নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে খাল ও রেলের ডোবা ভরাট

এর কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, তিনি কাউন্সিলরের লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Nov 2023, 03:28 AM
Updated : 25 Nov 2023, 03:28 AM

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাগপাড়া এলাকায় খেলার মাঠ বানানোর কথা বলে সরকারি খাল ও রেলওয়ের ডোবা ভরাট করা হয়েছে একজন কাউন্সিলরের নেতৃত্বে।  

১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইফতেখার আলম খোকনের তত্ত্বাবধানে দুই সপ্তাহ আগে রাতের আঁধারে বালু ফেলে স্থান দুটি ভরাট করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠ বানানোর কথা বলা হলেও আসল উদ্দেশ্য জমি দখল।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর খোকনের ভাষ্য, স্থানীয় তরুণ-যুবকদের অনুরোধে তিনি বালু ভরাট করার অনুমতি দিয়েছেন, আর খালের মুখ যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য ড্রেন করার কথা বলেছেন।

তবে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, এর কোনো ‘যৌক্তিকতা নেই’। কাউন্সিলরের কাছে তিনি এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগপাড়া এলাকায় ভাষাসৈনিক নাগিনা জোহা সড়কের পাশে খালটির পাশাপাশি রেলওয়ের জমিতে থাকা একটি ডোবাও বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। সেখানে সাঁটানো হয়েছে একটি সাইনবোর্ড, তাতে লেখা ‘এটি শহীদ মুজিবর স্পোর্টিং ক্লাব অ্যান্ড একাডেমীর উদ্যোগে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মাঠের জন্য নির্ধারিত স্থান’।

শত বছর পুরোনো খালটি পূর্ব দিক দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত। এ খালের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে আশপাশের তিনটি ওয়ার্ডের হাজারো বাসিন্দা বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার শিকার হবেন।

খালটির পাশেই তাসলিমা বেগমের বাড়ি। তিনি বলেন, “শুরুতে খাল ও ডোবার জায়গা দখলে নেওয়ার জন্য ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। দুই সপ্তাহ আগে রাতের আঁধারে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। রাস্তা করার সময় যে খাল রক্ষার জন্য ব্রিজ করা হল, সেই খাল খেলার মাঠের নাম করে ভরাট করা হইছে।”

এ অবস্থায় আসন্ন বর্ষায় তাদের বাড়িসহ আশপাশের লোকজন জলাবদ্ধতায় ভুগবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই নারী।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে জায়গাটুকু ভরাট করা হয়েছে, সেখানে খেলার মাঠ করার কোনো সুযোগ নেই। মাঠের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এটি নয়। মূলত মাঠের নামে খাল ও রেলের জমিটুকু দখল করাই কাউন্সিলরের উদ্দেশ্য।

এদিকে খালটি ভরাটের খবর পেয়ে জরিপকারক কালাম মোল্লার নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

যোগাযোগ করা হলে কালাম মোল্লা বলেন, “গোদনাইল মৌজায় খালটি সরকারি হিসেবে তালিকাভুক্ত। খালের জমির পাশাপাশি রেলওয়ের জমিতে থাকা ডোবাটিও বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলর ইফতেখার আলম খোকনের নেতৃত্বে এই বালু ভরাটের কাজ করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের মাধ্যমে আমরা জেনেছি। বিষয়টি সিটি মেয়রকে জানানো হয়েছে।”

যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার কামরুল ইসলাম বলেন, “ওই জায়গায় রেলওয়ের পুরোনো লাইন আছে। রেললাইনের আশপাশের জমিও রেলওয়ের। তবে সেখানে আমাদের কোনো জমি ভরাট করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমরা অবগত নই। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

১০ নম্বরের পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুহুল আমিন বলেন, “যে মাটি ভরাট করা হয়েছে সেটি পশ্চিম দিকে ডিএনডি খাল এবং পূর্ব দিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মেলে। খালটির প্রবাহ বন্ধ হলে আমার এলাকার মানুষজন জলাবদ্ধতার শিকার হবেন। খালটি পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য সিটি করপোরেশন একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। এমন সময় খালটি ভরাটের কাজটি ভালো হয়নি।”

অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইফতেখার আলম খোকন বলেন, স্থানীয় তরুণ-যুবকরা একটি খেলার মাঠ ও স্পোর্টিং ক্লাব প্রতিষ্ঠার জন্য তার কাছে গেলে তিনি ওই জায়গায় বালু ভরাট করার অনুমতি দেন। কাজটি এলাকাবাসীর ‘ভালোর জন্যই’ করেছেন।

“আমি তাদের বলেছি, খালের মুখ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। তারা খালটির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য একটি ড্রেন করবে বলেছিল। যেহেতু এলাকাবাসী এটা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন, তাই আমি তাদের কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি।”

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, “সিটি করপোরেশন বিভিন্ন ওয়ার্ডে বেশ কয়েকটি মাঠ ও পার্ক নির্মাণ করেছে। একইসঙ্গে খাল ও জলাশয় রক্ষায় কাজ করছেন তারা।”

“কিন্তু খাল ভরাট করে খেলার মাঠ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা অপরাধ। এই বিষয়ে স্থানীয় কাউন্সিলরের অবস্থান লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে।”