১০ বছর আগেই আইবিডি’র ঝুঁকি জানাবে এই পরীক্ষা: গবেষণা
বিশ্বজুড়ে ৩৮ লাখ মানুষ পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহজনিত রোগ আইবিডিতে ভুগছেন। এতে রোগীদের তীব্র পেট ব্যথা, ডায়রিয়া ও অবসাদ তৈরি হয়।
মানুষের রক্তের অ্যান্টিবডির ধরন পর্যবেক্ষণ করে রোগ শনাক্ত হওয়ার এক দশক আগেই ‘ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ’ বা আইবিডি’র লক্ষণ ও উপস্থিতি পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
এ গবেষণার ফলে প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির উপস্থিতি চিহ্নিত করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
আইবিডির প্রধান দুটি রূপ ‘ক্রোনস ডিজিজ’ ও ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’। পরিপাকতন্ত্রে ক্ষতি ও উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরই রোগীদের চিকিৎসা শুরু হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, রোগ শনাক্তকরণের ১০ বছর আগেই মানব দেহের ইমিউন সিস্টেম বিশেষ সতর্কতা সংকেত পাঠাতে শুরু করে। এ গবেষণা রোগটির আগাম শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধেরও পথ খুলে দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের ‘ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার গ্রনিংগেন’ ও নিউ ইয়র্কের ‘আইকান স্কুল অফ মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাই’র ড. আরনো বুরগোনজে বলেছেন, “দীর্ঘদিন ধরে পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরই কেবল আমরা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজের চিকিৎসা দিতে পেরেছি, যা বহু রোগীর ক্ষেত্রেই অনেক দেরি হয়ে যায়।
“আমরা দেখেছি, উপসর্গ দেখা দেওয়ার বহু বছর আগেই এই রোগের সূচনা হয় ও ইমিউন সিস্টেম রোগ শনাক্তের আগেই সতর্কবার্তা দিতে পারে। তবে এটা এখনও এমন কোনো চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়, যা স্পষ্ট করে বলে দেবে যে, কেউ নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হতে যাচ্ছেন।
“তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা ও ভবিষ্যতে তা ঠেকানোর ক্ষেত্রে এটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৮ লাখ মানুষ পরিপাকতন্ত্রের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহজনিত রোগ আইবিডিতে ভুগছেন। এতে আক্রান্ত রোগীদের তীব্র পেট ব্যথা, ডায়রিয়া ও অবসাদ তৈরি হয়।
রোগটির মূল কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ত্রুটিপূর্ণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বংশগত কারণ ও পেটে বসবাসকারী অণুজীব এর জন্য দায়ী হতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
এ রোগের চিকিৎসায় প্রদাহবিরোধী ও ইমিউন-সিস্টেম কমানোর ওষুধ ব্যবহৃত হয়। তবে বহু রোগীর ক্ষেত্রে এসব ওষুধ কাজ করে না ও বেশিরভাগ রোগীকে পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে বাদ দিতে হয়।
এ ছাড়া, দীর্ঘদিনের এই প্রদাহ পরিপাকতন্ত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। এসব কারণেই বিজ্ঞানীরা রোগের শুরুর দিকের লক্ষণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যেন ক্ষতি শুরু হওয়ার আগেই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
‘মাউন্ট সিনাই’ ও ‘মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনার’ গবেষক দলকে সঙ্গে নিয়ে গবেষক বুরগোনজে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রক্তের নমুনার ওপর পরীক্ষা চালান।
তারা ৫০০ জন ব্যক্তির মোট দুই হাজার রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন, যাদের মধ্যে ২০০ জন পরবর্তীতে ‘ক্রোনস ডিজিজ’ ও আরও ২০০ জন ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’-এ আক্রান্ত হন।
বাকি ১০০ জনের মধ্যে কোনো ধরনের রোগ দেখা দেয়নি।
গবেষণায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, খাবার বা মানবদেহের নিজস্ব টিস্যু থেকে তৈরি শত শত কোটি প্রোটিনের খণ্ডের বিরুদ্ধে লড়তে ইমিউন সিস্টেম যে ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি করে রক্তের নমুনাগুলোয় সেসব অ্যান্টিবডি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা পরবর্তীতে ক্রোনস ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের দেহে ‘অ্যাপস্টাইন-বার ভাইরাস’ (যা গ্ল্যান্ডুলার ফিভারের জন্য দায়ী)-এর বিরুদ্ধে লড়াইকারী অ্যান্টিবডির উপস্থিতি বেশি ছিল।
আর রোগ শনাক্ত হওয়ার ১০ বছর আগেই রক্তের এ পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যাদের পরবর্তীতে রোগটি আরও জটিল আকার ধারণ করেছিল, যেমন পরিপাকতন্ত্র সরু হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক নালি তৈরি হওয়া তাদের ক্ষেত্রে এই সংকেত ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট।
অন্যদিকে, আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে ভিন্ন ধরন দেখা গেছে, যার মধ্যে দেহের নিজস্ব প্রোটিনের বিরুদ্ধে লড়াই করা অ্যান্টিবডিও রয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে চিকিৎসা সাময়িকী ‘গাট’-এ এবং বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ‘ইউনাইটেড ইউরোপীয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’ সম্মেলনে এটি উপস্থাপিত হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এটা কোনো ভাইরাসের কারণে সরাসরি আইবিডি হওয়াকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না, বরং দুইয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র দেখায়। ফলে অন্য গোষ্ঠীর ওপরও এই গবেষণা চালানোর তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।
বিজ্ঞানীদের আশা, টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো আইবিডি গবেষণাও নতুন দুয়ার খুলবে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে বোঝা সম্ভব হয় ইমিউন সিস্টেম প্যানক্রিয়াসে আক্রমণ চালানো শুরু করেছে কি না, যা রোগটির প্রকোপ বিলম্বিত করতে আগেই চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করে।
গবেষণার বাইরে থাকা বার্টস হেলথ-এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক জেমস লিন্ডসে বলেছেন, “সমীক্ষাটি ক্রোনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিসের কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বা ধারণা দেয়, যা আইবিডি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আগাম চিহ্নিত করতে নতুন হাতিয়ার যোগ করতে পারে।”
তবে এসব প্রযুক্তি এখনও গবেষণাগারেই রয়েছে এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে সরাসরি প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের রোগীদের সেবামূলক সংগঠন ‘ক্রোনস অ্যান্ড কোলাইটিস ইউকে’র প্রধান নির্বাহী মারিয়েন র্যাডক্লিফ বলেছেন, “ক্রোনস ও কোলাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
“প্রতিটি নতুন তথ্য এসব রোগের বিকাশ, বিশেষ করে লক্ষণ দেখা দেওয়ার বহু বছর আগের শারীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা তৈরিতে সাহায্য করে।”
