তৃতীয়-চতুর্থ স্তরের দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে ২৫ বছর পর স্বপ্নের ঠিকানায় কভেন্ট্রি সিটি
চতুর্থ স্তরে নেমে যাওয়া, ঘরের মাঠে খেলতে না পারা, অসংখ্য সঙ্কট, সব কিছুর পর দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে অবশেষে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ফিরছে কভেন্ট্রি সিটি।
ববি টমাসের হেড জালে আশ্রয় নিতেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছিল গ্যালারির একটি অংশে। শেষ বাঁশি বাজার পর উচ্ছ্বাসের জোয়ার ছড়িয়ে পড়ল মাঠময়। প্রতিপক্ষের মাঠ, তাতে কী! সফর করে খেলা দেখতে গ্যালারিতে ছিলেন যে সাড়ে ৭ হাজার দর্শক, মুহূতর্টি স্মরণীয় করে রাখলেন তারা নেচে-গেয়ে ও বাঁধনহারা উদযাপনে। ২৫ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে কভেন্ট্রি সিটি!
২০০১ সালের মে মাসে অবনমন দিয়ে যে দুঃস্বপ্নের শুরু হয়েছিল, পতনের ধারায় দ্বিতীয় স্তর থেকে তৃতীয় স্তর হয়ে যা পৌঁছে গিয়েছিল চতুর্থ স্তরে, সিকি শতাব্দীর সেই আঁধার পেরিয়ে কভেন্ট্রি সিটি অবশেষে আলোয় অবগাহন করল শুক্রবার রাতে।
প্রিমিয়ারে ওঠা নিশ্চিত করতে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের মাঠে কেবল একটি পয়েন্ট প্রয়োজন ছিল কভেন্ট্রির। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর পিছিয়ে পড়ে তারা ৫৪তম মিনিটে। তবে ৮৪তম মিনিটে টমাসের হেডের গোলে ফেরে সমতা। ১-১ স্কোরলাইনেই শেষ হয় ম্যাচ।
তিন ম্যাচ বাকি রেখেই প্রিমিয়ারে পা রাখা নিশ্চিত হলো তাদের। দ্বিতীয় স্তর বা ইংলিশ লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৩ ম্যাচে ৮৬ পয়েন্ট তাদের।
এই সাফল্যের নেপথ্য নায়ক ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ১৩টি ট্রফিজয়ী চেলসি কিংবদন্তি কভেন্ট্রির কোচের দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের নভেম্বরে। গত মৌসুমে তার কোচিংয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে পঞ্চম হয় ক্লাব। প্লে-অফ সেমি-ফাইনালে সেবার হেরে যায় তারা সান্ডারল্যান্ডের কাছে। এবার আর সেই আফসোস নয়। ল্যাম্পার্ডের কোচিংয়ে অপ্রতিরোধ্য পারফরম্যান্সে সবাইকে অনেকটা পেছনে ফেলে লক্ষ্য অর্জন করল তারা।
প্রিমিয়ার লিগে ওঠায় বাড়তি ১২ থেকে ১৭ কোটি পাউন্ড আয়ের হাতছানি থাকবে কভেন্ট্রি সিটির সামনে। তবে স্রেফ অর্থই তো সবকিছু নয়। আবেগ-ভালোবাসা নিয়ে দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় ক্লাবের সমর্থকেরা।
সেই ১৮৮৩ সাল প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭৬ সালে শীর্ষ লিগে ওঠার পর সেখানে টিকে ছিল তারা টানা ৩৪ বছর। এই সময়টায় কতবার রেলিগেশনের লড়াইয় পড়েছে তারা! লড়াই করে টিকে থেকেছে মৌসুমের পর মৌসুম। কিন্তু ২০০০-০১ মৌসুমে ১৯তম হয়ে নেমে যায় তারা।
সেই অবনমনের হাত ধরে আর্থিক সঙ্কটও আসে। ২০১২ সালে নেমে যায় তারা তৃতীয় স্তরে। নতুন স্টেডিয়াম নিয়ে ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নর্থ্যাম্পটন টাউনের সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করতেও বাধ্য হয়েছিল তারা।
পতনের শেষ নয় সেখানেই। ২০১৭ সালে নেমে যায় তারা চতুর্থ স্তরে। ১৯৫৯ সালের পর প্রথমবার এতটা তলানিতে নামে তারা।
পরের মৌসুমেই অবশ্য আবার তৃতীয় স্তরে উঠে আসে। কিন্তু নানা সঙ্কটে জর্জর ছিল ক্লাব। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তারা ঘরের মাঠের ম্যাচগুলি খেলতে বাধ্য হয় বার্মিংহ্যাম সিটির মাঠে।
তবে ক্রমে উন্নতি হতে থাকে মাঠের ভেতরে ও বাইরে। আবার চ্যাম্পিয়নশিপ বা দ্বিতীয় স্তরে উঠে আসে তারা। ২০২২-২৩ মৌসুমে একটুর জন্য প্রিমিয়ার লিগে উঠতে পারেনি প্লে-অফ ফাইনালে হেরে যাওয়ায়। গতবার আটকে যেতে হয় প্লে-অফ সেমিতে। এবার তাদের ঠেকাতে পারেনি কেউ।
ম্যাচের পর কোচ ল্যাম্পার্ডের আনন্দ যেন ছুঁতে চাইছিল আকাশ। গৌরবময় ফুটবল ক্যারিয়ারে অনেক সাফল্যে নিজেকে রাঙিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই অর্জন তাকে এনে দিচ্ছে তৃপ্তি আর গর্ব।
“টমাসের গোল করার মুহূর্তটা ছিল অবিশ্বাস্য। আমরা জানতাম যে আমরা প্রায় লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি, কিন্তু ২৫ বছর পর শেষ পর্যন্ত জয়টা অর্জন করা… ওয়াও! এটা অসাধারণ। এতগুলো বছর ধরে সমর্থকরা কত কী সহ্য করেছে!”
“এটি একটি অসাধারণ ফুটবল ক্লাব। এই ছেলেরা অনন্য কিছু অর্জন করেছে। এটি আমার কাছে অন্যতম সেরা একটি অর্জন। আমি ভাগ্যবান যে চেলসির দুর্দান্ত দলগুলোতে ছিলাম, যারা লিগ শিরোপা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে, কিন্তু এই কাজটি করতে পেরে আমি তাদের ম্যানেজার হিসেবে অত্যন্ত গর্বিত।”
