Published : 15 Aug 2025, 09:19 PM
শরীয়তপুর শহর থেকে মুমূর্ষু এক নবজাতককে নিয়ে ঢাকাগামী অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চালক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা আটকে থাকার পর অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই মৃত্যু হয় নবজাতকের।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে শরীয়তপুর শহরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
মারা যাওয়া শিশুটির বাবা শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর এলাকার নূর হোসেন সরদার। বৃহস্পতিবার রাতে শিশুটির মা রুমা বেগমকে ভর্তি করা হয় শহরের বেসরকারি হাসপাতালে মক্কা ক্লিনিকে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফুটফুটে ছেলে শিশুটির জন্ম হয়।
শিশুটির স্বজনরা জানান, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছিল শিশুটি। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। পরিবারের লোকজন তখন ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া করেন।
কিন্তু রাত ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে শিশুটিকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে গাড়িটির গতিরোধ করে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক ও ব্যবসায়ী আবু তাহের দেওয়ান ও তার ছেলে সবুজ দেওয়ান। আবু তাহের দেওয়ান শরীয়তপুর সিভিল সার্জনের গাড়িরও চালক।
আবু তাহের ও তার ছেলে তাদের নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সে রোগী দিতে রাজি নন। এক পর্যায়ে তারা ঢাকাগামী অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাবি কেড়ে নিয়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে থাকে। এ সময় রোগীর লোকজন বাধা দিলে তাদেরও লাঞ্ছিত করা হয়।
শিশুটির স্বজন রানু আক্তার বলেন, “আমরা তাদের অনেক অনুরোধ করেছিলাম গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেনি। চালকের কলার ধরে গাড়ির চাবি নিয়ে গেছে, পরে আমাদের বাচ্চাটি মারা যায়।”
আটকে রাখা অ্যাম্বুলেন্সটির চালক মোশারফ মিয়া বলেন, “আমি ঢাকা থেকে ট্রিপ নিয়ে শরীয়তপুরে এসেছিলাম। পরে রোগীর লোক ঢাকায় যাওয়ার জন্য আমার গাড়ি ভাড়া করে।
“শিশুটির অবস্থা খারাপ হওয়ার আমি দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দেই। তখন কয়েকজন লোক এসে আমাকে জোর করে কলার ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে চাবি কেড়ে নেয়।”
চালক আরও বলেন, “এক পর্যায়ে ওই লোকদের বলেছিলাম, আপনারাই তাহলে এই পেশেন্ট নিয়ে যান, কিন্তু পেশেন্টের লোক আমাকেই গাড়ি নিয়ে যেতে বলছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা পরও তারা আমাকে না ছাড়ায় বাচ্চাটা গাড়িতেই মারা যায়।”
অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে মারা যাওয়া শিশুটির নানি সেফালী বেগম বলেন, “আমার নাতিকে ঢাকায় নিতে পারলে হয়তো ও বেঁচে যেতো। ওরা আমার নাতিকে বাঁচতে দেয়নি। ওদের জোরাজুরিতে আমার নাতির মুখ থেকে অক্সিজেন খুলে গেছে। তাই সে মারা গেছে। ওদের আমি বিচার চাই।”
শরীয়তপুরের কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্স চালক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালক সিন্ডিকেটের কবলে ভুগছেন সাধারণ রোগীরা। এ সিন্ডিকেটের কারণে বাইরের থেকে কোনো গাড়ি এসে রোগী নিতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচে সিন্ডিকেটের গাড়ি ভাড়া করতে হয়। বাইরের গাড়ি রোগী নিতে হলে এ সিন্ডিকেটকে চাঁদা দিতে হয়।
এ ব্যাপারে শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স কল্যাণ মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই মোল্লা বলেন, “বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলে আমরা বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে দেই না।”
তবে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমাদের খরচ একটু বেশি পড়ে তাই হয়তো চালকরা ভাড়া একটু বেশি নেন।”
এ বিষয়ে আবু তাহের দেওয়ান ও তার ছেলে সবুজ দেওয়ানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
শরীয়তপুর সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো কিছু জানি না|”
পালং মডেল থানার ওসি হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। ভুক্তভোগী পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তবে আমরা অপরাধীদের ধরতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”