এই ঘটনাকে অন্যায় মনে করছেন না গোপালদী পৌর মেয়র ও আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হালিম সিকদার।
Published : 06 Feb 2023, 07:53 PM
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চুরির অপবাদে প্রকাশ্যে তিন মাদ্রাসাছাত্র শিশুর চুল কেটে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে।
সোমবার সকালে উপজেলার গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদী বাসস্ট্যান্ডে এই ঘটনা ঘটে।
গোপালদী পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হালিম সিকদারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন শিশুদের অভিভাবক।
১১ বছর, ৯ বছর ও ৭ বছর বয়সী এই তিন শিশুর প্রথমজন স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ এবং দ্বিতীয়জন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। অপরজন স্থানীয় একটি মক্তবে পড়েন বলে জানান ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রামচন্দ্রদী বাজার এলাকায় সরকারি জায়গার উপর মেয়র হালিম সিকদারের একটি টেক্সটাইল কারখানা রয়েছে। সম্প্রতি কারখানাটি উচ্ছেদ করলে কিছু যন্ত্রপাতি এদিক-ওদিক ছড়ানো ছিল। সকালে দুই শিশু সেখানে খেলছিল। তাদের একজনের হাতে একটি শেকল দেখতে পান মেয়র। পরে তিনি ওই দুইজনের হাত পেছনদিক করে বেঁধে অপর আরেক শিশুর বাড়িতে গিয়ে তাকে ধরে আনেন। পরে তিনজনকে একইভাবে বেঁধে পুরো গ্রাম ঘোরান। তাদের মারধরও করেন তিনি।
প্রায় তিন ঘণ্টা এভাবে ঘোরানোর পর বাজারে নিয়ে প্রকাশ্যে তিনজনের চুল কেটে দেন।
১১ বছর বয়সী শিশুর বাবা পাশের গ্রামের একটি মসজিদের ইমামতি করেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাচ্চারা হয়তো শেকলটি কুড়িয়ে পেয়েছিল। কিংবা চুরিও যদি করে তাহলে অভিভাবক ডেকে স্থানীয়ভাবে বিষয়টাকে মীমাংসা করা যেত।
“কিন্তু তা না করে তিনজনের হাত বেঁধে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে সেলুনে নিয়ে গিয়ে জনসম্মুখে তাদের চুল কেটে দেন। আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় বাচ্চাগুলারে আটকে রাখা হয়। আমরা হাত-পায়ে ধরে মেয়রের কাছে মাফ চাইলেও তিনি শোনেননি।”
বিষয়টি জানাজানি হলে মেয়রের লোকজন ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজনকে বাড়ি গিয়ে শাসিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এক শিশুর অভিভাবক বলেন, “আমার বাড়িতে মেয়রের ছোটভাই মনির শিকদার ও চাচাতো ভাই আফাজউদ্দিন শিকদারসহ আরও কয়েকজন পরিবারের লোকজনকে শাসিয়েছেন। এই নিয়ে কারও সাথে কোনো কথা বললে শিশুদেরসহ তাদের অভিভাবকদেরও মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।”
ওই অভিভাবক আরও বলেন, “এরা তো স্থানীয় মাতবর। তাগো বিরুদ্ধে তো এমনিতেই যাইতে পারমু না। তাগো বিরুদ্ধে কিছুই করমু না, থানায়ও যামু না। আপনারা লেখালেখি করলে গ্রামে থাকতে পারি কিনা সেইটাও ঠিক নাই।”
শিশুদের বেঁধে গ্রামে ঘোরানো এবং জনসম্মুখে চুল কেটে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও এই ঘটনাকে অন্যায় মনে করছেন না মেয়র হালিম সিকদার।
তিনি বলেন, “ওরা আমার কারখানার জিনিসপত্র চুরি করেছে। এই কারণে একটু শাস্তি দিয়েছি। আমার কারখানার মালামাল গত তিন মাস ধরে চুরি হইতেছে। আজকে দুইজনকে হাতেনাতে ধরছি। পরে আরও একটারে ধইরা আনি বাসা থেকে। হাতে না, কোমরে দড়ি বেঁধে ওইগুলারে বাজারে নিয়া যাই। সেখানে গিয়ে পরে চুল কেটে দেই। পোলাপান দেইখা বেশি শাসন করি নাই।”
অভিভাবকদের ডেকে বিষয়টি না জানিয়ে শিশুদের সাথে এমন আচরণ করা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনারা খালি অন্যায়ের কথা বলেন। আমার ৬০-৭০ হাজার টাকার জিনিসপত্র চুরি হইছে সেইটাও তো অন্যায়। ওই পোলাপানের একটার চাচায় আমার কারখানায় কাজ করে, আরেকজনের মায়রে আমি মাতৃত্বকালীন ভাতা কইরা দিছিলাম। ওরা আমার গ্রামে থাইকা আমার থেকে সুবিধা নিয়া আমার জিনিস চুরি করলে ছাইড়া তো দেওয়া যায় না।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আড়াইহাজার থানার ওসি আজিজুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাংবাদিকদের মাধ্যম বিষয়টি জানতে পেরেছি। পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি।”
প্রাথমিকভাবে বিষয়টি শুনেছেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইশতিয়াক আহমেদও। এই বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।