০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

জার্সিতে মুখ ঢেকে প্রেস্তিয়ান্নি ৫ বার ‘বানর’ বলেছেন ভিনিসিউসকে, অভিযোগ এমবাপের

বেনফিকার আর্জেন্টাইন উইঙ্গারের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগে চলছে তোলপাড়, প্রতিবাদে সরব অনেকেই।

জার্সিতে মুখ ঢেকে প্রেস্তিয়ান্নি ৫ বার ‘বানর’ বলেছেন ভিনিসিউসকে, অভিযোগ এমবাপের
জার্সিতে মুখ ঢাকার সেই মুহূর্ত। ছবি: ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Feb 2026, 10:24 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:58 PM

ভিনিসিউসের চোখধাঁধানো গোল, রেয়াল মাদ্রিদের জয়, সবকিছু ছাপিয়ে তোলপাড় চলছে বর্ণবাদের অভিযোগে। মাঠেই অভিযোগের পর খেলা বন্ধ ছিল প্রায় ১১ মিনিট। খেলা শেষেও চলছে বিতর্কের ঝড়। কিলিয়ান এমবাপের অভিযোগ, জার্সিতে মুখ ঢেকে ভিনিসিউসকে ৫ বার বানর বলেছেন জানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি। বেনফিকার আর্জেন্টাইন উইঙ্গার অবশ্য অস্বীকার করেছেন অভিযোগ। বেনফিকার কোচ জোসে মরিনিয়ো বলছেন, দুজনের কাছে তিনি দুরকম শুনেছেন।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্লে-অফের প্রথম লেগে মঙ্গলবার বেনফিকার মাঠে ৫০তম মিনিটে অসাধারণ এক গোল করেন ভিনিসিউস। সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচে গড়ে দেয় ব্যবধান।

গোলের পর কর্নার স্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে নেচে উদযাপন করেন ভিনিসিউস। যে উদযাপনের কারণে তাকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। কার্ড দেখে ক্ষোভ লুকাননি রেয়ালের ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার।

এর পরপরই বর্ণবাদের অভিযোগের ঘটনার সূত্রপাত। ভিনিসিউস ও তার সতীর্থদের অভিযোগে খেলা বন্ধ করে দেন রেফারি।

পরে খেলা শুরু হলেও ম্যাচের পরিস্থিতি বাকি সময় ছিল উত্তপ্ত। ভিনিসিউস ও এমবাপে বল ধরলেই দুয়ো দেন স্থানীয় সমর্থকেরা।

ঘটনার সময়ের টিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখ দিয়ে জার্সি ঢেকে কিছু একটা বলছেন প্রেস্তিয়ান্নি। সেই কথা শুনেই তেতে ওঠেন ভিনিসিউস ও আশেপাশে থাকা তার সতীর্থরা। সেখানে ছিলেন এমবাপেও। সেই সময়ের ফুটেজ দেখে মনে হয়েছে, প্রেস্তিয়ান্নির মুখের ওপর তাকে ‘ব্লাডি রেসিস্ট’ বলছেন এমবাপে।

প্রেস্তিয়ান্নির বর্ণবাদী মন্তব্য ম্যাচের পরে সংবাদমাধ্যমে খোলাসা করেন এমবাপে।

জার্সিতে মুখ ঢেকে কিছু বলছেন প্রেস্তিয়ান্নি। ছবি: ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট।

জার্সিতে মুখ ঢেকে কিছু বলছেন প্রেস্তিয়ান্নি

“বেনফিকার ২৫ নম্বর, তার নামও মুখে আনতে চাই না, কারণ এটা তার প্রাপ্য নয়…সে জার্সিতে মুখ ঢেকে ৫ বার বলেছে ‘ভিনি একটা বানর’, আমি শুনেছি এটা… এই ফুটবলার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্য নয়।”

বেনফিকা ক্লাব বা সমর্থকদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই এমবাপের। তিনি আঙুল তুলছেন প্রেস্তিয়ান্নির দিকেই। 

"আজকে রাতে খেলাধুলার ব্যাপারগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। এটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা, এবং এখানে যা ঘটেছে, আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি না।”

“যে শিশুরা ঘরে বসে খেলা দেখছে, তাদের সামনে নজির স্থাপন করতে হবে আমাদের। আজকে যা ঘটেছে, তা আমরা মেনে নিতে পারি না, কারণ গোটা বিশ্ব আমাদের দেখছে। যখন কেউ এই ধরণের আচরণ করে (প্রেস্তিয়ান্নির মতো), তখন আমাদের কথা বলতেই হবে এবং নিন্দা জানাতে হবে। বেনফিকা ক্লাব, এই ক্লাবের ভক্ত বা কোচের বিরুদ্ধে আমার কিছু নেই। তবে কিছু একটা করতে হবে।।”

এমবাপের মতে, প্রেস্তিয়ান্নি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলার যোগ্য নন এবং তাকে নিষিদ্ধ করা উচিত। 

