Published : 10 Aug 2026, 12:33 AM
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় স্কুলের পোশাক পরা দুই শিশু শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত এবং পেছন থেকে লাথি মারছে আরেক ছেলেশিশু। লাথি মারা শিশুর সঙ্গে থাকা আরেকজন আবার তা ভিডিও করছে।
সম্প্রতি এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীকেই উল্টো ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে বিষয়টি ঠিক নয় বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাসখানেক আগে সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর সেতুর পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে হাঁটাপথে (ওয়াকওয়ে) ঘটনাটি ঘটে। যে ছেলেশিশুটি স্কুলছাত্রীকে লাথি মারছে তার বয়স ১১ বছর।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী দুই ছাত্রীই কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের। তাদের একজন সপ্তম শ্রেণিতে, অপরজন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।
ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আতিকুর রহমান বুধবার স্কুলে যান। তিনি সবার সঙ্গে কথা বলেন।
পরে বিকালে আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “টিসি দেওয়ার বিষয়টি গুজব আকারে ছড়িয়েছে। মূলত ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। দুটি চিঠি আমি পড়েছি। তারা সেটিকে টিসি ভেবেছিল। এ ছাড়া চিঠিতে স্কুল ড্রেস পড়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।”
রোববার দুজন ছাত্রীই নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এই বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে নোটিশ জারির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “এই দুই শিক্ষার্থীকে কোনো টিসি দেওয়া হয়নি এবং তাদের জন্য এই বিষয়ে আর কেউ বিরক্ত না করেন- এ সম্বলিত একটি নোটিশ সোমবার প্রতি ক্লাসে জানিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা হয়েছে।”
এ বিষয়ে ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিন সরকার বলেন, “স্কুলের সময় বাইরে থাকাতে আগেও ওই দুই শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। ওই ভিডিওর পর তাদের অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে স্কুলে ডাকা হয়েছিল। এটিকেই তারা টিসি ভেবেছে। টিসি কাউকে দেওয়া হয়নি। কেবল সতর্ক করতে অভিভাবকদের ডাকা হয়েছিল।”
কথা হয় ভুক্তভোগী চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর বাবার সঙ্গেও। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনই পোশাক কারখানার কর্মী। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লাতে হলেও কাজের সুবাদে অনেক বছর ধরেই তারা কাঁচপুরে ভাড়া থাকেন।
মোবাইল ফোনে ওই ছাত্রীর বাবা বলেন, “ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্কুল থেকে আমাদের একটা চিঠি দিছিলো। আমরা ওইটাকেই টিসি ভেবেছিলাম। আজকে আমাদের স্কুলে ডাকা হয়েছিল। আমার মেয়ে আজকে ক্লাসও করেছে।”
ছেলেশিশুর ছয় মাসের ‘প্রবেশন’
এদিকে, ছেলেশিশুকে সংশোধনের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ছয় মাসের ‘প্রবেশন’ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী।
ছেলেশিশুটি সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ইউনিয়নের একটি ভাড়াবাসায় থাকত। সে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরে। তার বাবা পেশায় রিকশাচালক এবং মা পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
তিনি বলেন, “শনিবার শিশুটিকে আটক করা হয়। পরে ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা বা ডাইভারশনের মাধ্যমে ওই শিশুকে ছয় মাসের জন্য অভিভাবকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই ছয় মাসে ওই শিশুকে কাউন্সেলিং করা হবে। প্রতি মাসে তার বিষয়ে পুলিশকে প্রতিবেদন দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে সে এ ধরনের কাজে জড়াবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত করেছিলেন কাঁচপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ সাউদ। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ৪ অগাস্ট তাকে একজন মোবাইল ফোনে ভিডিওর একটি লিংক পাঠান। পরে তিনি বিষয়টি তার এলাকায় হওয়াতে পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে ছেলেশিশুকে শনাক্ত করেন। ছেলেটির বাড়ি তার পাশের গ্রামে, সেখানে তার শশুরবাড়ি।
“ওইদিনই স্থানীয় লোকজন ওই ছেলেশিশুকে এবং তার পরিবারকে ডেকে এনে বিচার-সালিশ করে। শিশু হওয়াতে বিচারে তাকে কান ধরে উঠবস করিয়ে দু-একটা চড়-থাপ্পরও দেওয়া হয়। পরে বিচারের সময় যারা ছিলেন তারা ওই শিশুর পরিবারের সবাইকেই রংপুরে তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, “ওই ছেলের সঙ্গে আরও দুইজন ছেলে ছিল। তারা গ্রামের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের নামও আর আসেনি।”