সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ
Published : 04 Apr 2026, 10:51 PM
বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়ে সারা পথ নেচে-গেয়ে, পতাকা উড়িয়ে, অপেক্ষমান সমর্থকদের অভিনন্দনে সাড়া দিয়ে, রাস্তার দুই ধারের কাছের ডালপালা হাত দিয়ে সরিয়ে, বিক্ষিপ্তভাবে বাসের ছাদের উপরে ঝোলা বিভিন্ন তারের বাঁধা নিচুঁ হয়ে এড়িয়ে ৯টা ৪০ মিনিটে এম্ফিথিয়েটারে পৌঁছায় দল।
সবার আগে এম্ফিথিয়েটারে প্রবেশ করেন কোচ মার্ক কক্স। ট্রফি উঁচিয়ে ধরে কোচকে অনুসরণ করেন অধিনায়ক মিঠু চৌধুরী। তার পেছনেই ছিলেন ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে প্রথম শট রুখে দেওয়া এবং টুর্নামেন্ট সেরা গোলকিপারের ট্রফি জেতা ইসমাইল হোসেন মাহিন।
অনুষ্ঠানে আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন ডিফেন্ডার আশিকুর রহমান। ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে চোট পেয়ে দেশে ফেরা আশিক অনুষ্ঠানে আসেন স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে। সতীর্থরা সবাই তাকে আলিঙ্গনে বাঁধেন।
বিমানবন্দরে দলকে বরণ করে নেওয়া যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক আরেক দফা খেলোয়াড়দের অভ্যর্থনা জানান। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালসহ সংস্থাটির কর্মকর্তারাও ছিলেন। খেলোয়াড়, কোচ, কোচিং স্টাফদের সবার সাথে হাত মেলান তাবিথ।
ঢাউস অক্ষরে ‘চ্যাম্পিয়ন্স’ লেখার পেছনে সাজানো মঞ্চের সামনের দিকের ডেস্কে রাখা হয় সোনালি রঙের ট্রফিটি। একটু পরই বেজে ওঠে জাতীয় সঙ্গীত-আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
মঞ্চের স্ক্রিনে ফুটে ওঠে মালদ্বীপে বাংলাদেশের প্রতিটি স্মরণীয় মুহূর্ত- রোনানদের গোলের উদযাপন, শিরোপা জয়ের উল্লাস, মালে জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের দর্শকদের উচ্ছ্বাস।
ট্রফি সমর্থকদের উৎসর্গ করেন অধিনায়ক মিঠু, “এই ট্রফি আপনাদের জন্য। শুধু আপনাদের জন্য।”
কোচ মার্ক কক্স মঞ্চ জুড়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অনুভূতি জানান। ‘আমার হৃদয় বাঙালি’, বলে সবাইকে কিছুটা চমকে দেন এই ইংলিশ কোচ।
“সবাইকে আসসালামু আলাইকুম। আমার হৃদয় বাঙালি, বাংলাদেশ। বাফুফে সভাপতি আপনাকে ধন্যবাদ, সুন্দর এই আয়োজনের জন্য। আমি আমার স্টাফদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, এই লোকগুলো না থাকলে এই সাফল্য আসত না। প্রতিটি ছেলে তাদের সবটুকু দিয়ে বাংলাদেশের জন্য খেলেছে। ১৯৭১ সালের স্পিরিট… যেটা আপনাদের ইতিহাস..সেটা দেখিয়েছে। আমরা এই সাফল্য আবারও নিয়ে আসব।”
খেলোয়াড়দের প্রশংসায় ভাসানো তাবিথ আউয়াল মাঠে আসা দর্শকদের বিশেষ ধন্যবাদ জানান। যুবাদের সামনের পথচলা মৃসণ করতে সরকারি, বেসরকারিভাবে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বাফুফে প্রধান।
“আমাদের চ্যাম্পিয়ন ভাইয়েরা ও চ্যাম্পিয়ন কোচিং স্টাফ সবাইকে সালাম। শুরুতেই বলতে চাই, আমাদের মাঠে ১১ জন খেলোয়াড়ের সাথে ১২তম খেলোয়াড় ছিলেন আপনারা, দর্শকরা। প্রতিটি মুহূর্তে মালদ্বীপ থেকে আমাদের মনে হয়নি… আমরা দেশেই আছি। থাইল্যান্ডে, অস্ট্রেলিয়ায়, মালদ্বীপে-সব জায়গাতেই আপনারা একটা বার্তা দিয়েছেন, বাংলাদেশ আর থামবে না। বাংলাদেশ আর পিছে নামবে না। ধন্যবাদ সব দর্শকদেরকে।”
“বার্তাটা খুব পরিষ্কার। এটা সবে শুরু। ফাইনাল জিতেছি, ট্রফিটা বাংলাদেশে এসেছে, কিন্তু আরও ট্রফি আসার যে সংস্কৃতি আমরা দেখতে চেয়েছি, যেটার যাত্রা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। অতীতে আমাদের নারী দল বাছাই পেরিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা এশিয়ান কাপে খেলব। আজকে আমরা ইয়ুথ দলকে দেখছি…আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।”
“আমি বারবার বলে আসছি, আমাদের অনেক ঘাটতি আছে, কিন্তু ওরা যেভাবে খেলছে, যে পর্যায়ে খেলছে এবং দেশকে প্রতিদান দিচ্ছে, সে তুলনায় আমরা কিন্তু তাদের রিসোর্স দেওয়ার ধারে কাছেও নেই। আজও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে। যদি মন্ত্রণালয় এগিয়ে আসে, পৃষ্ঠপোষকরা এগিয়ে আসে, তাহলে আমরা সম্মিলিতভাবে খেলোয়াড়দের জন্য আমরা ভালো একটা ফ্যাসিলিটিজ তৈরি করতে চাই। তখনই কেবল আমরা ফুটবলারদের কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা করতে পারব।”
প্রতিক্রিয়ার শেষ দিকে এসে তাবিথ আউয়াল বলেন ‘উই আর দ্যা…’, সমবেত দর্শক-ফুটবলপ্রেমীরা সমস্বরে চিৎকারে আওয়াজ তোলেন ‘চ্যাম্পিয়ন।’
ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় ইসমাইল-রোনানদের এক ঘণ্টা দেরি হয় ঢাকায় পা রাখতে। বিমানবন্দরের ভিআইপি গেইটে গণমাধ্যমকর্মীদের, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, হাতিরঝিলের সাজানো এম্ফিথিয়েটারে আসা ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষাও বাড়ে। রাত সোয়া আটটায় ভিআইপি গেট দিয়ে যখন বেরিয়ে আসেন সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ বিজয়ীরা। উচ্ছ্বাসে-উল্লাসে, শ্লোগানে মুখরিত হয় চারধার।
মালদ্বীপের রাজধানী মালের জাতীয় স্টেডিয়ামে শুক্রবার শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ। বয়সভিত্তিক এই প্রতিযোগিতায় তাদের এটি দ্বিতীয় শিরোপা।