মহাকাশ থেকে ৯/১১ হামলা যেভাবে দেখেছিলেন নাসার এই নভোচারী
ওই সময় তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছিলেন। এসব হামলার পরপরই মহাকাশ থেকে নিউ ইয়র্কের ওপর দিয়ে পেরোনোর সময় সেই ধ্বংসলীলা দেখেছেন তিনি।
আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ও মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন নাসার একজন নভোচারী, যেখানে ২৫ বছর আগে মহাকাশ থেকে টুইন টাওয়ারে হামলার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছিলেন তিনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীরা যখন নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে বাণিজ্যিক প্লেন দিয়ে হামলা চালায় ও ২ হাজার সাতশ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে তখন একমাত্র আমেরিকান নভোচারী হিসেবে পৃথিবীর বাইরে অবস্থান করছিলেন ফ্র্যাঙ্ক কালবার্টসন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট স্পেস ডটকম প্রতিবেদনে লিখেছে, ওই সময় তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএসে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছিলেন।
এসব হামলা সংঘটিত হওয়ার ঠিক পরপরই আইএসএস নিউ ইয়র্কের ওপর দিয়ে অতিক্রমের সময় কালবার্টসন সেই ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেছেন।
তিনি টেক্সাসের হিউস্টনে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে রিয়াল-টাইমে নিজের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন, যা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হয়সি।
সেদিন মিশন কন্ট্রোলকে উদ্দেশ্য করে কালবার্টসন বলেছিলেন, “আমরা নিউ ইয়র্ক সিটি ও আগুন থেকে নির্গত ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি। সেখানে ও অন্য সব জায়গার মানুষের জন্য আমাদের প্রার্থনা ও সমবেদনা রইল এবং ওয়াশিংটনের মানুষের প্রতিও। আমি ইস্ট কোস্টের দিকে ওপর-নিচে তাকিয়ে দেখছি অন্য কিছু দেখতে পাই কি না।”
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীরা চারটি বাণিজ্যিক প্লেন ছিনতাই করেছিল, যার দুটিতে করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ও একটি পেন্টাগনে আঘাত হানে।
চতুর্থ প্লেনটির যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের সাহসিকতার সঙ্গে ঠেকানোয় তা নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তু বা মার্কিন ক্যাপিটল ভবনে আঘাত হানতে না পেরে পেনসিলভানিয়ার ফাঁকা মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কালবার্টসন বলেছেন, “আমি আশা করি দায়ী ব্যক্তিদের যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে সবার আগে সকল ক্ষতিগ্রস্তের প্রতি আমাদের প্রার্থনা ও সমবেদনা।
“আমি কেবল দেশবাসীকে জানাতে চাই, মহাকাশ থেকে তাদের শহরকে এখনও খুব সুন্দর দেখায়। আমি জানি এই মুহূর্তে আমেরিকার প্রতিটি মানুষের জন্য পরিস্থিতি কঠিন এবং সবাই এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ও ঘুরে দাঁড়াতে কঠোর সংগ্রাম করছে।
“তবে এই দেশ এখনও সুন্দর ও নিউ ইয়র্কবাসীর উদ্দেশ্যে বলছি, ওপর থেকে আপনাদের শহরকে এখনও দারুণ দেখাচ্ছে।”
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার একদিন পর এক খোলা চিঠিতে নিজের এসব অনুভূতির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন নাসার নভোচারী কালবার্টসন।
সেদিন তিনি লিখেছিলেন, “আজ পৃথিবী বদলে গেল। আমাদের দেশের ওপর যখন আক্রমণটি হল এর তুলনায় আমি যা বলছি বা করছি তা একেবারে নগণ্য। এত উঁচু থেকে নিজের দেশের ক্ষতস্থান থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে দেখা মর্মান্তিক।
“পৃথিবীতে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য একটি মহাকাশযানে বসে এমন পরিকল্পিত ও ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীবন ধ্বংস হতে দেখা যে কোনো মানুষের মানসিকতার জন্যই বড় ধাক্কা।”
২০০১ সালের ১২ অগাস্ট স্পেস শাটল ডিসকভারিতে চড়ে নভোচারী ভ্লাদিমির দেঝুরভ ও মিখাইল টিউরিনের সঙ্গে আইএসএসে পৌঁছান কালবার্টসন। তারা তিনজন ‘এক্সপিডিশন ৩’ দলের অংশ ছিলেন, যা ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছে।
বর্তমানে এ ধারাবাহিকতা ‘এক্সপিডিশন ৭৫’-এ এসে পৌঁছেছে এবং ২০০০ সালের নভেম্বর থেকে আইএসএসে নিয়মিত বিরতিতে নভোচারী ক্রুদের উপস্থিতি কখনোই বন্ধ হয়নি।
এক্সপিডিশন ৩ ছিল কালবার্টসনের মহাকাশ যাত্রার তৃতীয় ও সর্বশেষ অভিযান। ২০০২ সালের অগাস্টে নাসা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বেসরকারি খাতে কাজ শুরু করেছেন।
এর অংশ হিসেবে তিনি অরবিটাল সায়েন্সেস কর্পোরেশনের মানব মহাকাশযান কর্মসূচি পরিচালনা করেন, যা আইএসএসের রসদ সরবরাহের জন্য ‘সিগনাস’ মহাকাশযান তৈরি করেছিল।
২০১৮ সালে অরবিটাল সায়েন্সেস কিনে নেওয়া অ্যারোস্পেস জায়ান্ট নরথ্রপ গ্রুম্যানের অধীনে সিগনাস আজও নিয়মিত চলাচল করছে।
বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সি কালবার্টসন ২০১৮ সালে নরথ্রপ গ্রাম্যান থেকে অবসর নিয়ে এখন অলাভজনক কোম্পানি ‘স্পেস ফাউন্ডেশন’-এর পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাসার ডেডিকেটেড ৯/১১ পেইজে কালবার্টসনের এ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
ওই পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে, হামলার পরপরই নাসা কীভাবে নিউ ইয়র্ক সিটির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জরুরি ব্যবস্থাপকদের সহায়তা করেছিল এবং বিভিন্ন সময়ে সংস্থাটি কীভাবে ৯/১১ এর ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে সম্মান জানিয়েছে।
২০০১ সালের ৫ ডিসেম্বর উৎক্ষেপিত স্পেস শাটল এন্ডেভরের এসটিএস-১০৮ মিশন প্রায় ৬ হাজার ছোট আমেরিকান পতাকা মহাকাশে নিয়ে গিয়েছিল।
এ বিষয়ে নাসা বলেছে, “হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে কর্মরত শিক্ষার্থীরা মহাকাশে ঘুরে আসা সেসব পতাকা দিয়ে স্মারক প্যাকেজ তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে দেওয়া হয়।”
নিউ ইয়র্কের ‘আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র রোজ সেন্টার ফর আর্থ অ্যান্ড স্পেসে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ২০০২ সালের ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা দিবসে এই বিতরণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল।
