১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

তাজমিন হত্যা: ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করে হত্যাকারীর বিচার চান

ডাকাতি হলে কেউ গৃহস্থের সম্পদ থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, তবে ধর্ষণের শিকার হলে নারীর বাইরে যাওয়া নিয়ে আঙুল ওঠে কেন?

তাজমিন হত্যা: ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করে হত্যাকারীর বিচার চান

এই ধানক্ষেতে মিলেছিল পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার স্কুলছাত্রী তাজমিনের নিথর দেহ।

শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া

Published : 11 Oct 2026, 06:03 PM

Updated : 11 Oct 2026, 06:03 PM

কারও বাড়িতে ডাকাতি হলে আপনি কি প্রশ্ন করেন, “আপনার কেন টাকাপয়সা আছে? ডাকাতি তো হবেই।” তাহলে কোনো শিশু বা নারী ধর্ষণের ও হত্যার শিকার হলে কেন বলেন, “মেয়েটি রাতে বাইরে ছিল কেন?” এটা হলো ‘ভিকটিম ব্লেমিং’। এ ধরনের ভিকটিম ব্লেমিংয়ের মাধ্যমে আপনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবির পরিবর্তে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধকে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছেন।

বলছি স্কুলছাত্রী তাজমিনের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের কথা। সম্প্রতি কুমিল্লায় সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক তার যাত্রী তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যা করে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ অনাবশ্যক। পুলিশ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে। এখন দরকার ওর কঠোর শাস্তি। এই ধরনের ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার করে দ্রুততর সময়ে শাস্তি বাস্তবায়ন হওয়াটা জরুরি। একের পর এক এই ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বল অবস্থা প্রমাণিত হয়।

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী তাজমিনের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। যারা ভিকটিম ব্লেমিং করছেন— বলছেন কেন সে বাড়ির বাইরে গেল, কেমন অভিভাবক ইত্যাদি— তাদের কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধি বা পেনাল কোডে কোথাও কি লেখা আছে যে একজন কিশোর বা কিশোরী একা কোথাও যাতায়াত করতে পারবে না? একা কারও চলাফেরা করা কি আইনত অপরাধ? আমরা কি এখনও বর্গির হাঙ্গামা বা হার্মাদের তাণ্ডবের আমলে আছি যে, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সবাই বাড়ির ভেতর খিল লাগিয়ে বসে থাকবে? এদেশে কি এখনও ঠগীর উৎপাত চলছে যে একা কোথাও যাওয়া মানেই প্রাণ হারানো?

পনেরো বছর বয়সে ইউরোপ-আমেরিকায় তো বটেই, চীনেও অনেক ছেলে-মেয়ে একা একা বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যায়।

বাংলাদেশে কেন কিশোরী, তরুণীরা একা বাইরে যেতে পারবে না? একজন পূর্ণবয়স্ক নারীও তো এখানে একা নিরাপদ নন। একা একজন পুরুষও তো এখানে চলাফেরা করতে গিয়ে অনেক সময়ই ছিনতাই ও হত্যার শিকার হন।

এ ধরনের অপরাধের মূল কারণ ভিকটিমের চলাফেরা নয়; বরং বিচারহীনতার ধারাবাহিকতা। সুমন একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। সে কেন ভাবলো, একা যাত্রী মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করা যায়? সে এই অপরাধটি অনায়াসেই করলো, কারণ সে দেখেছে এ ধরনের অপরাধ আগেও অসংখ্যবার এদেশে হয়েছে, কিন্তু কারও কোনো শাস্তি হয়েছে বলে সেইভাবে জানা নেই। যদি এর আগের প্রতিটি হত্যা ও ধর্ষণের অপরাধের বিচার এবং অপরাধীর কঠোর শাস্তি হতো, তাহলে আজকে হয়তো তাজমিনরা এভাবে প্রাণ হারাত না। প্রতিটি বিচার না হওয়া অপরাধ আরেকটি নতুন অপরাধের জন্ম দেয়।

শিশু লামিসার হত্যাকারী এখনও বেঁচে আছে। আছিয়া, রিশা এবং আরও আরও অনেক ভিকটিমের হত্যাকারী ও ধর্ষকরা এখনও বেঁচে আছে। তনুর হত্যাকারীদের তো ধরাই যায়নি।

এদেশে কয়টি হত্যা, কয়টি ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে তার শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে?

