Published : 07 Oct 2024, 07:53 PM
শুমারিতে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনার প্রত্যাশা করছে বনবিভাগ।
মঙ্গলবার সুন্দরবনের বাঘ শুমারির চূড়ান্ত ফলাফল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
আগের দিন সোমবার সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাসের মহসিন হোসেন বাঘের সংখ্যা বাড়ার আশার কথা জানালেন।
তিনি বলেন, এর আগে বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাঘ জরিপ হলেও এ বছর দেশীয় প্রযুক্তি ও দেশের অর্থায়নে বনের চারটি রেঞ্জেই ক্যামেরার ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।
ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঘকে রক্ষার জন্য কেল্লা নির্মাণ করা হচ্ছে সুন্দরবনে। এ প্রকল্পের আওতায় লোকালয়ে বাঘ এবং অন্যান্য প্রাণী আসা ঠেকাতে নাইলনের বেষ্টনী দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০২২ সালের ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের’ অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ক্যামেরা ট্র্যাকিং পদ্ধতিতে বাঘশুমারি করা হয়। এতে ব্যয় হয় তিন কোটি ২৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। প্রকল্পে এ পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
বনের মধ্যে এক হাজার ২০০ এর বেশি ক্যামেরায় বাঘের ছবি তোলা শেষ হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। এরপর ক্যামেরার তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবসে ফলাফল ঘোষণা করার কথা ছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাই কাজে সময় লাগায় তা আর সম্ভব হয়নি বলে জানান বন কর্মকর্তা আবু নাসের মহসিন হোসেন।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইন্টারনেটে সমস্যা, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে জরিপের তথ্য পর্যালোচনায় সময় লাগে।
বিশাল সুন্দরবনে ডোরাকাটা একই রঙের, একই রকম দেখতে বাঘগুলো কীভাবে আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে আবু নাসের মহসিন হোসেন বলেন, একজন মানুষের আঙুলের ছাপের সঙ্গে যেমন আরেকজনের মিল নেই, তেমনি একটি বাঘের ডোরাকাটার সঙ্গে আরেকটি বাঘেরও মিল থাকে না।
“ক্যামেরায় একেকটি বাঘের শতাধিক ছবিও ওঠে। সেসব ছবি সংগ্রহের পর কম্পিউটারে প্রতিটি বাঘের আলাদা করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই জানা যায়, সুন্দরবনে ঠিক কতগুলো বাঘ আছে।”
জরিপের জন্য সুন্দরবনে গাছের সঙ্গে মাটি থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
ক্যামেরার সামনে দিয়ে কোনো বাঘ বা অন্য যেকোনো প্রাণী গেলে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির ছবি এবং ১০ সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করে রাখে। এরপর সেই ছবি বন অধিদপ্তরের রিসোর্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ইউনিটে বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া সুন্দরবনের খালে সাধারণত বাঘ পানি খেতে আসে। এতে খালের পাড়ে বাঘের পায়ের ছাপ পড়ে। বাঘের ধরন অনুযায়ী ওই ছাপ ভিন্ন হয়। এভাবে পায়ের ছাপ দেখেও বাঘের সংখ্যা গোনা যায় বলে জানান আবু নাসের মহসিন হোসেন।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, সুন্দরবনের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাকে মোট চারটি এলাকায় ভাগ করে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে বাঘের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। সামগ্রিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে সুন্দরবনে আগের তুলনায় বাঘের সংখ্যা বেড়েছে।
নয়নাভিরাম সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়া পর্যটক এবং বনে থাকা বনকর্মীরা প্রায়ই বাঘের দেখা পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে সুন্দরবনে বাঘের দেখা বেশি মিলছে। বনে আগের তুলনায় বাঘের প্রজনন বেড়েছে, সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে।
তিনি বলেন, জরিপে দেখা গেছে, বনে বাঘের প্রধান শিকার চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকরের সংখ্যাও বেড়েছে। খাবারের সংকট না থাকায় বাঘের লোকালয়ে হানা দেওয়া কমেছে।
বনবিভাগ জানায়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনভূমি চার হাজার ৮৩২ এবং জলাভূমি এক হাজার ১৮৫ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫ সালের বাঘশুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। আর ২০১৮ সালের শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪।
এদিকে প্রতি তিন বছর অন্তর বাঘ গণনা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য ও বিভাগীয় সমন্বয়কারী আইনজীবী মো. বাবুল হাওলাদার।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তিন বছর অন্তর বাঘ গণনার নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দে বড় ধরনের অর্থ অপচয় ও লুটপাট হচ্ছে। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।”
তিনি মনে করেন, অন্তত ১০ বছর পর পর গণনা করলেও সুন্দরবনের উপর চাপ কমবে।