"আমরা মেনে নিতে পারি না যে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল প্রতিযোগিতায় এমন একজন ফুটবলার আছে, যে এই ধরণের আচরণ করে। এই ছেলেটি আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্য নয়। এটা আমার মতামত। জানি না তারা কী করবে, আমি তো আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ নই। উয়েফা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু করার চেষ্টা করছে এবং আমি মনে করি, আজ এখানে যা ঘটেছে, তা নিয়ে তাদের কিছু করা উচিত।"

ক্ষুব্ধ এমবাপে জানান, তিনি নিজেও মাঠ ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন, তবে ভিনিসিউসের অনুরোধে খেলা চালিয়ে যান। 

প্রেস্তিয়ান্নি পরে ক্ষমা চেয়েছেন কি না জানতে চাইলে রেয়ালের এই ফরাসি ফরোয়ার্ড হেসে বলেন, “অবশ্যই নয়…!”

প্রেস্তিয়ানির বিরুদ্ধে একইরকম অভিযোগ করেছেন রেয়ালের আরেক তারকা অহেলিয়া চুয়ামেনিও। 

তবে প্রেস্তিয়ান্নি ম্যাচের পর সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, তার কথা ভুল শুনেছেন ভিনিসিউস। উল্টো অভিযোগ করেন তিনি রেয়ালের ফুটবলারদের বিরুদ্ধে।

“আমি পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, ভিনি জুনিয়রকে কখনোই আমি বর্ণবাদী অপমানসূচক কিছু বলিনি, দুঃখজনকভাবে সে যা শুনেছে, তা ভুল বুঝেছে।”

“আমি কখনোই কোনো বর্ণবাদী আচরণ করিনি এবং খারাপ লাগছে যে, রেয়াল মাদ্রিদের ফুটবলারদের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছি।”

প্রেস্তিয়ান্নিকে এড়িয়ে ছুটে যাচ্ছেন ভিনিসিউস। ছবি: রয়টার্স।

প্রেস্তিয়ান্নিকে এড়িয়ে ছুটে যাচ্ছেন ভিনিসিউস

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, রেফারির কাছে প্রেস্তিয়ান্নি দাবি করেছেন, ভিনিসিউসকে তিনি ‘এরমানো (hermano)’ যেটির অর্থ ‘ভাই।’ তবে ‘ভাই’ বলতে জার্সিতে মুখ ঢাকতে হবে কেন, সেই প্রশ্ন থাকছে। 

বেনফিকার কোচ ও রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ মরিনিয়ো ম্যাচের পর বলেন, “দুজনের সঙ্গেই কথা বলেছি আমি। প্রেস্তিয়ান্নি একরকম বলছে, ভিনি আরেকরকম।”

ইতালিয়ান বংশোদ্ভুত আর্জেন্টাইন প্রেস্তিয়ান্নি ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনার ক্লাব ভেলে সারফিল থেকে যোগ দেন বেনফিকায়। গত নভেম্বরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় ২০ বছর বয়সী উইঙ্গারের।

ভিনিসিউস পরে সামাজিক মাধ্যমে বিবৃতিতে হতাশা প্রকাশ করেন। 

“বর্ণবাদীরা সর্বোপরি কাপুরুষ। দুর্বলতা দেখানোর জন্য মুখ শার্ট দিয়ে ঢেকে রাখা প্রয়োজন হয় তাদের। কিন্তু তাদেরকে সুরক্ষা দেয় অন্যরা, তাত্ত্বিকভাবে আসলে যাদের দায়িত্ব শাস্তি দেওয়ার। আজ যা ঘটেছে, আমার জীবনে বা আমার পরিবারের জীবনে এসব নতুন নয়।”

“গোল উদযাপনের জন্য আমি হলুদ কার্ড পেয়েছি। এখনও বুঝতে পারছি না কেন পেলাম! অন্যদিকে, এটি কেবল বাজেভাবে বাস্তবায়িত একটি প্রোটোকল, যেটা কোনো কাজে আসেনি। এই ধরণের পরিস্থিতিতে পড়তে কখনোই পছন্দ করি না আমি, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জয়ের পরে যখন শিরোনামে থাকার কথা রেয়াল মাদ্রিদ, তবে এটি জরুরি।”

ম্যাচের পর বিভিন্ন টিভিতে আলোচনায় ভিনিসিউসের পক্ষে কণ্ঠ উচ্চকিত করেন থিয়েরি অঁরি, ভেসলি স্নাইডার, জো কোল ও সাবেক তারকা-বিশ্লেষকদের অনেকেই। জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বলার প্রেক্ষিতেই প্রেস্তিয়ান্নিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান তারা।

বছরের পর বছর ধরেই স্পেনের বিভিন্ন মাঠে বর্ণবাদী মন্তব্য ও আচরণের শিকার হওয়ার নানা অভিযোগ করে আসছেন ভিনিসিউস। কেবল ২০২২ সালেই তাকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে ১৮টি আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয়। সবশেষ গত মাসে দ্বিতীয় বিভাগের দল আলবাসেতের মাঠে কোপা দেল রের ম্যাচে বর্ণবাদের শিকার হতে হয় তাকে।