২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

বাছাই নিয়ে তৃপ্তি-অতৃপ্তি আছে, যত আক্ষেপ সাফ নিয়ে: নাবিল

জেমি ডে থেকে অস্কার ব্রুসন, এরপর মারিও লেমোস এবং সবশেষ গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ দলের কোচ হলেন হাভিয়ের কাবরেরা। ঘন ঘন কোচ বদলে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে ন্যাশনাল টিমস কমিটির চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদকে। এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে দলের পারফরম্যান্স দেখে তাই তিনিও কিছুটা তৃপ্তি পাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে কাবরেরার হাত ধরে দল বেশ লড়াকু ফুটবলই উপহার দিয়েছে।

মোহাম্মদ জুবায়ের মোহাম্মদ জুবায়ের

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Jun 2022, 07:09 PM

Updated : 25 Oct 2022, 10:44 AM

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ন্যাশনাল টিমস কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন নাবিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় পিছু ফিরে তাকালেন তিনি। সদ্য শেষ হওয়া এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে দলের পারফরম্যান্স, এলিটা কিংসলের গায়ে এখনও জাতীয় দলের জার্সি না ওঠা, জাতীয় দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াসহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে কথা বললেন অকপটে।  

প্রশ্ন: এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে দলের পারফরম্যান্স কেমন দেখলেন।

নাবিল: বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তানের বিপক্ষে হারলেও দুটি ম্যাচেই আমাদের খেলা ছিল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। ছেলেরা ভালো ও গোছালো ফুটবল খেলেছে। বাহরাইনের কাছে ২-০ হারা ম্যাচেও ছেলেদের ভালো ইফোর্ট ছিল।

প্রশ্ন: সম্ভাবনা জাগিয়ে তুর্কমেনিস্তানের বিপক্ষে ২-১ গোলে হার নিয়ে কী বলবেন?

নাবিল: তুর্কমেনিস্তান ম্যাচে মাঠে যদি আমাদের একজন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার থাকত, তাহলে ম্যাচের ফলটা অন্যরকম হতে পারত। তারপরও ছেলেরা ভালো খেলেছে।

প্রশ্ন: জাতীয় দলের হয়ে আগে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকা হাভিয়ের কাবরেরার হাতে যখন দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন জানুয়ারিতে, তখন কী কোচের সঙ্গে এই ঘরানার ফুটবল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল?

নাবিল: এই কোচ নিয়োগ দেওয়ার আগে তার সঙ্গে আমাদের সঙ্গে এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছিল। গোছালো ফুটবল খেলা, প্রতিপক্ষকে যেন গোলের সুযোগ না দেই, মাঠে আমাদের অ্যাপ্রোচ যেন আরও ইতিবাচক হয়-এগুলো নিয়ে কথা হয়েছিল। কোচ সে অনুযায়ী যে কাজ করছেন, তার প্রতিফলন আমরা দেখতেও পাচ্ছি।

প্রশ্ন: কিন্তু বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তান ম্যাচের সঙ্গে মালয়েশিয়া ম্যাচের পারফরম্যান্স মেলানো যায়নি..

নাবিল: (মালয়েশিয়া ম্যাচ নিয়ে) হতাশ তো বটেই। পুরো ম্যাচই দেখেছি। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আমাদের রক্ষণ খুবই দুর্বল ছিল। ওদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা বারবারই আমাদের রক্ষণভাগ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। একাধিক গোল আমরা খেয়েছি সেট-পিস থেকে। আবার কিছু সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের স্ট্রাইকাররা গোল করতে পারেনি অভিজ্ঞতার অভাবে। বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তান ম্যাচ থেকে মালয়েশিয়া ম্যাচে আমাদের খেলায় অনেক পার্থক্য ছিল।

তারপরও আমরা আশাবাদী। আশা রেখেই ন্যাশনাল টিমস কমিটি তার কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেখছি, কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের বোঝাপড়া দিন দিন বাড়ছে। আশা করি, সামনে আরও ভালো কিছু ছেলেরা আমাদের এনে দিতে পারবে।

প্রশ্ন: কাবরেরাকে কী তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রেখে দিতে চায় বাফুফে?

নাবিল: কাবরেরার সঙ্গে আমাদের এক বছরের চুক্তি আছে। এর আগে জেমি ডের সঙ্গেও শুরুতে এক বছরের চুক্তি ছিল। কোচদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে চুক্তি নবায়নের পরবর্তী পদক্ষেপই আমরা গ্রহণ করি, কাবরেরার ব্যাপারেও একই পন্থায় সিদ্ধান্ত নিব।

প্রশ্ন: জেমি ডের ইস্যুটার কী সমাধান হয়েছে?

নাবিল: আমাদের পক্ষ থেকে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। তার সঙ্গে বিষয়গুলো সমঝোতার জন্য অনেকবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তার দাবি-দাওয়ার সঙ্গে আমাদের চাওয়াটা মেলেনি। সে ফিফার কাছে অভিযোগ করেছে, এখন আমরা ফিফার কাছে আমাদের তথ্য-উপাত্ত জমা দিব, সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী সবকিছু হবে।

প্রশ্ন: এর আগে লোডভিক ডি ক্রইফের সঙ্গে পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়ে বাফুফের ঝামেলা হয়েছিল। এবার জেমি ডে… এই ইস্যুগুলোর পুনরাবৃত্তি বাফুফের ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কি?

নাবিল: আমাদের সেটা মনে হয় না। এর আগে যারা কোচ হয়ে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে এ ধরনের সমস্যা হয়নি। জেমির সহকারী হিসেবে যিনি কাজ করে গেছেন, সেই স্টুয়ার্ট ওয়াটকিসের সঙ্গেও কোনো সমস্যা হয়নি।

প্রশ্ন: বাছাইয়ের প্রসঙ্গে ফিরি। চোটের কারণে সাত জন নিয়মিত খেলোয়াড় ছাড়া কাবরেরা যখন দল চূড়ান্ত করলেন, তরুণ দলটির প্রতি আপনার বার্তা কি ছিল?

নাবিল: দলের কাছে আমাদের বার্তা ছিল, তারা যেহেতু সুযোগটা পাচ্ছে নিজেদের মেলে ধরার, তারা যেন নিজেদের সর্বোচ্চটা দেয়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। সেটা তারা কিছুটা করতে পেরেছে, তবে আমার মনে হয় আরও বেশি করতে পারত।

প্রশ্ন: শুরুর দিকে বলছিলেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার না থাকার কথা। দলের স্কোরিংয়ের পুরান সংকট মোকাবেলায় চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ বা তার নিচের স্তরে স্থানীয় যারা অনেক গোল করেন, তাদের নিয়ে একাডেমিতে আলাদাভাবে কাজ করার কথা ভেবেছেন?

নাবিল: আমাদের স্কোরারের সমস্যা অনেক দিনের। দলকে স্কোরারের অভাবের কারণে ভুগতে হয় প্রায়ই। আল্টিমেটলি খেলোয়াড় তৈরির কাজ ক্লাবগুলোকেই করতে হয়। তাদের তৈরি করা খেলোয়াড় নিয়ে ফেডারেশন জাতীয় দলের কর্মকাণ্ড চালায়।

(লিগের নিচের দিকের টুর্নামেন্টে) যারা অনেক গোল করে, তারা লিগে এসে সেই সুযোগটা পায় না। আমাদের ক্লাবগুলো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রয়োজনে বিদেশ থেকে স্ট্রাইকার নিয়ে আসে, তাদের কারণে স্থানীয়দের আক্রমণভাগে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে জাতীয় দলে এসে যখন তারা নাম্বার ৯ বা ১০ পজিশনে খেলতে নামে, অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তাদের মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়।

যেটা বলছিলেন, স্ট্রাইকারদের নিয়ে একাডেমিতে আলাদাভাবে কাজ করা যায় কিনা, এ বিষয়টা আগামীতে ভাবা যেতে পারে।

প্রশ্ন: অনেক দেশই এখন বিদেশি খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে নিজেদের দলের শক্তিবৃদ্ধি করছে। সেখানে এলিটা কিংসলে নাইজেরিয়ান থেকে বাংলাদেশি হয়েও সুযোগ পাচ্ছেন না।

নাবিল: এলিটা কিংসের ব্যাপারটি কিন্তু ভিন্নরকম। সে যদি খেলার উপযুক্ত হয়, কোচ যদি মনে করেন, কিংসলে খেলতে পারবে, তাহলে তিনি তাকে বিবেচনা করবেন।

