১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পুনরুত্থানের স্বপ্ন পূরণে বিএনপির প্রার্থী তালিকায় ‘নবীন-প্রবীণের সম্মিলন’

রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমানের মতে, নতুন-পুরনোর এই সম্মিলনই বিএনপির নির্বাচনি বৈতরণী পেরুনোর সহায় হয়ে উঠতে পারে।

পুনরুত্থানের স্বপ্ন পূরণে বিএনপির প্রার্থী তালিকায় ‘নবীন-প্রবীণের সম্মিলন’
দুই দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা এবার বদলে যাওয়া রাজনীতির মাঠে বড় সুযোগ দেখছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Nov 2025, 02:00 AM

Updated : 01 Sep 2026, 09:46 PM

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন পূরণে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ২৩৭ আসনে দলীয় মনোনয়নের যে প্রাথমিক তালিকা বিএনপি ঘোষণা করেছে, তার এক তৃতীয়াংশ আসনে দেখা যাচ্ছে নতুন মুখ।  

অসুস্থতাসহ নানা কারণে মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবার নির্বাচন করবেন কি না, সেই সংশয় মুছে তিন আসনে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

১৭ বছর ধরে প্রবাসে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও প্রথমবারের মত নির্বাচনে প্রার্থী হতে যাচ্ছেন, যার দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন নেতাকর্মীরা।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া রাজনীতির মাঠে বিএনপির নেতাকর্মীরা এবার বড় সুযোগ দেখছেন। অন্তত ৮১টি আসনে এমন প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, যারা এবারই প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

তাদের সঙ্গে অন্তত তিন ডজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদের নাম রয়েছে মনোনয়নের তালিকায়, যারা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন। 

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যারা মাঠে কাজ করেছেন, যাদের সাথে মানুষের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন মাঠে ছিলেন, নিপীড়ন-নির্যাতন ভোগ করেছেন, মানুষজন যাদের ভালো জানে, যাদের জনপ্রিয়তা আছে, এরকম ব্যক্তিদের আমরা প্রাধান্য দিয়েছি। এক কথায় বলতে পারেন নবীন-প্রবীণের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে।”

গত কয়েকদিন ধরেই বিভাগওয়ারি প্রার্থীদের ঢাকায় ডেকে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। কে কোথায় ধানের শীষ পেতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে জোর আলোচনাও শুরু হয়েছিল। 

শেষ পর্যন্ত সোমবার দুপুরে দলের স্থায়ী কমিটির সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে ২৩৭ আসনের প্রার্থী তালিকা অনুমোদন করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সন্ধ্যায় গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করে সেই তালিকা পড়ে শোনা মির্জা ফখরুল।

রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমানের মতে, নতুন-পুরনোর এই সম্মিলনই বিএনপির নির্বাচনি বৈতরণী পেরুনোর সহায় হয়ে উঠতে পারে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নবীন এবং প্রবীণ, ডেডিকেটেড এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি– সবকিছু মিলিয়ে এবারের প্রার্থী সিলেকশনে আমি খুব বেশি সীমাবদ্ধতা দেখি না। এটা উইনিং প্রার্থী তালিকা রয়েছে।”

‘মাথার ওপর ছাতা’

গত ২৪ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, নির্বাচনে খালেদা জিয়ার আসন কোনটি হবে?

জবাবে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আমরা আশা করছি, দেশনেত্রী নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন নির্বাচন করবেন কিনা। আমরা তো চাই তিনি নির্বাচনে অংশ নেন।’’

সেই সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি।

এর মধ্যে বাবার বাড়ির আসন ফেনী-১ এবং শ্বশুরবাড়ির আসন বগুড়া-৭ এ তিনি আগেও একাধিকবার জিতেছেন। তবে জন্মস্থানের আসন দিনাজপুর-৩ এ তিনি এবারই প্রথম নির্বাচন করবেন।

তার বড় ছেলে তারেক রহমানকে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ভাবেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। লন্ডন থেকে তিনি কবে দেশে ফিরবেন, সেই তারিখ জানতে না পারলেও তারেক যে নির্বাচন করছেন, সেই নিশ্চয়তা তারা এবার পেলেন। 

তারেক রহমান নির্বাচন করবেন বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকে, যে আসনে এর আগে তিনবার বিজয়ী হয়েছেন খালেদা জিয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন সময়ে বিএনপির পুনরুত্থান হয়েছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে; দুইটা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে তার যে লড়াই, সেই লড়াইটা বাংলাদেশের অনেক ভোটার অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখে।

“সেই জায়গা থেকে খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে একটা ঐক্য তৈরি হয়। খালেদা জিয়াকে এই বয়সেও (আশি পেরিয়েছে) প্রার্থী করে দলের ঐক্যের জায়গাটা ধরে রাখতে পেরেছে বিএনপি।”

এ বিশ্লেষক বলেন, “ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আলাপ আলোচনা আছে। তার মনোনয়ন ঘোষণা করে বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারেক রহমান এবং খালেদা জিয়া দুইজনের নাম আগেভাগে ঘোষণা করে দলীয় ঐক্য সংহত করার পাশাপাশি অনিশ্চয়তা দূর করতে পারবে বিএনপি।”

কারা আছেন, কারা নেই

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল প্রার্থী হচ্ছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে।

দলের সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির ১৪ সদস্যদের মধ্যে আরও নয়জন প্রার্থী হচ্ছেন তাদের আসনগুলোতে। তারা হলেন - কুমিল্লা-১ আসনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাস, ঢাকা-৩ আসনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নরসিংদী-২ আসনে আবদুল মঈন খান, চট্টগ্রাম-১০ আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কক্সবাজার-১ আসনে সালাহউদ্দিন আহমদ, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভোলা-৩ আসনে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও দিনাজপুর-৬ আসনে এজেডএম জাহিদ হোসেন।

তবে বর্ষীয়ান নেতা ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া ও নজরুল ইসলাম খানের পাশাপাশি সেলিমা রহমান প্রথম দফার তালিকায় নেই। এরমধ্যে জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির পঞ্চগড় ১ আসন থেকে প্রার্থী হচ্ছেন।

দলের ২১ জন ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রার্থী হচ্ছেন সাতজন। তারা হলেন - পটুয়াখালী-১ আসনে আলতাফ হোসেন চৌধুরী, নোয়াখালী-৩ আসনে বরকত উল্লাহ বুলু, নোয়াখালী-৪ আসনে মোহাম্মদ শাহজাহান, ফেনী-৩ আসনে আবদুল আউয়াল মিন্টু, মাগুরা-২ আসনে নিতাই রায় চৌধুরী, কুমিল্লা-৩ আসনে কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ও টাঙ্গাইল-৮ আসনে আহমেদ আজম খান।

আলোচনায় থাকা ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপন বাদ পড়েছেন প্রার্থী তালিকা থেকে।

চেয়ারপারসনের ৮১ জন উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে দলের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ২২ জন।

তারা হলেন- কুমিল্লা-৬ আসনে মনিরুর হক চৌধুরী, ঢাকা-২ আসনে আমান উল্লাহ আমান, নোয়াখালী-১ আসনে মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী-৪ আসনে জয়নুল আবদিন ফারুক, বরিশাল-১ আসনে জহির উদ্দিন স্বপন, বরিশাল-৫ আসনে মজিবুর রহমান সারোয়ার, নেত্রকোণা-৪ আসনে লুৎফুজ্জামান বাবর, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে তাজভীর উল ইসলাম, পাবনা-৪ আসনে হাবিবুর রহমান হাবিব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে মুশফিকুর রহমান, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, মানিকগঞ্জ-২ আসনে মঈনুল ইসলাম খান, সিলেট-১ আসনে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট-২ আসনে তাহমিনা রশদীর লুনা, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে আবুল খায়ের ভুঁইয়া, সিলেট-৬ আসনে এনামুল হক চৌধুরী, টাঙ্গাইল-২ আসনে আবদুস সালাম পিন্টু, ফেনী-২ আসনে জয়নাল আবেদীন ভিপি জয়নাল, কিশোরগনজ-৪ আসনে ফজলুর রহমান, মৌলভীবাজার-৩ আসনে নাসের রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে হারুনুর রশীদ।

আলোচিত কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েছেন। আর ছয় যুগ্ম মহাসচিবের মধ্যে তিনজন পেয়েছেন; প্রার্থী তালিকায় নেই হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আবদুস সালাম আজাদ ও হুমায়ুন কবিরের নাম।

যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে নরসিংদী-১ আসনে খায়রুল কবির খোকন, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং ময়মনসিংহ-১ আসনে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স রয়েছেন প্রার্থী তালিকায়।

প্রথম ধাপের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে ফখরুল বলেন, “আমরা বলতে চাই, এটা আমাদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা।”

ধানের শীষের উত্তরাধিকার

প্রার্থী হিসেবে নতুন-পুরোনোর মিশেলে যে ২৩৭ জনকে বিএনপি বেছে নিয়েছে, তাতে স্থান পেয়েছেন দলটির দ্বিতীয় প্রজন্মের বেশ কিছু নেতা।

ধানের শীষের টিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে যাওয়া এসব প্রার্থীর মধ্যে কেউ কেউ আগেও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। দুয়েকজন দায়িত্ব পালন করেছেন সংসদ সদস্য হিসেবেও।

পঞ্চগড়-১ আসনে সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারের জায়গায় তার ছেলে মোহাম্মদ নওশাদ জমিরকে ধানের শীষের টিকেট দিয়েছে বিএনপি। নওশাদ বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক।

সাবেক যুব ও ক্রীড়া এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমিন পুতুলকে নাটোর-১ আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। আইনজীবী পুতুল নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি।

কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছেলে রাগীব রউফ চৌধুরীকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রাগীব রউফ সুপ্রিম কোর্টে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্যানেল আইনজীবী।

সাবেক খাদ্য, তথ্য এবং বন ও পরিবেশমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে যশোর-৩ আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ২০১৮ সালের নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।

ঢাকা-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে তানভীর আহমেদ রবিনকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামাচ্ছে বিএনপি। রবিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব।

অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকে ঢাকা-৬ আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। আদালতের রায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হতে পারলেও রাজনীতির প্যাঁতে তার সেই চেয়ারে বসা হয়নি।

ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ দলটির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন।

সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে চৌধুরী নায়াব ইউসুফকে ফরিদপুর-৩ আসনের প্রার্থী করেছে বিএনপি। নায়াব ইউসুফ বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।

সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ছেলে নাসের রহমানকে মৌলভীবাজার-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি নাসের রহমান ২০০১ সালের উপ-নির্বাচনে ওই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের বাবা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। মীর হেলাল বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে চট্টগ্রাম-৭ আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। হুম্মাম বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনে সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে বিএনপি। বাপ্পা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আ স ম হান্নান শাহর ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজকে গাজীপুর-৪ আসনে প্রার্থী করছে বিএনপি। ২০১৮ সালেও এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন বর্তমানে গাজীপুর জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক রিয়াজ।

মানিকগঞ্জ-২ আসনে ধানের শীষের টিকেট পাওয়া মঈনুল ইসলাম খাঁন সাবেক শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খানের ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি।

ময়মনসিংহ-৯ আসনে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আনওয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীর ছেলে ইয়াসের খান চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে বিএনপি। তিনি নান্দাইল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক।

শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল হকের ছেলে। তিনি ২০০১ সালের নবম সংসদের সদস্য ছিলেন বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এই সদস্য।

শেরপুর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী সাবেক হুইপ প্রয়াত জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে। তিনিও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর মেয়ে সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কাকে শেরপুর-১ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ২০১৮ সালের বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন বর্তমানে ৩২ বছর বয়সি প্রিয়াঙ্কা। পেশায় চিকিৎসক প্রিয়াঙ্কা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

ঝিনাইদহ-৩ আসনে প্রার্থী হিসাবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া মেহেদী হাসান ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে।

গাজীপুর- ২ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন এম মঞ্জুরুল করিম রনি। তিনি গাজীপুরের সাবেক মেয়র আব্দুল মান্নানের ছেলে।

পিরোজপুর- ২ আসনে মনোনায়ন পেয়েছেন আহমেদ সোহেল মঞ্জু সুমন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের ছেলে।

রাজনীতির বিশ্লেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করছেন, প্রবীণ ও প্রয়াত নেতাদের এই উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে বিএনপির ‘ভালো ফলাফল’ বয়ে আনতে পারে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “যে নেতা প্রয়াত, স্বাভাবিকভাবেই তার একটা ফুটপ্রিন্ট থেকে যায়। তারও একটা সাপোর্ট বেজ থেকে যায়। তারপর তার ছেলে যদি ভালো কাজ করে, নির্বাচনে রেজাল্ট নিয়ে আসে, সেটা অবশ্যই যাচাই করা হবে।”

আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “প্রয়াত নেতাদের সন্তানরা রাজনীতিতে সক্রিয়, এলাকায় সক্রিয়, বিভিন্ন পদ-পদবিতে আছে। তারা তো দাবি করতেই পারে। কোনো নেতার সন্তান হিসেবে নয়, তাদের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে আমরা অবশ্যই তাদের বিবেচনায় আনা হবে।”

আর বিএনপির তরুণ নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলছেন, “এখানে নতুনদের যেমন প্রধান্য দেওয়া হয়েছে, তেমনি প্রবীণ অভিজ্ঞদের রাখা হয়েছে একটি নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে প্রত্যাশায়।”

জনসভায় খালেদা জিয়া, ফাইল ছবি

জনসভায় খালেদা জিয়া, ফাইল ছবি

‘এক পরিবারের এক সদস্য নীতি’

জিয়া পরিবার বাদ দিলে এই মনোনয়নে ‘এক পরিবারের এক সদস্য’ নীতি বজায় রাখতে পেরেছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে ঢাকার বিএনপি কর্মী কামরুল হাসান বলেন, “মির্জা আব্বাস, আফরোজা আব্বাস, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, তানভীর আহমেদ রবিন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নিপুণ রায় চৌধুরী, আমান উল্লাহ আমান, ইরফান ইবনে আমান অমি–এরা সবাই জনপ্রিয় নেতা। এদের থেকে একজনকে বেছে নিয়েছে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব।

“আমি মনে করি এটা একটা ভালো দিক। পরিবারতন্ত্র থেকে দলকে বের করে নিয়ে আসার সূচনা বলা যেতে পারে।” 

দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, 'এক পরিবার এক প্রার্থী'র এই সিদ্ধান্ত এসেছে সরাসরি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে। সম্প্রতি একাধিক সিনিয়র নেতাকে ফোন করে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।

রাজনীতির বিশ্লেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এর পাশাপাশি দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চার ওপর জোর দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র ভাঙা সহজ নয়। বিএনপির এই নীতি ইতিবাচক হলেও, বাস্তবায়নের সময় দেখা যাবে–কতটা তারা দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারে। এটা শুধু প্রার্থিতা নয়, দলীয় সংস্কৃতির বিষয়ও।”

প্রবীণ ও প্রয়াত নেতাদের সন্তানদের পাশাপাশি দীর্ঘ আন্দোলনে ভূমিকা রাখা মাঠের তরুণদেরও মনোনয়নের তালিকায় রাখার চেষ্টা করেছে বিএনপি। 

যশোর-৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করবেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। তিনি বর্তমানে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য।

আবার ‘গুম’ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আলোচনায় আসা ‘মায়ের ডাক’ এর সানজিদা ইসলাম তুলিকে ঢাকা-১৪ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

এ প্রসঙ্গ ধরে কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “এই তালিকায় নতুন পুরাতনের সম্মিলন যেমন হয়েছে, তেমনি ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও অবজ্ঞা করা হয়নি। যারা বিএনপির প্ল্যাটফর্মের বাইরে থেকে লড়াইটা করেছে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে, যেমন সানজিদা তুলি, তারাও বিএনপি থেকে প্রার্থিতা পেয়েছে। এটা ভালো সিলেকশন হয়েছে।”

২৩৭ জনের তালিকায় ১২টি আসনে দশজন নারীকে মনোনীত করার প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, বিএনপি সরাসরি আসনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আরো বাড়াতে পারে।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমান। ফাইল ছবি

খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমান। ফাইল ছবি

শরিকদের জন্য কী?

যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে কাদের কত আসন দেওয়া হবে, তা ঘোষণা না করলেও ৬৩ আসন ফাঁকা রেখেছে বিএনপি।

সবশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি জোট শরিকদের জন্য ২২টি আসন রেখেছিল। এর মধ্যে গণফোরামকে সাতটি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে চারটি, জেএসডিকে চারটি, এলডিপিকে চারটি, খেলাফত মজলিশকে দুটি এবং কল্যাণ পার্টিকে একটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমাদের সঙ্গে যারা, যুগপৎ আন্দোলন করেছেন, যে সমস্ত আসনে তারা আগ্রহী, সে সমস্ত আসনগুলোতে আমরা কোনো প্রার্থী দিইনি। আমরা আশা করছি তারা তাদের নাম ঘোষণা করবেন, তখন আমরা চূড়ান্ত করব।

“এটা হচ্ছে আমাদের সম্ভাব্য তালিকা, এখানে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে আমাদের যুগপৎ আন্দোলনে যারা শরিক দলগুলো আছেন, তাদের সাথে আলোচনা করে আমরা কোনো কোনো আসনে পরিবর্তন আনতে পারি।”

বিএনপির এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন দীর্ঘদিন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, যিনি এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

তিনি বলেন, “আমার যেটা মনে হয়েছে, মিত্র যারা ছিল তাদের জন্য স্পেস রাখা হয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক যেই অঙ্গীকারটা ছিল যে সকলে মিলে একটা সরকার তৈরি করার একটা চেষ্টা, তার একটা প্রতিফলন প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে।

“বড় দল হিসেবে বিএনপির এই ছাড়টা অভিভাবকসুলভ হয়েছে। নির্বাচনের জন্য সবাইকে একত্রিত করতে হলে সবার ইচ্ছার কিছু প্রতিফলন ঘটাতে হয় এবং কিছু ছাড় দিতে হয়। সেটার প্রতিফলন এখানে আছে বলে মনে হচ্ছে ।”