Published : 09 Jul 2025, 06:16 PM
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চে চোখধাঁধানো দুটি গোল। নতুন ক্লাবের হয়ে প্রথমবার শুরুর একাদশে নেমেই নজরকাড়া পারফরম্যান্স। দলকে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার নায়ক। মাঠে জোয়াও পেদ্রোর উদযাপন হওয়ার কথা বাঁধনহারা। মাঠের বাইরেও উচ্ছ্বাস ছোঁয়ার কথা আকাশ। কিন্তু চেলসির নতুন তারকা গোল করে ভঙ্গি করলেন ক্ষমা চাওয়ার। মাঠের বাইরে তার কণ্ঠে দুঃখপ্রকাশের সুর।
পেদ্রোর জন্য আসলে ম্যাচটি ছিল অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার। সপ্তাহখানেক আগে চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর এই ক্লাবের হয়ে প্রথমবার শুরুর একাদশে জায়গা পেলেন তিনি ক্লাব বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে। সেই ম্যাচের প্রতিপক্ষ ফ্লুমিনেসি, যেটি তার ছেলেবেলার ক্লাব, তার হৃদয়ে যে ক্লাব চিরস্থায়ী জায়গা নিয়ে আছে!
পেদ্রোর পেশাদারিত্বের জয় সেখানে হয়েছে। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের দুর্দান্ত দুই গোলে ব্রাজিলের ক্লাব ফ্লুমিনেসিকে হারিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে চেলসি।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পেদ্রো প্রথম গোলটি করেন অষ্টাদশ মিনিটে। বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পেদ্রো নেতো বল বাড়ান ফ্লুমিনেসির বক্সে। একজন ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে ফিরে বল চলে আসে বক্সের ঠিক বাইরে দাঁড়ানো পেদ্রোর কাছে। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি বক্সের বাইরে থেকেই গতিময় বাঁকানো শটে বল পাঠান জালে। গোলকিপারের করার ছিল সামান্যই।
গোলটি দেখে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে ফেলেন নেতো। তবে পেদ্রো কোনো উদযাপন করেননি। বরং দু হাত ওপরে তুলে আত্মসমপর্ণের ভঙ্গি করেন। তাকে ঘিরে উল্লাস করেন সতীর্থরা। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রায় নির্লিপ্ত, মুখে ছিল না হাসিও। এক পর্যায়ে হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিও করেন
৫৬তম মিনিটে গোলটি আরও দুর্দান্ত। মাঝমাঠ থেকে এন্সো ফের্নান্দেস দারুণভাবে বল বাড়ান বাঁ প্রান্তে পেদ্রোর দিকে। তিনি দ্রুতগতিতে বল ধরে বক্সে ঢুকে যান। একজনকে কাটিয়ে দুইজনের মাঝ দিয়ে আচমকা শট নেন। গোলার মতো শট ক্রসবারে লেগে ঢুকে যায় জালে, গোলকিপারের করার ছিল না কিছুই।
এবারও কোনো উদযাপন করেননি। ছুটে গিয়ে দু হাত ওপরে তুলে আবারও একই ভঙ্গি করেন।
ম্যাচের পর উদযাপন না করার কারণ জানান ২৩ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড।
“তারা (ফ্লুমিনেসি) আমাকে সবকিছু দিয়েছে। গোটা বিশ্বের সামনে আমাকে তুলে ধরেছে তারা। আজ আমি এখানে আসতে পেরেছি, কারণ তারা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছে।”
“আমি খুবই কৃতজ্ঞ। তবে এটা তো ফুটবল, আমাকে পেশাদার হতে হবে। তাদের প্রতি আমি দুঃখপ্রকাশ করছি, নিজের কাজটা আমাকে করতোই হতো।”
পেদ্রোর জন্ম সাও পাউলোতে। তার বাবা জোসে জোয়াও দে জেসুসও ছিলেন ফুটবলার, খেলতেন বতাফোগোয়। ব্রাজিলের ফুটবলে তিনি পরিচিত ছিলেন চিকাও নামে। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই খুনে সহায়তায় অভিযোগে ১৬ বছরের জেল হয় তার। আট বছর পর অবশ্য তিনি মুক্তি পান। তবে পরের বছরই আবার গ্রেপ্তার হন প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মানুষকে হুমকি দেওয়ায়।
চিকাও প্রথমবার জেলে যাওয়ার সময়ই অবশ্য স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ছেলে পেদ্রোকে নিয়ে তার মা পাড়ি জমান রিও দে জেনেইরোয়। ১০ বছর বয়সে ফ্লুমিনেসির একাডেমিতে পা পড়ে পেদ্রোর। সেখানেই নিজেকে গড়ে তোলেন ফুটবলার হিসেবে। বয়স ১৮ হওয়ার আগেই ফ্লুমিনেসির হয়ে তার অভিষেক পেশাদার ফুটবলে।
এর কয়েক মাস আগেই অবশ্য প্রতিভাবান এই ফুটবলারের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলে ইংল্যান্ডের ক্লাব ওয়াটফোর্ড। বয়স ১৮ পূর্ণ হওয়ার পর ইংলিশ ক্লাবটিতে পা রাখেন তিনি। সেখানে তিন মৌসুম খেলে ২০২৩ সালে নাম লেখান ব্রাইটন অ্যান্ড হোভে। সেখানে তার সময় কাটে ভালোমন্দ মিলিয়ে। দারুণ কিছু ঝলক যেমন দেখান তিনি, তেমনি ছিল অধারাবাহিকতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনাও।
গত ২ জুলাই তাকে আট বছরের চুক্তিতে দলে নেয় চেলসি। দু দিন পরই নতুন ক্লাবের হয়ে তার অভিষেক হয় ক্লাব বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে। বদলি নেমে সেদিন অল্পের জন্য গোলের দেখা পাননি। সেমি-ফাইনালে শুরুর একাদশে জায়গা পেয়ে সেই আক্ষেপ আর রাখলেন না।
নিজের গোলের আনন্দ তো আছেই, পেদ্রো বেশি খুশি দল জিততে পারায়।
“আজকে যেহেতু আমি শুরুর একাদশে ছিলাম, নিজেকে মেলে ধরার ও গোল করার বেশি সুযোগ আমার ছিল। দল জিতেছে, গোটা দল ভালো খেলেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”