২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ওসি চলে যাচ্ছেন, ঘরের হাঁস-লাউ-ফল নিয়ে এসে বিদায় দিলেন মানুষ

ওসি মুহাম্মদ আফজাল হোসেনকে বিদায় জানাতে বুধবার সকাল থেকেই মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার সামনে ভিড় করেন স্থানীয়রা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 23 Sep 2026, 05:00 PM

Updated : 23 Sep 2026, 05:00 PM

এক থানা থেকে আরেক থানায় বদলি একজন পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিদায়ের দিন হয়তো থানার সহকর্মীরা কোনো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ খুব একটা থাকে না।

কিন্তু বুধবার মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানা থেকে বদলি হওয়া ওসি মুহাম্মদ আফজাল হোসেনের বিদায়টি ছিল একবারেই ব্যতিক্রম।

এদিন সকালে তিনি নতুন কর্মস্থলের রওয়ানা হওয়ার আগে সহকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয়দের ভালোবাসায়ও সিক্ত হয়েছেন। কেউ তার জন্য নিয়ে এসেছিল বাড়ির গাছের লাউ, কেউ মৌসুমি ফল, আবার কেউ হাঁস-মুরগি।

তাকে বিদায় জানাতে সকাল থেকেই থানার সামনে ভিড় করেন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ সময় অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

পরে বেলা ১২টার দিকে হরিরামপুর থানা প্রাঙ্গণে বিদায়ী ওসি আফজাল হোসেনকে বিদায় এবং নবাগত ওসি জে ও এম তৌফিক আজমকে বরণ করে নিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এতে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত হন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয়রা বিদায়ী ওসিকে ফুলের মালা ও ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে তার সঙ্গে ছবি তোলেন অনেকে। কেউ কুশল বিনিময় করেন, আবার কেউ দায়িত্ব পালনকালের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগের পরিবেশ।

এ সময় এম এ রাজ্জাক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওসমান আলী বলেন, “ওসি আফজাল হোসেন দায়িত্ব পালনকালে সকালে হাঁটতে বের হওয়ার সময় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখতেন। এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন।”

পাটগ্রাম অনাথ বন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, “হরিরামপুরের অন্যতম ভাল একজন ওসি ছিলেন তিনি।”

চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী চাঁন মেম্বার বলেন, “আফজাল ওসি আমগো চরের চোর ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে মেলা ভালো কাজ করছে। চরের শান্তি রক্ষায় মেলা ভাল কাজ করছে। আমরা শান্তিতে ছিলাম, মাদক নিয়ন্ত্রণেও মেলা কাজ করছ।”

চরাঞ্চলের মাইন উদ্দীন বলেন, “আমগো চরে ডাকাতি-চুরি নিয়ন্ত্রণে তার কাজ আমগো মনে থাকবো। তাই ট্রলারে নদী পার অইয়া তারে উপহার দিতে হাঁস নিয়া আইছি।”

যাত্রাপুর গ্রামের হাবেজা বলেন, “স্যার মেলা ভালো মানুষ। তাই তার জন্য নিজের গাছের জাম্বুরা নিয়ে আইছি।”

স্থানীয়দের এমন ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আফজাল হোসেনও। তিনি বলেন, হরিরামপুরবাসীর এমন আয়োজনে আমি আবেগী হয়ে গেছি।

“চাকরি করলে বদলি হবেই। হরিরামপুরে দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। বিদায়বেলায় হরিরামপুরবাসী যেভাবে সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়েছেন, আমি কখনো ভুলবো না।”

তিনি বলেন, “এলাকার মানুষ খুব নিরীহ। এখানকার মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক ও স্মৃতি সারাজীবন মনে থাকবে। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”

অনুষ্ঠান শেষে ফুল দিয়ে সাজানো গাড়িতে করে নতুন কর্মস্থলের দিকে রওনা দেন আফজাল হোসেন। এ সময় থানার বাইরে থাকা স্থানীয়রা কেউ হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানান, কেউবা আবেগ ধরে রাখতে না পেরে চোখের পানি মুছতে থাকেন।