সিত্রাং: কুমিল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬৫ হেক্টরের ফসল, স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ সঞ্চালন
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ এর জেনারেল ম্যানেজার বলেন, “রাতে শেষ করতে না পারলেও, আশা করছি বুধবারের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্বাভাবিক হবে।”
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টিতে কুমিল্লায় ৬৬৫ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় গাছ পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সঞ্চালন লাইনের।
এর মধ্যে কুমিল্লা নগরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও জেলার ১৭ উপজেলার অন্তত ১২টির অধিকাংশ স্থানে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তা স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছেন গ্রাহকরা।
ঘুর্ণিঝড়ের গতির তুলনায় জেলায় ফসলের ক্ষতি কম হয়েছে জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, “ঝড়ের যে গতি ছিল, তাতে আরও বেশি ক্ষতি হতে পারতো। কুমিল্লা ধানের এখনও ফুল হয়নি, তাই ক্ষতি কম হয়েছে। তবে গোমতী ও মেঘনা চরের এবং তিতাস ও হোমনা এলাকায় সবজি জমির বেশি ক্ষতি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “জেলায় ক্ষতিগ্রস্থ জমির পরিমাণ ৬৬৫ হেক্টরের বেশি হবে। এর মধ্যে ধানি জমি ৩৬৭ ও শাক-সবজির জমি ২৮৫ হেক্টর।”
সিত্রাংয়ের প্রভাবে প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস শুরু হলে সোমবার রাত ৮টার পর নগরীসহ জেলার প্রায় সব স্থানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ফুলপুকুরিয়া গ্রামের গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, “সোমবার বিকেলে ঝড় শুরুর আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা চরম দুর্ভোগে পড়েছি। ফ্রিজের সব কিছু এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে সেটাও বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। গ্রাহকরা বারবার কল করলেও তারা কল ধরছেন না এবং অনেক সময় মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখছেন।”
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন জেলার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলার বাসিন্দারা। ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪।
এই সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সাদেক জামান বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ে কুমিল্লা জেলার মধ্যে লাকসাম অঞ্চলে সম্ভবত বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি মঙ্গলবার রাত ১২টার মধ্যে প্রতিটি স্থানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্বাভাবিক করতে। রাতে শেষ করতে না পারলে বুধবারের মধ্যে আশা করছি সঞ্চালন আগের মতো স্বাভাবিক হবে।”
দীর্ঘসময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও মঙ্গলবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরীর অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু হয়েছে জানিয়ে পিডিবি কুমিল্লা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, নগরীতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রায় স্বাভাবিক আছে। তবে নগরীর বাইরে কিছু জায়গায় গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ ছিলো। আশা করছি রাতের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড়ে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে রেললাইন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে।ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি এলাকায় গাছ পড়ে সোমবার রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ ছিলো।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্তত ১০টি স্থানে ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ে। এছাড়াও কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কেও কয়েকটি জায়গায় গাছ উপড়ে পড়ে। রাতভর হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মিলে গাছ অপসারণ করেছেন। এখন কোনো সমস্যা নেই।
জেলা আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত গত চব্বিশ ঘণ্টায় কুমিল্লায় ৬২ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সিত্রাং কুমিল্লা অতিক্রমকালে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৩ কিলোমিটার।
আবহাওয়া অধিদপ্তর কুমিল্লার কর্মকর্তা ইসমাইল ভূঁইয়া বলেন, “সিত্রাং কুমিল্লায় ১২ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী ছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ের পরিসরও অনেক বড় ছিল। তাছাড়া যে গতিতে এটি কুমিল্লা অতিক্রম করেছে, তা এ জেলার প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি। লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে প্রচুর গাছপালা উপড়ে পড়েছে।”
আরও পড়ুন