সুমনের মতো আরও অনেক সম্ভাব্য ধর্ষক ও হত্যাকারী সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা যখন দেখছে চাইলেই একজনকে হত্যা করা যায়, ধর্ষণ করা যায়, তখন সে অনুকূল পরিস্থিতি মনে হলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের ওপর।

কিশোর অপ্রতীমের হত্যার পর অনেকেই অভিভাবকত্বের দোষ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। যেন ছেলেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে দেওয়া বা আইফোন দেওয়া কোনো মারাত্মক অপরাধ! এখন আবার তাজমিনের অভিভাবকদের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছেন কেউ কেউ।

এভাবে কিন্তু অপরাধকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার পথ খুলে যায়। বরং দাবি তোলা উচিত অভিযুক্ত হত্যাকারীর যত দ্রুত সম্ভব বিচার এবং শাস্তি বাস্তবায়নের। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেই কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা দরকার। এর আগে হত্যা, ধর্ষণের মতো ভয়াবহ যত অপরাধ হয়েছে, সেগুলোরও দ্রুত বিচার চাই। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে সেটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়।

‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’— এই প্রবাদবাক্যটি মনে রাখতে হবে। বছরের পর বছর যখন মামলা ঝুলে থাকে, তখন অপরাধীর মনে হয়, বেশ তো ভালোই আছি! আর ভিকটিমের পরিবার একসময় হতাশ হয়ে পড়ে। তারা আর মামলা চালাতে উৎসাহী হয় না।

আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে তার বিচার প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ যে প্রকৃত অপরাধী অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এক ধরনের অবিচার— একথা আমরা সকলেই জানি। সাধারণত ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু দরিদ্র পরিবারের হয়ে থাকে এবং বছরের পর বছর মামলা চালানোর মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। ধর্ষক সাধারণতই ভিকটিমের তুলনায় প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানা রকম ভয়ভীতি দেখায়, মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে এবং অনেক সময় জামিনে বের হয়ে ভিকটিমকে হত্যা করে অথবা ভিকটিমের পরিবারকে গ্রামছাড়া করে। ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়া ভিকটিমের পরিবারকে বোঝানো হয়, মেয়েটি যখন মরেই গেছে, তখন আর শত্রুতা রেখে কী লাভ! গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ধর্ষককে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও প্রচুর। ভিকটিম জীবিত থাকলে গ্রাম্য সালিশে অনেক সময় ধর্ষক ও ভিকটিমের বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়।

ধর্ষণ রোধ করার জন্য প্রয়োজন ধর্ষণ ও নারী-শিশু হত্যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেই প্রকাশ্যে দ্রুত বিচারের আওতায় মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং সেটি দ্রুত কার্যকর করা। একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই ধর্ষক নরপশুদের সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব। নারী নির্যাতন রোধে কঠোর আইন ও শাস্তি দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা সবচেয়ে জরুরি। নারী ও শিশু নির্যাতন যে অতি ঘৃণ্য ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং এজন্য যে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, তা সমাজের সর্বত্র প্রচার করা দরকার। এর ফলে সম্ভাব্য অপরাধীরা শাস্তির ভয়ে কিছুটা হলেও অপরাধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাববে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এবং তা দ্রুত কার্যকর হলে সেটাও সম্ভাব্য অপরাধীদের ভয় দেখাতে সক্ষম হবে।

তাজমিন, অপ্রতীম এবং আরও যেসব শিশু-কিশোর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, তাদের সকলের ধর্ষক ও হত্যাকারীর শাস্তি দাবি করুন। ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করে অপরাধীর বিচারের দাবিতে সকলে প্রতিবাদমুখর হই। সরকারের কাছে দাবি জানাই, বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশে পরিণত করুন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটান। কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চলতে পারে না।

শান্তা মারিয়া: শিক্ষক, বাংলাভাষা বিভাগ, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন। ইমেইল: shantamariavalia@gmail.com