সিত্রাংয়ের ছোবলে সাতক্ষীরার জীর্ণ বেড়িবাঁধ আরও নাজুক
এর মধ্যে শ্যামনগর বেড়িবাঁধের সাত পয়েন্টে এবং আশাশুনির বেড়িবাঁধের ১০ পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এমনিতেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরের বেড়িবাঁধগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল; ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর ছোবলের পর সেগুলোর অবস্থা আরও কাহিল হয়ে পড়েছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের হরিশখালী, নাপিতখালী এবং বড় গাবুরা এলাকার অন্তত সাতটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ধসে গেছে।
অপরদিকে আশাশুনি উপজেলার খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কমপক্ষে ১০টি পয়েন্ট নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং সোমবার উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এই ঝড়ে সাতক্ষীরায় বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও উপকূলীয় দুই উপজেলার বেড়িবাঁধের ক্ষতি হওয়ায় আতঙ্কে আছেন সেখানকার বাসিন্দারা। কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শ্যামনগর উপজেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ঘূর্ণিঝড়ের পর মঙ্গল ও বুধবার বাঁধের ধসে যাওয়া অংশ পরির্দশন করেছেন। এই অংশে দ্রুত কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
বুধবার সরজমিনে শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে হরিশখালী, নাপিতখালী এবং বড় গাবুরা বাঁধের ওপর দিয়ে ইট বিছানো সড়কের একটা অংশ খোলপেটুয়া নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী কৈখালী ইউনিয়নের নৈকাটি, বিজিবি ক্যাম্পসহ আদম আলীর বাড়ি সংলগ্ন অংশে প্রায় ২০০ মিটার বাঁধে ধস দেখা যায়। জোয়ারের পাশাপাশি ঢেউয়ের তীব্রতায় সোমবার বাঁধের এসব অংশ পাশের কালিন্দি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
শ্যামনগর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক সাঈদ-উজ জামান সাঈদ বলেন,বাঁধের অন্তত সাতটি অংশ নদীতে ধসে গেছে। পাউবো কর্মকর্তারা মঙ্গলবার ১৫ নম্বর পোল্ডারের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করে ধসে যাওয়া জায়গাগুলো চিহ্নিত করেন।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম মাসুদ বলেন, শ্যামনগরের কোথাও বাঁধ না ভাঙলেও গাবুরার সাতটি পয়েন্টে ধস নেমেছে। বড় গাবুরা, নাপিতখালী, জেলেখালী, নেবুবুনিয়া এলাকার ধস ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পাউবোর শ্যামনগর জোনের সেকশন অফিসার সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, গাবুরার চারপাশ ঘিরে থাকা বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার জায়গাজুড়ে (সাতটি পয়েন্টে) নদীতে ধসে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে বরাদ্দ চাওয়া হবে এবং খুব শিগগির কাজ শুরু হবে।
এদিকে ঝড়ের পরদিন সরেজমিনে চুইবাড়িয়া বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে এসেছেন আশাশুনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী।
তিনি জানান, উপজেলার খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কমপক্ষে ১০টি পয়েন্ট নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েকটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধের ভাঙন প্রবল আকার ধারণ করেছে।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাউনিয়ায় শ্রীপুর এলাকার বাঁধটি আগে থেকেই ভাঙছিল। সিত্রাংয়ের প্রভাবে কপোতাক্ষ নদের প্রবল স্রোতে ১০/১২ ফুট চওড়া বাঁধটি ভেঙে এখন মাত্র দেড় থেকে দুই ফুট অবশিষ্ট রয়েছে।
আশাশুনি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বাঁধটি ভেঙে গেলে প্রতাপনগর ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত ও মাছের ঘের প্লাবিত হতে পারে। এরই মধ্যে ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০০ মিটার দীর্ঘ কাজ মাত্র দুই মাস আগে যেনতেন উপায়ে সংস্কার করা হয়। সিত্রাংয়ের প্রভাবে প্রবল স্রোতে বাঁধটির ভাঙন প্রবল আকার ধারণ করেছে।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ গাজী বলেন, “সংস্কার না করায় বাঁধটি ভাঙতে ভাঙতে এখন মাত্র দেড় থেকে দুই ফুট রয়েছে। যেকোনো সময় নদের জোয়ারে বাঁধটি ভেঙে একাধিক গ্রাম তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।”
আশাশুনি উপজেলা যুবলীগের নেতা তোষিকে কাইফু জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আশাশুনির কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীর বিছট, কাকবাঁশিয়ার দুটি পয়েন্ট, খাজরা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে, মনিপুর, দক্ষিণ একশরা, রুইয়ের বিল, শ্রীপুর, হরিষখালী, থানাঘাটা, বলাবাড়িয়ার দুর্গাপুর স্কুলের সামনে, কাকড়াবুনিয়া স্লুইসগেট এবং বড়দল ইউনিয়নের কেয়ারগাতিতে বেড়িবাঁধ নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতক্ষীরা পাউবো-২-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর কবির সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল ইসলাম নামের একজন ঠিকাদার দুই মাস আগে শ্রীপুরের কাজটি করেছেন। কিন্তু কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ করেননি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।
“এর মধ্যে সিত্রাং এর প্রভাবে নদের স্রোতে বাঁধটির ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে বাঁধটির অবস্থা নাজুক। ঠিকাদারকে কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।”
সাতক্ষীরা পাউবো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, বেড়িবাঁধ কোথায় ভেঙে প্লাবিত হয়নি। তবে ষাটের দশকে নির্মিত বেড়িবাঁধ দুর্ঘটনা ঘটে গেলে রক্ষা করা কঠিন। তারপরও পাউবো তার প্রয়োজনীয় সামর্থ্য দিয়েই কাজ করে চলেছে।
