রক্ষণ জমাট রেখে মাঝমাঠে ছন্দময় ফুটবলের প্রত্যয়

সাবিত্রা ভান্ডারি, অনিকা বাসনেতদের আটকে চূড়ায় পৌঁছাতে উন্মুখ আঁখি-মনিকা-মারিয়ারা।

কাঠমান্ডু থেকে ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Sept 2022, 12:24 PM
Updated : 18 Sept 2022, 12:24 PM

বাংলাদেশ অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের চোখে তাদের রক্ষণ ‘ব্যালান্সড’। কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের মতে তার দলের মিডফিল্ড ‘অবিশ্বাস্য।’ নেপালের বিপক্ষে ফাইনালেও এই রক্ষণ আর মাঝমাঠকে সেরা চেহারায় চাইবে দল। ফুটবলারদেরও আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই। আঁখি-মাসুরা-শিউলিদের কণ্ঠে আশাবাদ রক্ষণ জমাট রাখার, সানজিদা-মারিয়া-মনিকাদের কণ্ঠে প্রত্যয় মাঝমাঠের সুর বেঁধে দেওয়ার।

এই রক্ষণ ও মাঝমাঠের চূড়ান্ত পরীক্ষা সোমবার। কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক নেপাল ও বাংলাদেশ। প্রথম শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নামবে দুই দল।

ফাইনালের পথে চার ম্যাচে বাংলাদেশ গোল করেছে ২০টি। তাতে মূল কৃতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই পাচ্ছে দলের আক্রমণভাগ। কিন্তু গোলের সেই সুযোগগুলো সাজিয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডারদের।

সাবিনা-কৃষ্ণা-স্বপ্নাদের নির্ভার থেকে আক্রমণে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছেন মাসুরা-আঁখিরা রক্ষণ জমাট রেখে। মনিকা-মারিয়ারা মাঝমাঠে থেকে বুনে দিয়েছেন আক্রমণের জাল। তাতে একের পর এক ধরাশায়ী মালদ্বীপ, পাকিস্তান, সাফের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত এবং সবশেষ সেমি-ফাইনালের প্রতিপক্ষ ভুটান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তারা বললেন, ফাইনালেও নিংড়ে দিতে চান শতভাগ, চার ম্যাচের সুর-ছন্দের ধারায় থেকে পৌঁছুতে চান চূড়ায়।

ফাইনালে উঠে আসার পথে তিন ম্যাচে ১১ গোল করেছে নেপাল। দলটির আক্রমণভাগে আছে সাবিত্রা ভান্ডারির মতো ক্ষুরধার ফরোয়ার্ড। তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ৪০টি আন্তর্জাতিক গোল। অনিকা বাসনেত, রাশ্মি কুমারি ঘিসিংও হয়ে উঠতে পারেন ম্যাচের নির্ণায়ক।

তবে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের সমীহ করলেও ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বার ডিফেন্ডার আঁখির চাওয়া, ফাইনালেও বিগত ম্যাচগুলোর দৃঢ়তা ধরে রাখুক তার রক্ষণের সতীর্থরা।

“এ পর্যন্ত আমরা চারটা ম্যাচ খেলেছি এবং এ পর্যন্ত আমাদের ডিফেন্স লাইন কোনো ভুল করেনি। ডিফেন্স নিয়ে আমরা বাংলাদেশে থাকতে এবং নেপালে এসেও অনেক কাজ করেছি। নেপাল শক্তিশালী দল এবং ওদের আক্রমণভাগও ভালো। তবে তাদেরকে আটকাতে আমরা সেভাবেই অনুশীলন করছি, মাঠেও নামব সেভাবে। চেষ্টা করব ফাইনালে কোনো ভুল না করার।”

ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন ২০১৯ সালে বিরাটনগরে করা আত্মঘাতী গোলের দুঃখ ভোলার লক্ষ্য নিয়ে নামবেন এবার। আরেক ডিফেন্ডার শিউলি আজিমও জানালেন গোল হজম না করাই একমাত্র লক্ষ্য তাদের।

“আগে থেকেই আমরা বলে আসছি, আমাদের লক্ষ্য ফাইনাল খেলা। দিন শেষে আমরা ফাইনালে উঠেছি। এখন লড়াইটা ট্রফির। ডিফেন্স লাইনে আমরা যারা আছি, তারা সবাই ফিট। সর্বোচ্চ চেষ্টা করব এবং ট্রফির জন্য লড়ব। নেপাল শক্তিশালী দল, কিন্তু আমাদেরও সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে কোনো গোল না খাওয়ার।”

চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে বদলি নেমে রক্ষণ সামলেছেন নিলুফা ইয়াসমিন নীলা। ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার রক্ষণের শক্তি বোঝাতে টানলেন শক্তিশালী ভারতের ফরোয়ার্ডদের আটকে রাখার উদাহরণ।

“মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে আমাদের রক্ষণের হয়ত ওভাবে পরীক্ষা হয়নি। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে আমাদের রক্ষণভাগের খেলা দেখেছে সবাই। সবার ধারণা হয়েছে আমাদের রক্ষণভাগ কতটা শক্তিশালী এবং আমাদের মধ্যে যোগাযোগ কতটা ভালো।”

মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা ও সানজিদা খাতুনও দৃঢ়তাপূর্ণ কণ্ঠে শোনালে মাঝমাঠের লাগাম মুঠোয় রাখার প্রত্যয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণে মাঝমাঠে ভেস্তে দেওয়ার লক্ষ্য সানজিদা বুঝিয়ে দিলেন ছক কষে।

“যখন আমরা মাঝমাঠে দাঁড়াই, তখন আমাদের সামনে থাকে স্বপ্না আপু, কৃষ্ণা দিদি। মাঝে সাবিনা আপু। এর নিচে খেলে মারিয়া, আরও নিচে আমি ও মনিকা। আমরা একটা ডায়মন্ড শেপ-এ এখানে দাঁড়াই। আমাদের লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের মাঝমাঠে খেলাটা বন্ধ করে দেওয়ার, সেটাই আমরা করি এবং ফাইনালেও আমরা সেটাই করব।”

কেবল মিডফিল্ড সামলাতেই নয়, মনিকা চাকমা গোল করতেও পারদর্শী। পাকিস্তান ম্যাচের তৃতীয় মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শটে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন তিনি। ১৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডারের কথায় প্রতিধ্বনিত হলো হাল না ছাড়া মানসিকতা।

“ফাইনালেও গোল করার চেষ্টা করব। তবে মাঝমাঠে আমাকে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে, সেটা আগে পালন করতে হবে। এটা করে যদি সুযোগ পাই গোল করার, তাহলে চেষ্টা করব কাজে লাগানোর। আমরা যদি আমাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারি, যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি, আশা করি কোনো সমস্যা হবে না। জয়ের জন্যই আমরা মাঠে নামব, শতভাগ দিব, আমরা আমাদের চেষ্টা ছাড়ব না।”

মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা মারিয়া মান্দা দিলেন শতভাগ নিংড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

“গত চারটা ম্যাচে আমরা যতুটুকু খেলে এসেছি, ফাইনালে তার চেয়ে আরও বেশি এফোর্ট দিতে চাই। আরও বেশি দেওয়ার চেষ্টা করব। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখার সামর্থ্য আমাদের আছে।”

ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের সামর্থ্য নিয়ে একবিন্দু সংশয় নেই অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের।

“আমাদের ডিফেন্স অনেক ব্যালান্সড এবং আমার মনে হয়, বিগত ম্যাচগুলো ওরা যেভাবে খেলেছে, ফাইনালেও যদি সে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভালো কিছু হবে। সাবিত্রা, অনিতাদের আটকানোর সামর্থ্য আমাদের রক্ষণের আছে। মিডফিল্ডে মনিকা-মারিয়া-সানজিদার সামর্থ্য নিয়ে তো কোনো প্রশ্নই নেই। ওদের নিয়ে আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী।”

কোচ ছোটনও খুব একটা চিন্তিত নন রক্ষণ ও মাঝমাঠ নিয়ে।

“গত চার ম্যাচে কেউ আমাদের জালে গোল পায়নি, মানে আমাদের ডিফেন্ডারদের সামর্থ্য আছে। মিডফিল্ডারদের প্রতিও আমার পুরোপুরি আস্থা আছে। মারিয়া-মনিকা-সানজিদা গত ম্যাচগুলোতে যেভাবে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে, এককথায় অবিশ্বাস্য।”

সেই বিশ্বাসের ছোঁয়াতেই শেষের বাধা পার হতে তৈরি দল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক