রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল রাখাইন কি এখন আর মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে? কার্যত নেই। তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আদতে কতটা কার্যকর হবে?
Published : 05 Apr 2025, 05:28 PM
মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের সুবিধার্থে বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধে মানবিক বিরতি দিয়েছে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তিন বাহিনীর জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স। ১ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তিতে জোটটি বলেছে এক মাস কোনো ‘অফেন্সিভ অপারেশন’ বা আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে যাবে না তারা, যাতে উদ্ধার কাজ নির্বিঘ্নে চালানো যায়। শুধু আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষায় ব্যবস্থা নেবে।
তবে গত ২২ মার্চ মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতির খবর অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যের সীমান্তবর্তী আয়ারওয়াদি অঞ্চলে আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের জান্তা সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের কারণে লেমিয়েথনা, ইয়েগি ও থাবাউং টাউনশিপে লড়াই শুরু হয়। জান্তা বাহিনী ১৮ মার্চ থেকে পাথেইন-মোনিওয়া এবং গওয়া-নগাথাইংচাং সড়কে বেসামরিক যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে সাধারণের যাতায়াত নিষিদ্ধ করে।
ইরাবতি আরো জানায়, আয়ারওয়াদি অঞ্চলের রাজধানী পাথেইন থেকে ২৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে থাকা থাবাউংয়ে জান্তা সেনারা গ্রামীণ ফাঁড়ি থেকে পিছু হটছে। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর, মিয়ানমারের জান্তা সরকার তথা এসএসি বা স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল তথা টাটমাডোর বিরুদ্ধে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অপারেশন ওয়ান জিরো টু সেভেন শুরু হওয়ার পর থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি এবং চীন রাজ্যের পালেতোয়া দখল করে।
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাস মূলত মংডু, বুথিডাং, রাথিডং ও চ্যাকফু টাউনশিপে। কিছু আছে সিত্তওয়েতেও। সিত্তওয়ে ছাড়া সবগুলোই আরাকার আর্মির দখলে। সিত্তওয়ে পুরোপুরি দখল না হলেও ঘিরে রেখেছে বাহিনীটি। এ বিষয়ে একবার আমাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাকান আর্মির মুখপাত্র থাইন তু খা বলেছিলেন, যেহেতু সিত্তওয়ে বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ আছে তাই সেসব যাতে ধ্বংস না হয় তাই কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন তারা। তবে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত প্রায় সবটাই আরাকান আর্মির দখলে।
এবার সাম্প্রতিক একটি খবর দেখা যাক। প্রধান উপদেষ্টার বিমসটেক সফরে বিভিন্ন অর্জনের মধ্যে অন্যতম বলে যে খবরটি বিবেচিত হচ্ছে তা হলো, মিয়ানমার জানিয়েছে তালিকাভুক্ত ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার যোগ্য বলে নিশ্চিত করেছে দেশটি। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি খলিলুর রহমানকে এ কথা বলেছেন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ইউ থান শিউ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার বৈঠক করেন তারা। শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক পেজের এক পোস্টে এ তথ্য পরিবেশিত হয়। এই প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের জান্তা সরকারের তরফে এ ধরনের তথ্য জানানো হলো।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালে ছয় ধাপে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের তালিকা দিয়েছিলে বাংলাদেশ। সেখান থেকেই ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শনাক্ত করেছে নেপিদো। আরো ৭০ হাজার রোহিঙ্গার নাম ও ছবি চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে আছে। এর বাইরে আরও সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই জরুরি ভিত্তিতে করবে বলেও আশ্বস্ত করেছে জান্তা সরকার। মিয়ানমারের নতুন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথে অগ্রগতি বলে মানছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল রাখাইন কি এখন আর মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে? কার্যত নেই। তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আদতে কতটা কার্যকর হবে সে নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয়।
আরাকান আর্মিকে এড়িয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি সম্ভব? প্রত্যাবাসনের এই আলোচনায় কি আরাকান আর্মিকে যুক্ত করা হয়েছে? করলে কে করবে ঢাকা নাকি নেপিদো? মনে করা যেতে পারে সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরে গিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, সেখানে তিনি সংকট সমাধানের জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকাকে। এমনকি মানবিক করিডোরের পরামর্শও দিয়েছেন। ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিত্য প্রয়োজনী দ্রব্য সরবরাহে এমন মানবিক করিডোরের প্রয়োজনীয়তা বিমসেটক সামিটে পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টাও। কিন্তু রাখাইনের সঙ্গে এমন করিডোরে বাংলাদেশের কাউন্টার পার্ট কে হবে? রাখাইনের দখলে থাকা আরাকান আর্মি নাকি নেপিদোর ক্ষমতায় থাকা জান্তা সরকার? স্টেট অ্যাক্টর হয়ে, মিয়ানমারের নন স্টেট অ্যক্টর আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশ ঠিক কি প্রক্রিয়ায় আলোচনা শুরু করবে? এমন আলোচনা বছর দুয়েক ধরে হলেও প্রকাশ্য কোনো অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। রোহিঙ্গাদের প্রতি রাখাইনের দখলে থাকা আরাকান আর্মির দৃষ্টিভঙ্গিও অবশ্য বিবেচ্য। ২০২২ সালে আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তোয়াই ম্রা নাইং আমাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক বলেই মানেন। ধর্ম নয় জন্মস্থানই তাদের কাছে বিবেচ্য। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, ২০২৩ সালে অপারেশন ওয়ান জিরো টু সেভেন শুরুর পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির খানিক পরিবর্তন হয়েছে। এখন তারা বরং ‘রোহিঙ্গা’ শব্দেই আপত্তি জানায়। সেক্ষেত্রে আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসাবে উল্লেখ করতে স্বচ্ছন্দ তারা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার সেনাবাহনীর দ্বারা নির্যাতিত হলেও, বছরখানেক আগে থেকে তাদের একটা অংশ আরাকান আর্মির বিপক্ষে গিয়ে টাটমাডোর পক্ষে যুদ্ধ করছে বলে দাবি করে তারা। এমনকি এতে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা, আরএসওর অংশগ্রহণ নিয়েও সন্দেহ আছে তাদের। ঠিক এ কারণেই সম্ভবত রোহিঙ্গাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বা অবস্থান বদলেছে আরাকান আর্মি।
এখন প্রশ্ন হলো, মিয়ানমার সরকার কর্তৃক এই ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার সংবাদটি সুসংবাদে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া কি হবে? হতে পারে আরাকান আর্মি হটিয়ে রাখাইনের দখল পুনপ্রতিষ্ঠা করবে জান্তা সরকার। আর সে সম্ভাবনা আশু না থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরাকান আর্মিকে এড়ানোর সুযোগ আছে কি? এই মালা গাঁথবে কে? বাংলাদেশ-মিয়ানমার, নাকি রাখাইন-ঢাকা? নাকি স্বাধীন রাখাইনের জন্য অপেক্ষা? যুদ্ধ না থামলেতো প্রত্যাবাসন সুদূর পরাহত। কারণ প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছা ও নিরাপদ। তবে বিশ্বাস করতে চাই এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারের কাছে আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের নিজ ভূমিতে আগামী ঈদ উদযাপন সম্ভব করার আশ্বাসে প্রধার উপদেষ্টার যে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ তাতেই হয়তো ভরসা রাখছেন নির্যাতিত নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী।