আদিতমারীতে খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় ব্যাপকভাবে গরুর খুরা রোগ দেখা দিয়েছে।
গত এক সপ্তাহে অন্তত অর্ধশত গরুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানালেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগে তার তথ্য নেই বলে কর্মকর্তারা জানান।
প্রয়োজনের সময় পশুসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলার বড় কমলাবাড়ি, ময়নার চওড়া, দুর্গাপুর শঠিবাড়ি, মহিষখোচা, মহিষাশ্বহর, নামুড়ি ও দৌলজোর গ্রামে বেশি গরু আক্রান্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সুভাষ চন্দ্র, আরতী বালা, নীলকান্তসহ কয়েকজন কৃষক জানান, ১৫ দিন আগে বড় কলাবাড়ি গ্রামের ধীরেন্দ্র নাথের একটি গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরপর একে একে ওই গ্রামের সবার গরুই এ রোগে আক্রান্ত হয়।
তারা জানান, ওই সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে ফোন করে ডাকলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে স্থানীয় হাতুরে চিকিৎসক মন্টু চন্দ্র, শাকাসহ কয়েকজনের ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেন কৃষকরা। কিন্তু তাতেও গরুগুলোকে বাঁচানো যায়নি।
গত এক সপ্তাহে কলাবাড়ি গ্রামের ২০টি গরু খুরা রোগে মারা যায়। এছাড়া আশপাশ গ্রাম থেকে অন্তত ৩০টি গরু মারা যাওয়ার খবর পেয়েছেন বলে তারা জানান।
বড় কমলাবাড়ি গ্রামের কৃষাণি আরতী রানী জানান, তার সম্বল ছিল ছয়টি গরু। হঠাৎ গরুগুলোর মুখে লালা আসে, পায়ে ঘা হয়, খাওয়া বন্ধ করে নেতিয়ে পড়ে। দুয়েকদিনের মাথায় মারা যায় তার তিনটি গরু।
“স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মন্টু প্রতিদিন একটি করে ইনজেকশন দিয়ে তিনশ টাকা করে নেন। কিন্তু ওই ঔষধেও কাজ হচ্ছে না।”
এই চিকিৎসকের খরচ জোগাতে তিনি চরা সুদে ঋণ নিয়েছেন বলে জানান।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন কি না জিজ্ঞেস করলে আরতী বলেন, “হাসপাতালের বড় ডাক্তারকে ডাকিয়াও পাওয়া যায় না। এর আগে একবার আসছিল তার ভিজিট দিতে হয় ৩শ টাকা। হামরা গরিব মানুষ, গরুর ভিজিট দেয়ার টাকা কোনটে পাই।”
আরতীর পাশের পাড়ার আসাদুজ্জামান আশা জানান, উন্নত জাতের দুইটি গাভির হঠাৎ খুরা রোগ দেখা দিলে তিনি ছুটে যান উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে। তাকে গাভি দুটি দেখে আসতে অনুরোধ করলেও তিনি যাননি।
তখন বাধ্য হয়ে স্থানীয় হাতুড়ের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কাজ না হলে পুনরায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে আসার জন্য অনুরোধ করলে তিনি একটি ওষুধ লিখে দেন বলে জানান।
ওই ওষুধ ব্যবহার করেও গাভিটিকে বাঁচাকে পারেননি তিনি। তাই শেষ পর্যন্ত বাকি গাভিটিকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেন বলে জানান আসাদুজ্জামান।
মহিষখোচা গ্রামের রবিউল ইসলাম জানান, অনেক গরুই খুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার একটি গরু আক্রান্ত হয়েছিল। অনেক টাকা খরচ করে কিছুটা সুস্থ করে বাজারে বিক্রি করেছেন।
সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, পুরো এলাকার ক্ষুদ্র খামারি ও গরুর মালিকদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। গরু হারানোর ভয়ে অনেকেই কম মূ্ল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
বড় কমলাবাড়ি গ্রামের গরুর পল্লি চিকিৎসক মন্টু চন্দ্র জানান, তিন মাসের যুব উন্নয়নের মাধ্যমে গরুর প্রজনন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। সেই সনদ নিয়েই তিনি গরুর চিকিৎসক হয়েছেন।
তার চিকিৎসায় অনেক গরু সুস্থ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আদিতমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মামুন উর রশিদ কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বড় কমলাবাড়িতে খুরা রোগে কিছু গরু আক্রান্ত হয়েছে। অফিসে জনবল কম থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তারপরও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন।
“এটা ভাইস জনিত রোগ। সেরে উঠতে একটু সময় লাগবে।”
উপজেলায় কয়টি গরু আক্রান্ত হয়েছে বা কয়টি গরু মারা গেছে তার তথ্য তার কাছে নেই বলে জানান তিনি।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলাম জানান, উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে তার।
তারা আক্রান্ত গ্রামগুলোয় গিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন বলে জানান বলে জানান ইউএনও।
