মানিকগঞ্জে ‘হাজারি গুড়ের’ জন্য রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

বাংলাদেশে এক নামে পরিচিত হাজারি গুড় তৈরি হয় হরিরামপুর উপজেলায়।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Nov 2022, 08:10 AM
Updated : 21 Nov 2022, 08:10 AM

শীতকাল এলেই গ্রামীণ জনপদে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে। আর এ পিঠার মূল উপাদান গুড় তৈরি হয় খেজুর গাছের রস দিয়ে। তাই সারা বছর অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছের কদর এ সময় বেড়ে যায়।

সোমবার সকালে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছগুলোকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। বাংলাদেশে এক নামে পরিচিত হাজারি গুড় হরিরামপুর উপজেলায় তৈরি হয়ে থাকে।

তবে জেলায় আগের চেয়ে খেজুর গাছ আর গুড়ের কদর অনেক কমে গেছে বলে গাছিরা জানালেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু মো. এনায়েত উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। হাজারি গুড়সহ খেজুর গাছ টিকিয়ে রাখতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।

“জেলায় এবার এক লাখ গাছ খেজুর রস সংগ্রের উপযোগী। আর হাজারি গুড় তৈরির জন্য হরিরামপুর ও আশপাশে পাঁচ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।”

সকালে হরিরামপুর উপজেলার বয়ড়া ইউনিয়নের যাত্রাপুর, চালা ইউনিয়নের আগ্রাইল ও পশ্চিম খলিলপুর এলাকায় খেজুর গাছের ছাল পরিষ্কার করে তাতে মাটির হাড়ি বেঁধে দিতে দেখা গেলো গাছি বিল্লাল মিয়াকে। তার সঙ্গে আরও দুজন সহযোগী রয়েছে। তারাও গাছে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বিল্লাল মিয়া বলেন, “রাজশাহী থেকে এসে কয়েক বছর ধরে খেজুরের গুড় তৈরি করছি। অনেক পরিশ্রম, এজন্য এ পেশায় কেউ থাকতে চায়না। ভোরের আজানের পর পরই গাছ থেকে রসের হাড়ি পারার কাজ শুরু হয়। আবার দুপুর থেকে গাছ কাটতে যেতে হয়।

“আমরা ভেজাল মুক্ত পাটালি ও ঝোলা গুড় তৈরি করি। গত বছর ছয়শ করে বিক্রি করছি। এবার আর একটু বেশি বিক্রি করতে হবে।”

হরিরামপুরের চালা ইউনিয়নের সাকুচিয়া গ্রামের মো. আলাল বলেন, “আগে আমাদের কদর ছিল বেশ; মৌসুম শুরুর আগ থেকেই কথাবার্তা পাকা হতো কার কয়টি খেজুর গাছ কাটতে হবে। এখন আগের মতো তেমন খেজুর গাছ এখন নেই। আগে সকাল বেলা খেজুরের রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতাম। আয়ও বেশি হতো। এখন গাছ কম, গুড়ও কম হয়।“

হাজারি গুড় তৈরি করেন ঝিটকা উজানপাড়া গ্রামের গাছি করিম মোল্লা। তিনি বলেন, "বাড়ির গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি শীত মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করি। হাজাড়ি গুড়ের চাহিদা অনেক বেশি। আমার নিজের গাছ কম। অন্যদের গাছ ৫০০ টাকা করে কিনে নিয়ে কাটি।”

৪০ বছর ধরে গুড় তৈরির কাজ করেন ঝিটকা মধ্যপাড়া গ্রামের গাছি আলম। শীতের শুরুতে এখন লাল গুড় তৈরি হচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ দিন পর হাজারি গুড় পাওয়া যাবে বলেন জানান তিনি।

ঘিওর উপজেলার মোসলেম গাছি বলেন, “অল্প কিছু গাছ কিনে গুড় তৈরি করি। মেলা কষ্টের কাম।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল গফ্ফার বলেন, “হরিরামপুরের ঝিটকার আশপাশে হাজারি গুড় তৈরি হয়। দিন দিন সারা দেশের মতো হরিরামপুরেও খেজুর গাছ কমে গেছে । উদ্যোগে নিয়ে বেশি বেশি খেঁজুর গাছ রোপণ করা জরুরি।”

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, “হরিরামপুরের ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড় মানিজগঞ্জ জেলার ব্র্যান্ড। চাহিদা বেশি বলে কিছু অসাধু গাছিরা ভেজাল গুড় তৈরি করছে; যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

প্রতিবছরই ভেজাল রোধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ বছরও ভেজালরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক