নীলফামারীতে স্ত্রী-সন্তান হত্যা: দুর্দশাই কারণ?

সকালে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে আশিকুরকে পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যান প্রতিবেশী এক নারী।

নীলফামারী প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Feb 2024, 04:54 PM
Updated : 2 Feb 2024, 04:54 PM

নীলফামারীতে স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে হত্যার পর ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা চেষ্টার কারণ বুঝে উঠতে পারছেন না স্বজনরা।

তবে গলায় ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আশিকুর রহমান বাবু মোল্লার চাচাতো ভাই বলছেন, কিডনি রোগে আক্রান্ত আশিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আর্থিকভাবে দুদর্শায় ছিলেন।

স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সদর উপজেলার চড়াইখোলা ইউনিয়নের দারোয়ানী পুরাতন বন্দর বাজার গ্রামে আশিকুরের শয়নঘরের বিছানা থেকে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে নীলফামারীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম জানান।

চড়াইখোলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ মোল্লার ছেলে আশিকুর রহমান স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দারোয়ানী পুরাতন বন্দর বাজার গ্রামের নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন।

সকালে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে আশিকুরকে পড়ে থাকতে দেখে প্রথমে এগিয়ে যান প্রতিবেশী গৃহবধূ বিউটি বেগম (৩২)।

এসময় তাকে গলাকাটা অবস্থায় পেয়ে বিউটির চিৎকারে অন্য প্রতিবেশীসহ বাজারের লোকজন ছুটে আসেন।

বিউটির দাবি, বাড়ির ভেতরে গিয়ে আশিকুরের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে বিছানায় মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।

পরে তারা আশিকুরকে উদ্ধার করে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে গলাকেটে আত্মহত্যার চেষ্টা চালানোর প্রাথমিক ধারণা করলেও পুলিশ বলছে, লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না।

বিউটি বেগম বলেন, “আশিকুর ভাইদের বাড়ি পার হয়ে সকালে কাপড় শুকাতে দিতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে দেখি, আশিকুর ভাই বাড়ির দরজার সমানে পড়ে গোঙ্গাচ্ছেন। আমি দৌড়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভাবি ও তার বাচ্চাদের ডাকাডাকি করি। কিন্তু তাদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে রক্ত দেখতে পাই। এরপর দেখি, আশিকুর ভাইয়ের গলা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। এসময় আমি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন।”

আশিকুরের ছোট বোন সাথি আক্তার (২৭) বলেন, “ভাইয়া ছয় মাস ধরে কিডনিজনতি রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ ছিলেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে আমি প্রতি সপ্তাহে এসে ভাইয়ার খোঁজ-খবর নিয়ে যেতাম। গতকাল বৃহস্পতিবার ভাবির সাথে আমার কথা হয়েছিল, ভাবি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কখন আসব? আমি ভাবিকে বলেছিলাম, শুক্রবার সকালে যাব। ফোনে এই বলে কথা শেষ করি।

“আজ (শুক্রবার) সকালে মোবাইল ফোনে খবর পাই, ভাবি ও আমার দুই ভাতিজি আর বেঁচে নেই, ভাইয়াকে গলাকাটা অবস্থায় রংপুরে নেওয়া হয়েছে।”

সাথি আক্তার আরও বলেন, “এরপর এখানে এসে লোকজনের কাছে শুনি, ভাবি ও তার দুই মেয়েকে হত্যা করে গলাকেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ভাইয়া। কী কারণে এমন ঘটনা ঘটাল, তার কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না।”

আশিকুরের চাচাতো ভাই জাকির হোসেন মোল্লা বলেন, “সকালে আমাকে একজন ফোন দিয়ে জানান, আশিকুর ভাই অসুস্থ। খবর পেয়ে সাথে সাথে আমি চলে আসি। এসে দেখি, ভাইকে ভ্যানে উঠানো হচ্ছে। এসময় তার গলা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। আমাদের আরেক চাচাতো ভাইকে সাথে দিয়ে তাকে দ্রুত নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে রংপুরে পাঠানো হয়। ভাবি ও তাদের দুই মেয়েকে ঘরের বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।”

তিনি আরো বলেন, “আশিকুর ভাই স’মিলের ব্যবসার পাশাপাশি রসুন, পাট, তামাক মজুতের ব্যবসা করতেন। এবার তিনি ব্যবসায় প্রচুর টাকা লস খেয়েছেন। ব্যবসায় আর্থিক লসের পাশাপাশি ব্যাংকে ঋণ ছিল তার। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ দিন থেকে কিডনি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের পাশাপাশি অসুস্থতার কারণে তিনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিলেন।

“আমরা পরিবারের সদস্যরা তাকে নিশ্চিত করেছিলাম যে, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই তার জন্য অর্থের সংস্থান করে সকল সমস্যার সমাধান করব। এরই মধ্যে এমন অঘটন ঘটে।”

নিহত তহুরা বেগমের বাবা আব্দুল আলীম বলেন, “গতকাল এশার নামাজের পর মেয়ের সাথে আমার ফোনে কথা হয়। জামাই আগের থেকে একটু সুস্থ, নাতনিরাও ভালো আছে বলে জানিয়েছিল আমার মেয়ে। এরপর আজ সকালে ফোনে খবর পাই, আমার মেয়ে তহুরা এবং তাদের দুই মেয়েকে মেরে নিজের গলাকেটে মরার চেষ্টা করেছে আশিকুর।”

নীলফামারী সদর থানার পরির্দশক (ওসি) মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে আমরা মরদেহ তিনটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছি। কীভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে, সেটি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বলা যাবে।”

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ও সিআইডি কাজ করছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ওসি তানভিরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন...

Also Read: নীলফামারীতে স্ত্রী ও ২ মেয়েকে ‘শ্বাসরোধে হত্যার পর আত্মহত্যা’র চেষ্টা