পাঠকাঠিতে আশার আলো দেখছে ফরিদপুরের কৃষকরা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে ৮৭ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর থেকে যে পরিমাণ কাঠি পাওয়া যাবে, তার বাজারমূল্য ১৩০ কোটি টাকার বেশি।

ফরিদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Sept 2022, 07:30 AM
Updated : 15 Sept 2022, 07:30 AM

সোনালি আঁশ পাটের জন্য বিখ্যাত ফরিদপুর জেলা। গুণে ও মানে দেশসেরা এ জেলার পাটের আগে দুর্দিন গিয়ে সুদিন ফিরেছে। কারণ বিশ্ববাজারে পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। ফলে সোনালি আঁশের ‘রুপালি’ কাঠিতে আশার আলো দেখছে এই জেলার কৃষকেরা।

আগে আঁশ ছাড়িয়ে নেওয়ার পর অবহেলায় পড়ে থাকতো পাটকাঠি; শুধু রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজের ছাউনি তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাটকাঠি পুড়িয়ে পাওয়া কার্বন থেকে আতশবাজি, কার্বন পেপার, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি ও দাঁত পরিষ্কারের ওষুধসহ নানা পণ্য তৈরি করা হয়। বিশ্ববাজারে পাটকাঠির কদর বাড়ার ফলে জেলার চাষিদের কাছেও এর কদর বেড়েছে।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিয়াউল হক জানান, চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় ৮৭ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর থেকে যে পরিমাণ কাঠি পাওয়া যাবে, তার বাজারমূল্য ১৩০ কোটি টাকার বেশি।

সঠিক সময়ে বৃষ্টি আর বর্ষার পানির অভাবে এবার পাট জাগ দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে ফরিদপুরের চাষিদের। পানির অভাবে ক্ষেতেই অনেক পাট শুকিয়ে মরে গেছে। এমন পরিস্থিতে কৃষকরা মাটি খুঁড়ে পাট জাগ দিতে বাধ্য হন। এতে নষ্ট হয়ে গেছে পাটের রঙ; যার প্রভাব পড়েছে দামে।

তাছাড়া অন্য যে কোনো মৌসুমের চেয়ে এবারের পাটের উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। তাই আঁশের লোকসান পুষিয়ে নিতে পাটকাঠি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের কাছে।

জিয়াউর বলেন, “ফরিদপুরে ১ হেক্টর জমিতে চাষি দর উৎপাদিত পাট থেকে ১৫ হাজার টাকার কাঠি বের হচ্ছে। চাষিরা পাট বিক্রয় করে বেশ ক্ষতি মুখে পড়েছে। আশা করছি, এই কাঠিতে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তারা।”

ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারীসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে-এখন চাষিরা পাট ও পাটকাঠি শুকিয়ে ঘরে তুলতে ব্যস্ত। বেশ যত্নের সঙ্গে পাটকাঠিমজুত ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তারা। জেলার বিভিন্ন বাড়িতে, রাস্তা, পাকা সড়ক, মাঠ-ঘাটে সব জায়গাই চোখে পড়ে পাটকাঠি।

ফরিদপুরের নয়টি উপজেলার মধ্যে সালথা উপজেলাকে পাটের রাজধানী বলা হয়। এছাড়াও আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, মধুখালী, নগরকান্দা ও ভাঙ্গাতেও পাট আবাদ হয়ে থাকে।

সালথার গোট্টি ইউনিয়নের পাট চাষি ফিরোজ মোল্লা বলেন, “এতোকাল রান্নার জ্বালানি হিসেবে, বাড়িঘর ও সবজি ক্ষেতের বেড়া, মাচা, পান বরজ তৈরিতে ব্যবহার হওয়া পাটকাঠি এখন আমাদের আশার আলো দেখছে।”

চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে এই রুপালি কাঠি থেকে আয় হচ্ছে বেশ। বড় বড় কোম্পানির এজেন্ট এসে গ্রাম থেকে এসব কাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছে।”

সিরাজ প্রামাণিক নামের আরেক চাষি বলেন, “বর্তমানে আমরা পাটকাঠির ১০০ আঁটি মূল্য পাচ্ছি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। যা গত বছরের ছিলো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। যেহেতু পাটের ভাল দর পাইনি, এ কারণে প্রতি আঁটিতে এক হাজার টাকা পেলে আমরা বেশি উপকৃত হতাম।”

বোয়ালমারীর লংকারচার গ্রামের পাটকাঠি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন শেখ জানান, এই মৌসুমে তিনি দেড় থেকে দুই কোটি টাকার পাটকাঠি কিনেছেন। তারপর এসব কাঠি বিভিন্ন পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কারখানায় বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, “আমার মতো অনেক ব্যবসায়ী এখন পাটকাঠি কিনছে।”

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, “চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠি পুড়িয়ে পাওয়া কার্বন থেকে আতশবাজি, কার্বন পেপার, প্রিন্টার ও ফটোকপির কালি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি, দাঁত পরিস্কারের ওষুধ ও সারসহ নানা পণ্য তৈরি করা হয়। এমনকি পার্টিকেল বোর্ড তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে সোনালি আঁশের রুপালি কাঠি। এ কারণে দেশে দেশে বাড়ছে চাহিদা। দামও মিলছে বেশ।”

ফরিদপুর চেম্বার অব কর্মাসের প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম বলেন, “চাষিদের রক্ষা করতে হলে পাট কাঠিতে দর দিতে হবে। যে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান পাটকাঠির ব্যবহার করে তাদের আরও আন্তরিক হয়ে চাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই এ জেলার পাট চাষিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক