোলোয় ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরে শেষ হয় তাদের যাত্রা।

সেই থেকে দীর্ঘ বিরতির পর, আবার বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে দেশটি।

এবারের বাছাইপর্বেও আট ম্যাচের সবগুলো জিতে, গ্রুপ সেরা হয়ে মূল আসরের টিকেট কাটে নরওয়ে। ওই বাছাইয়ের মতো, মূল মঞ্চেও যে তাদের সব আশা হলান্ডকে ঘিরেই থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হলান্ডও নিশ্চয় মুখিয়ে আছেন, জীবনের প্রথম বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতে।

তবে, কেবল হলান্ডই নয়, দলটির শক্তির জোগান দেওয়ার মতো নাম আছে আরও কিছু- আতলেতিকো মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড আলেকসান্দার সরলথ, আর্সেনালের প্লেমেকার ও অধিনায়ক মার্টিন ওদেগোর, ক্রিস্টাল প্যালেসের ইয়োর্গেন স্ত্রান্দ লার্শেন।

এই নামগুলো জ্বলে উঠতে পারলে মাঠে নরওয়ে দলটি কতটা ভয়ানক ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, এর প্রমাণ বাছাইপর্বেই মিলেছে; চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে তারা দুইবারের দেখাতেই গুঁড়িয়ে দেয় (৩-০ ও ৪-১ গোলে)।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় ৪৮ দলের বিশ্বকাপে সাফল্যের সেই ধারা ধরে রাখার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে হলান্ড ও তার সতীর্থরা। তাদের প্রাথমিক চ‍্যালেঞ্জ ‘গত দুইবারের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স, আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল ও ফিফা প্লে-অফ জয়ী (বলিভিয়া/ইরাক/সুরিনাম) দলের আই’ গ্রুপ থেকে পরের ধাপ নিশ্চিত করা।