Published : 09 Feb 2023, 02:20 PM
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্রের দুর্গম চরের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নতুন করে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে চর ভগবতীপুর উচ্চ বিদ্যালয়।
এ বছরেই প্রথম শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে বিদ্যালয়টি। মাত্র একমাসেই এ বিদ্যালয়ে পাঠদানের কথা ছড়িয়েছে আশেপাশের বিভিন্ন চরে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। স্কুলটির মাত্র চারটি শ্রেণীকক্ষে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী ক্লাশ করছে।
প্রত্যন্ত এ চরে এর আগে কোন উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিকের পরই ঝরে পড়তো শিক্ষার্থীরা। মেয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের বাল্য বিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এই হাইস্কুল চালু হওয়ার পর শিক্ষাগ্রহণে নতুন দিশা পেয়েছে তারা।
স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরুছেন তারা। ধাপে ধাপে তা দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
চর ভগবতীপুর উচ্চ বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখর হয়ে আছে। স্কুলের মাঠ থেকেই ব্রহ্মপুত্রের ওপারে ভারতীয় সীমান্ত চোখে পড়ে। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের লাল রঙের চমৎকার দৃষ্টিনন্দন স্কুলটির চারটি শ্রেণীকক্ষে পাঠদান চলছে।
চর ভগবতীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী কহিনুর বলেন, “প্রাইমারি পাশ করার পর দূরের হাইস্কুলে পড়তে যেতে হতো। এমনিই আমরা গরিব মানুষ, আর এখান থেকে শহর যাওয়াটাও সমস্যা ছিলো। এই হাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা না হলে হয়তো লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেত।”
একই ক্লাসের আতিক ও আয়েশা আক্তার জানায়, এই স্কুল প্রতিষ্ঠার কারণে আবার তারা লেখাপড়া শুরু করতে পেরেছে।
সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রবিউল, খুশি, জিমা জানায়, তারা ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে যাত্রাপুর ও নুনখাওয়া এলাকার স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো। কিন্তু নদীপথ ও দূরত্বের কারণে ঠিকমত ক্লাশ করতে পারেনি। এখন বাড়ির কাছে স্কুল হওয়ায় নিয়মিত ক্লাশ করতে পারছে তারা।
একই কথা জানায় অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রুমি, রোজিনা ও বিপাশা আক্তার।
স্কুলটির শিক্ষক সেলিনা পারভীন মুক্তি বলেন, “এ বছরে শুধু ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু করেছি আমরা। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার জন্য আসছে।”
তবে মাত্র চারটি শ্রেণী কক্ষে পাঠদানের জায়গা সংকুলান করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে শিক্ষক ফারুক আহমেদ, আমির হোসেন ও রাজু আহমেদ জানালেন।
চর ভগবতীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ইউসুফ আলমগীর জানান, ষোল নদ-নদী বেষ্টিত কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চ বিদ্যালয় নেই। ফলে প্রাথমিক পাশ করলেও নদী পাড়ি দিয়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালানো অনেক শিশুর পক্ষে সম্ভব হয় না।
“আর এ কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার পাশাপাশি মেয়ে শিশুরা বাল্য বিয়ের শিকার হয়। এমন বাস্তবতায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই উচ্চ বিদ্যালয়টি আমরা গড়ে তুলেছি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথম বর্ষেই জায়গা সংকুলান করতে পারছি না। প্রত্যাশা করছি, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি কিংবা ব্যক্তিগত সহায়তা পেলে আমরা বিদ্যালয়ের পরিসর বৃদ্ধি করতে পারবো।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলাম জানান, প্রথম বছরে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়েছে। যেখানে প্রায় দেড় শত শিক্ষার্থী পাঠদান করছে।
“আশা করছি আগামী বছর থেকে নবম শ্রেণী অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করবে।”
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সরকারি আর্থিক সহায়তায় বিদ্যালয়টির মাত্র চারটি রুমের একটি চরউপযোগী টিনসেড ভবন আমরা নির্মাণ করেছি। সেই সঙ্গে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানী এবং বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য একটি আর্থিক তহবিল গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সেখানে স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, কুড়িগ্রাম পৌরসভার মেয়রসহ স্থানীয় অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
তিনি বলেন, “সকলের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে স্কুলটি আরও বিকশিত হবে। সেই সঙ্গে চরের মেয়ে শিশুরা বাল্য বিয়ের হাত থেকে মুক্ত হবে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।“