ন্যাশনাল টিমস কমিটি সবসময় এই সব আগ্রহী প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এভাবেই কিন্তু জামাল ভূঁইয়া, কাজী তারিক রায়হানরা এসেছে। দেশের বাইরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা ভালো ফুটবল খেলে, তাদের বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার জন্য সামনের দিনগুলোতে আমরা অবশ্যই আরও চেষ্টা করব, উদ্বুদ্ধ করব। আমাদের দলের অধিনায়ক ডেনমার্ক প্রবাসী, এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রবাসীদের জন্য আমাদের দরজা খোলা রয়েছে।

প্রশ্ন: জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পুল প্রথা বা পারিশ্রমিকের আওতায় আনার কথা শোনা যাচ্ছিল…

নাবিল: যেটা প্র্যাকটিক্যাল, সাধ আর সামর্থ্যের সঙ্গে যেটা সঙ্গতীপূর্ণ, , সেটাই আমাদের করতে হবে। ন্যাশনাল টিমস কমিটি এবং বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন এসব বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। বর্তমানে আমাদের কমিটির সময়ে খেলোয়াড়রা যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, এর আগে কিন্তু তারা সেটা পায়নি। যেটা আগে ছিল না, সে সুবিধা এখন আমরা দিচ্ছি। তবে খেলোয়াড়দের কিভাবে আরও ভালো রাখা যাবে, একটা কাঠামোর মধ্যে আনা যাবে, সেটা নিয়ে আমাদের সবসময়ই ভাবনা, পরিকল্পনা আছে।

প্রশ্ন: লম্বা সময় ধরে ন্যাশনাল টিমস কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই সময়ে কোচ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলে হতাশা আছে?

নাবিল: খারাপ লাগার মতো কোনো বিষয় নেই। ভালো চিন্তা ও চাওয়া থেকেই সবসময় কাজ করে গেছি। আমি ছাড়াও লিগ কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, উইমেন্স উইংয়ে মাহফুজা আক্তার কিরণ-লম্বা সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। নিজেদের জায়গা থেকে আমরা সবসময় সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি।

আক্ষেপ বলতে, আমাদের সময় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা এখনও প্রত্যাশিত সাফল্য পাইনি। আমরা খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই না, যত বেশি ম্যাচ খেলতে পারব, ছেলেরা তত বেশি অভিজ্ঞ হবে। জাতীয় দলে যারা আছে, যারা সম্ভাবনাময় তাদের নিয়ে লম্বা সময় ধরে ক্যাম্প করার ধারাবাহিকতাটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। এটা পারলে হয়ত, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া ও সমন্বয় আরও বাড়ত।

প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে বাছাইয়ের পারফরম্যান্সের পর কী মনে হচ্ছে, দল এখন সঠিক পথে আছে?

নাবিল: আমাদের দলের এখনও অনেক ভালো করার আছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি টুর্নামেন্টে আমাদের ভালো করার সুযোগ ছিল, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে  ও শ্রীলঙ্কায় চার জাতি টুর্নামেন্টে অল্পের জন্য আমরা কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদেরকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে।

সাফে নেপালের বিপক্ষে জিততে পারলেই আমরা ফাইনাল খেলতে পারতাম, শুরুতে এগিয়ে যাওয়ার পর শেষ দিকে গোল খেয়ে সেটা হয়নি। শ্রীলঙ্কায় চার জাতি টুর্নামেন্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ড্র করলেও ফাইনাল খেলত বাংলাদেশ, কিন্তু শেষ দিকের গোলে ছিটকে যেতে হয়েছে। অনেক সুযোগ আমাদের হাতছাড়া হয়েছে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের লিগ নিয়মিত হচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে। আমাদের খেলোয়াড়রা আরও বেশি পেশাদার হচ্ছে, খেলোয়াড়দের বর্তমান শারীরিক ফিটনেস…পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে এতটা ছিল না। এখন আমাদের খেলোয়াড়রা ৯০ মিনিট পুরোদমে খেলতে পারে, যেটা অতীতে অনেক সময় পারত না।

প্রশ্ন: পিছু ফিরে দেখা, নিজের কাজ নিয়ে কি তৃপ্ত?

নাবিল: গত ১০ বছর ধরে আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু আমরা জাতীয় দলকে দিয়েছি। দিয়ে যাচ্ছি। ক্রমাগত এই সুবিধা বাড়ছে। জাতীয় দলে কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে অন্যান্য সুবিধাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। এই যে দল বাছাইয়ে ভালো ফুটবল খেলল, তার প্রশংসা কিন্তু গণমাধ্যমেও এসেছে। এটাই সবচেয়ে তৃপ্তির জায়গা, আমরা যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি, এটা তারই স্বীকৃতি।