সাতক্ষীরায় আম পাড়া শুরু, উৎসবের আমেজ
বাজারে এসেছে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস ও বৈশাখী জাতের আম। ১৫ মে হিমসাগর, ২৭ মে ল্যাংড়া বাজারজাত শুরু হবে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়া শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আম সংগ্রহের মৌসুম শুরু হল।
মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের আমচাষী আবু সাঈদের বাগানে এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলার উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম।
উৎসবের আমেজে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বৈশাখী, গোলাপখাসসহ বিভিন্ন আগাম জাতের আম সংগ্রহকে কেন্দ্র করে এই আয়োজনে চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ পরিবেশ।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল বলেন, “সাতক্ষীরার আমের সুনাম এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই সুনাম ধরে রাখতে হলে অবশ্যই নির্ধারিত ‘আম ক্যালেন্ডার’ অনুসরণ করতে হবে।”
অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে আগাম পাকা আম সংগ্রহ করা যাবে। নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
একই সঙ্গে জেলায় একটি বড় পরিসরের আম মেলা আয়োজন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা সহজ করতে প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
স্বাগত বক্তব্যে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, “আম পাড়া উৎসব এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ। এটি শুধু কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।”
ভবিষ্যতে নিরাপদ আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে আরও আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
আমচাষী আবু সাঈদ বলেন, “সাতক্ষীরায় একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন খুবই জরুরি। সংরক্ষণ সুবিধা থাকলে আমরা ন্যায্য দামে আম বিক্রি করতে পারবো এবং ক্ষতির ঝুঁকি কমবে।”
উপকূলীয় আবহাওয়ার অনুকূলে সবার আগে আম পাকার এই জেলায় মৌসুমের সূচনাকে ঘিরে আশাবাদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখা দিয়েছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, “আম চাষ একটি লাভজনক কৃষিখাত। মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে সরাসরি চাষিদের লাভবান করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি একটি আম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।”
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা প্লাবনী সরকার বলেন, চলতি মৌসুমে ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস ও বৈশাখী জাতের আম বাজারে এসেছে। ১৫ মে থেকে হিমসাগর, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি বাজারজাত শুরু হবে।
এদিকে আমের মৌসুম শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মাঝেও দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
আম ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, “দেশে সবার আগে সাতক্ষীরার আম বাজারে আসে, আর স্বাদ-গুণেও এটি সেরা। এজন্য ক্রেতাদের আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি।”
চাষী ও ব্যবসায়ী হেমন্ত দাস বলেন, “সাতক্ষীরার আমের আলাদা একটা ঘ্রাণ ও মিষ্টতা আছে, যা দেশের অন্য অঞ্চলের আম থেকে আলাদা। এই জেলার আম মানেই আস্থা।”
আমচাষী বেল্লাল হোসেন, মনিরুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরার আম আগে আসে বলেই ব্যবসায়ীরা ভালো দাম পান। মৌসুমের শুরুতেই বাজার সরগরম হয়ে ওঠে। এখানে উৎপাদিত আম দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে যদি সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হয়, তাহলে আম রপ্তানির সুযোগও বাড়বে।
আমচাষী খালিদ হাসান লিমন বলেন, “ইতোমধ্যে বাগানজুড়ে পাকা আমের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে, যা চাষিদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।”
কৃষি বিভাগ জানায়, জেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। নিবন্ধিত আম বাগানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৯৯টি এবং সরাসরি এ খাতে যুক্ত রয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক চাষি।
তাদের আশা অনুকূল আবহাওয়া ও সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার আম নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
