Published : 23 Aug 2026, 06:43 PM
বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে শিশুর প্রাণ নেওয়া ‘ধলাপাহাড়’ নামের কুমিরটিকে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নেওয়া হয়েছে।
১২ অগাস্ট খুলনার বয়রার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কুমিরটিকে কক্সবাজারে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল।
১ জুন রাতে মাজারের দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে বা হাত-মুখ ধুতে নেমে কুমিরের আক্রমণে মারা যায় আট বছর বয়সী ফাতেমা। পরদিন ভোরে দিঘির পানিতে শিশুটির লাশ ভেসে উঠলে তা উদ্ধার করা হয়। এর আগে একটি কুকুরকেও কুমিরটি আক্রমণ করে হত্যা করেছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
শিশুর মৃত্যুর পর দিঘিতে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে ৩ জুন কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
নির্মল কুমার পাল বলেন, বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে কোনো প্রাণী দীর্ঘদিন রাখার সুযোগ নেই। এ কারণে বৃহত্তর আবাসস্থলের কথা বিবেচনা করে কুমিরটিকে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এ বিষয়ে ঢাকার বন সংরক্ষক, বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলে চিঠি পাঠানোর পর কক্সবাজারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান তিনি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাদি কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত থেকে আট ফুট এবং ওজন আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি। ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে খানজাহান আলী (রহ.)-এর দিঘিতে আনা ছয়টি কুমিরের মধ্যে এটিই বর্তমানে জীবিত থাকা শেষ কুমির।
নতুন পরিবেশে ‘ধলাপাহাড়’
খুলনা থেকে কক্সবাজারে নেওয়ার পর কুমিরটি ভালো আছে বলে জানিয়েছে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ।
পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম বলেন, কুমিরটিকে এখন বেশ ভালো মনে হচ্ছে। পার্কের দিঘিতে সপ্তাহে একদিন খাবার দেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর দিনই কুমিরটি একটি জীবিত মুরগি খেয়েছে। এরপর আর খাবার খেতে দেখা যায়নি।
খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় কুমিরটি প্রায় কোনো খাবারই খায়নি বলে জানান নির্মল কুমার পাল।
শুরুতে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলেও খাবার না খাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার কুমির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয় বনবিভাগ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্দি অবস্থায় কুমির দীর্ঘ সময় না খেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। জোর করে খাওয়ানোরও দরকার নেই। কেন্দ্রটির চিকিৎসক জুলকারনাইনও কুমিরটির শারীরিক পরীক্ষা করে সুস্থ অবস্থায় পান বলে জানান নির্মল।
তার ভাষায়, নতুন পরিবেশে এসে কুমিরের কিছুদিন খাবার না খাওয়া স্বাভাবিক। শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী হওয়ায় কুমিরের শক্তির চাহিদা তুলনামূলক কম। শরীরে সঞ্চিত চর্বি থেকেও তারা দীর্ঘ সময় শক্তি পেতে পারে।
কেন আক্রমণ করেছিল?
শিশুর মৃত্যুর পর প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘদিন মাজারের দিঘিতে থাকা কুমিরটি কেন মানুষের ওপর আক্রমণ করল।
সুন্দরবনের করমজলে কুমির প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রে কুমির নিয়ে কাজ করা বনবিভাগের কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবিরের মতে, খাবারের অভাবকে এর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, কুমির জন্মগতভাবেই শিকারি স্বভাবের প্রাণী। তাদের আচরণে প্রাকৃতিক পরিবেশ, আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব থাকতে পারে।
আজাদ কবিরের মতে, মাজারের দিঘিতে কুমিরকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হলেও জীবিত প্রাণী সামনে দিয়ে আবার সরিয়ে নেওয়া, মাছ ধরতে জাল দেওয়া এবং কুমিরটির দীর্ঘদিন একাকী অবস্থান- এসব বিষয় তার বিচরণের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
তার ভাষায়, খাবারের সামনে কুমিরকে প্রলুব্ধ করা বা দিঘির স্বাভাবিক পরিবেশে মানুষের নানা কার্যক্রম প্রাণীটির আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
মাজারের দিঘিতে কুমিরের ইতিহাস
খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে কুমির থাকার ইতিহাস বহু পুরোনো।
ইতিহাসবিদদের মতে, দিঘি খননের পর খানজাহান আলী (রহ.) সেখানে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন বলে প্রচলিত আছে। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র মিত্রের ইতিহাস গ্রন্থে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি কুমিরের কথাপাওয়া যায়।
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মাজারের খাদেম ও ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরে এসব কুমিরকে খাবার দিয়ে আসছিলেন।
তবে খানজাহান আলী (রহ.)-এর আমলের কুমিরের বংশধারা ২০১৫ সালে শেষ হয়। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘ধলাপাহাড়’ নামের শতবর্ষী একটি কুমির মারা যায়।
এর আগে কুমিরের সংখ্যা কমে আসায় ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব কুমিরের কয়েকটি মারা যায় এবং কয়েকটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ‘ধলাপাহাড়’ নামের মাদি কুমিরটিই দিঘিতে টিকে ছিল।
শিশুর মৃত্যুর পর নিরাপত্তার কারণে সেই কুমিরটিকেও সরিয়ে নেওয়া হলো।
আরও পড়ুন:
খানজাহান আলীর মাজারের পুকুরে শিশুকে টেনে নিয়ে গেল কুমির
খানজাহান আলীর মাজার: কুমিরে টেনে নেওয়া শিশুর লাশ উদ্ধার
সরানো হলো খানজাহান আলী মাজার দিঘির কুমির, রাখা হবে খুলনায়
খানজাহান আলী মাজার দিঘির কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ায় ক্ষোভ, ফেরতের দাবি