লালমনিরহাটে একই আঙিনায় আজান ও উলুধ্বনি, শতবর্ষের সম্প্রীতির বন্ধন
মসজিদের খতিব বলেন, সম্প্রীতির এই চর্চা কোনো বাহ্যিক প্রদর্শনী নয়, এটি অন্তরের শ্রদ্ধা।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট। লালমনিরহাট পৌর শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী মন্দির প্রাঙ্গণে তখন শারদীয় দুর্গোৎসবের ব্যস্ততা। কাঁসরের শব্দ, উলুধ্বনি আর ঢাকের তালে জমে উঠেছে পূজামণ্ডপ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ধূপকাঠি ও কর্পূরের সুবাস।
হঠাৎই ঘড়ির কাঁটা ৫টা ৩৫ স্পর্শ করতেই থেমে গেল সব। ঢাকের কাঠি থমকে দাঁড়াল কাঁসরে, বন্ধ হলো মাইক। কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ নয়, শতবর্ষের অলিখিত নিয়মে মণ্ডপে নেমে এল এক স্নিগ্ধ নীরবতা।
ঠিক দুই মিনিট পর, ৫টা ৩৭ মিনিটে একই উঠানের অন্য কোণ থেকে ভেসে এলো পুরান বাজার জামে মসজিদের মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আসরের আজান- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’। বাতাসে ধূপের সুবাসের সঙ্গে মিশে গেল আতরের ঘ্রাণ।
আজানের পর মসজিদে শুরু হয় নামাজ। আর ঠিক চারপাশের এই নীরবতাকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীরা অপেক্ষা করলেন নীরবে। ৫টা ৫০ মিনিটে নামাজ ও মোনাজাত শেষ হতেই আবার স্বকীয় ছন্দে ফিরে পেল মন্দির; পুনরায় বেজে উঠল ঢাক, কাঁসর ও উলুধ্বনি।
লালমনিরহাটের পুরান বাজার এলাকার এই উঠানটি কেবল দুটি উপাসনালয়ের যৌথ ঠিকানা নয়- এটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানবিক বোধ ও শ্রদ্ধার এক নিখুঁত টাইম-টেবিল।
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় এভাবেই থমকে যায় মন্দিরের সব শব্দযন্ত্র। আজানের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে সালাতের প্রথম জামায়াত শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাক-ঢোল, সাউন্ড সিস্টেম ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়।
“এটি আমাদের কাছে কোনো চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম নয় বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেখে আসা এক সহজাত অভ্যাস,” বলে মনে করেন কালীবাড়ী মন্দিরের সভাপতি ও প্রধান পুরোহিত শংকর চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, “প্রতিটি উৎসবের আগে তা দুর্গোৎসবেই হোক কিংবা ইদে- মসজিদ ও মন্দির পরিচালনা কমিটি এক টেবিলে বসে। ঘড়ির সময় ধরে আজান ও সালাতের সময়সূচির তালিকা আমাদের হাতে চলে আসে।
“সেই অনুযায়ী আমরা পূজার অঞ্জলি, আরতি ও সাউন্ড সিস্টেমের সময় সাজিয়ে নিই। জন্মের পর থেকে এই উঠানে সামান্য বিশৃঙ্খলাও দেখিনি।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৮৩৬ সালে এই প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয় কালীবাড়ী মন্দির। পরবর্তীতে এলাকাটি কেন্দ্র করে বাজার গড়ে উঠলে, সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে আসা একদল মানুষ ১৯২৫ সালে মন্দিরের এক কোণে একটি নামাজ ঘর নির্মাণ করেন। কালক্রমে সেই ঘরটিই আজকের ঐতিহ্যবাহী ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’।
সময়ের ব্যবধানে প্রাঙ্গণটি ছোট হলেও দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মনের পরিধি বেড়েছে বহুগুণ। কেবল স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, এই মেলবন্ধন দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা।
অতীতে বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদেশি কূটনীতিকরাও এই উঠানে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন সম্প্রীতির এই অনন্য দৃষ্টান্ত।
পুরান বাজার জামে মসজিদের খতিব মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের মতে, সম্প্রীতির এই চর্চা কোনো বাহ্যিক প্রদর্শনী নয়, এটি অন্তরের শ্রদ্ধা।
তিনি বলেন, “মসজিদের আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু আমরা কখনো একে অপরের পাল্টাপাল্টি ভাবিনি। নামাজের সময় তারা যেমন ঢাক-ঢোল বন্ধ রেখে আমাদের সালাত আদায়ে সুযোগ করে দেন, আমরাও তেমনি তাদের উৎসবের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকি, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। এটিই তো আসল ইসলাম এবং এটিই মানবতা।”
ঘটনাটি কেবল ধর্মীয় রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও গড়ে তুলেছে এক অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। পূজা কিংবা ঈদে উভয় ধর্মের তরুণরা মিলেমিশে দায়িত্ব পালন করেন উঠানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায়।
দর্শনার্থী জগদীশ চন্দ্র বলেন, এটি একটি উদাহরণ। এখানেই ঘড়ির কাটা ধরেই সব কিছুই চলে।
লালমনিরহাটের এই চিত্রকে আত্মপরিচয় হিসেবে দেখেন জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান। তিনি বলেন, “লালমনিরহাটের মানুষ সবসময় সহাবস্থানে বিশ্বাসী। ঘড়ির কাঁটা মেপে একই উঠানে আজান ও আরতির এই সুশৃঙ্খল আদান-প্রদান, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বে শান্তির এক বিরল ও অনন্য বার্তা পাঠায়।”
একই উঠানে জ্বলতে থাকা প্রদীপ আর মিনারের সুর আজ আর আলাদা কিছু নয়; এ অঞ্চলের মানুষের কাছে তা এক সুতোয় গাঁথা অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
