ঠাণ্ডায় ভূমধ্যসাগরে মৃতদের ঘরে কাঁদছে স্বজন, কাঁদে প্রতিবেশী
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ঠাণ্ডায় মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম, যাদের পাঁচজনই হলেন মাদারীপুরের।
পরিবারের শোকার্ত স্বজনদের কোনোভাবেই প্রবোধ দেওয়া যাচ্ছে না। তাদের সান্ত্বনা দিতে যাওয়া এলাকাবাসীর চোখও অশ্রু সজল হয়ে উঠছে।
লিবিয়া থেকে যাত্রা করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া নৌকাটি ২৫ জানুয়ারি ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে পৌঁছানোর সময় অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় অভিবাসন প্রত্যাশী সাত বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে নিহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেছে ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস। সেখানে দেখা যায়, মারা যাওয়া সাতজনের পাঁচজনই মাদারীপুর জেলার।
তারা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পিয়ারপুর গ্রামের ইমরান হোসেন (২২), একই উপজেলার পিয়ারপুর গ্রামের জয় তালুকদার (২৩), ঘটকচর গ্রামের সাফায়েত হোসেন (২৩), মোস্তফাপুর গ্রামের জহিরুল ইসলাম ও সদর উপজেলার বাপ্পী (২০)।
এছাড় অপর দুজন হলেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাজ্জাদ এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার সাইফুল।
জয় তালুকদার সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের বড়াইলবাড়ি গ্রামের পলাশ তালুকদারের ছেলে।
রোববার সকালে বড়াইলবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে আহাজারি করছেন মা লক্ষ্মী তালুকদার। ছেলের মুখ দেখার জন্য সবার কাছে আকুতি জানাচ্ছেন।
সাগরপথে যাত্রা হওয়ার আগে ২২ জানুয়ারি সকালে জয়ের সঙ্গে তার মায়ের মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল বলে স্বজনরা জানান।
ছেলের সঙ্গে সবশেষ বলা কথা স্মরণ করে কেঁদে উঠছেন তিনি।
“আমার বাজানে মরে নাই। ও কইছে, ইতালি গিয়া ফোন দিব। ওরে একবার ফোন দিতে কও। আমি বাজানের মুখটা একটু দেখতে চাই।“
জয়ের বাবা পলাশ তালুকদার পেশায় কাঠমিস্ত্রি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে জয় মেজ।
জয়ের কাকা গোবিন্দ তালুকদার বলেন, “আমার ছেলে প্রদীপ, ভাতিজা জয়সহ আমাগো বাড়ির চার ছেলে এই পথে ইতালিতে যায়। ওরা তিনজন কোনোমতে কষ্টে ইতালিতে পৌঁছালেও জয় পথেই মারা গেল। আমরা ছেলে প্রদীপ জয়ের মৃত্যুর সংবাদ আমাগো জানাইছে।“
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘দালাল‘ জামাল খান বড়াইলবাড়ি এলাকার সোনা মিয়া খানের ছেলে। ইতালিতে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে জামাল সাত লাখ টাকা করে নেন। জয়ের মৃত্যুর খবরের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই।
শনিবার সকালে জামালের বাড়ি গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী জানায়, দীর্ঘদিন ধরে জামাল মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদারীপুর সদর থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা রয়েছে। এই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বের হন। আবার শুরু করেন দালালি পেশা।
পশ্চিম পেয়ারপুর গ্রামের ইমরান হোসেনের বাবা ভ্যান চালক। তিনিও ধারদেনা করে ৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর একই এলাকার সামাদ বেপারী নামে এক দালালের মাধ্যমে গত ২৫ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হন ইমরান।
নিহত ইমরানের চাচা সোবহান হাওলদার (তিনিও ভ্যান চালক) বলেন, “গত ২২ জানুয়ারি সবশেষ ইমরান বাড়িতে ফোন করেছিল। এরপর থেকে গত ৯ দিন ধরে সে নিখোঁজ। আজ শুনতে পেলাম ইমরান মারা গেছে। এখন আমাদের পোলা গেছে পোলা তো পামু না। পোলার লাশটা সরকারের কাছে ফেরত আনার দাবি করছি।“
পেয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লাভলু তালুকদার বলেন, “আমার এলাকায় কিছু দালাল আছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও আছে। বিচার না হওয়ায় দালাল চক্র ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে কিছু টাকা আর ভয়ভীতি দেখিয়ে দালালেরা মীমাংসা করে নেয়। এ কারণে অবৈধপথে বিদেশযাত্রা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।“
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম মিঞা বলেন, “ঠাণ্ডার কারণে ভূমধ্যসাগরে মৃত সাত বাংলাদেশির মধ্যে একজনের বাড়ি মাদারীপুর সদরের বড়াইলবাড়ি বলে আমরা জানতে পেরেছি। তার পরিবারকে থানায় দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দালালের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হবে।“
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, “মাদারীপুরের যে পাঁচ তরুণ ইতালিতে মারা গেছে আমরা তাদের লাশ দেশে আনার জন্য চেষ্টা করছি। ইতালি দূতাবাসের সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলেছে। সেগুলো জমা দিলে আশা করি লাশ ফেরত পাব।“
আরও পড়ুন:
