গুলিবিদ্ধ নারীসহ ৫ রোহিঙ্গা নিয়ে শাহপরীর দ্বীপে এল নৌকা

নারীসহ ওই রোহিঙ্গারা ভাসমান নৌকায় অবস্থান করছেন; বিজিবি সদস্যরা তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছেন।

কক্সবাজার প্রতিনিধিটেকনাফ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Feb 2024, 03:21 PM
Updated : 17 Feb 2024, 03:21 PM

যুদ্ধের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে গুলিবিদ্ধ এক নারীসহ পাঁচ রোহিঙ্গাকে নিয়ে ছোট একটি নৌকা ভিড়েছে কক্সবাজারের টেকনাফে; নৌকাটি বিজিবি সদস্যরা ঘিরে রেখেছেন।

শনিবার বিকাল ৫টার দিকে নৌকাটি নাফ নদী পারি দিয়ে গুলিবিদ্ধ নারী, নৌকার মাঝিসহ চার পুরুষ শাহপরী দ্বীপ জেটিতে আসে বলে জানান টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুস সালাম।

গুলিবিদ্ধ নারী মিয়ানমারের নলবনিয়া এলাকার বাসিন্দা হাফেজ আহমদ উল্লাহর স্ত্রী সফুরা খাতুন। হাফেজ আহমদের বড় বোন রমজান বেগম টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আগে থেকেই বসবাস করেন।

রমজান বেগম বলেন, “আমার ছোট ভাই হাফেজের স্ত্রী সফুরা মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সে শুক্রবার সকালে গুলিবিদ্ধ হয়। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য টেকনাফে আনা হলেও বিজিবি তাদের পাড়ে উঠতে দিচ্ছে না।”

দ্বীপের জেটিতে মাছ ধরতে যাওয়া স্থানীয় যুবক রুবেল বলেন, “আমরা জেটিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলাম। এমন সময় একটি নৌকা জেটিতে ভেড়ে। নৌকায় একজন লোককে শুইয়ে রাখা হয়েছে। শুনেছি, তিনি গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা নারী। পরে বিজিবি সেখানে গিয়ে নৌকাটি ঘিরে রাখে।”

একই কথা বলেছেন জেটিঘাটের ঝালমুড়ি বিক্রেতা মো. সেলিম।

এ বিষয়ে বিজিবি কর্তৃপক্ষের কেউ এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে এক কর্মকর্তা বলেন, “নৌকায় গুলিবিদ্ধ নারীর হাতে স্যালাইন লাগানো রয়েছে। বিজিবি সদস্যরা তাদের ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছেন।”

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এ ঘটনার পরপর গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা দ্বীপ জেটিঘাটে ভিড় করছেন। কিন্তু কাউকে সেখানে যেতে দিচ্ছে না বিজিবি।

জেটিঘাটে থাকা স্থানীয় লোকজন বলেন, পাঁচ রোহিঙ্গা শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে এসেছেন। এ পাঁচজন মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী দুজন। আর তিনজন নৌকার মাঝি-মাল্লা বলে দাবি করছে।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নাফ নদীতে ভাসমান নৌকায় অবস্থান করছিলেন।

নাফ নদীর ওপারে বিস্ফোরণের শব্দ

এদিকে শনিবার সকাল ৮টার পর থেকে টানা ২ ঘণ্টা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার পূর্ব ও দক্ষিণাংশের নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। শব্দে কেঁপে উঠেছে সীমান্তের এপারও।

তখন থেকে কিছুক্ষণ পরপর থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে দুপুর পর্যন্ত। সর্বশেষ দুপুর ১টার দিকে বিস্ফোরণের দুটি বিকট শব্দ শোনা যায়। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি।

শাহপরীর দ্বীপের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, দ্বীপের পূর্ব দিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে আসছে এমন বিস্ফোরণের শব্দ।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সালাম বলেন, নাফ নদীর পূর্ব ও দক্ষিণাংশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। যেসব স্থান থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছে, সেখানে রাখাইন রাজ্যের মংডুর শহরের আশপাশের মেগিচং, কাদিরবিল, নুরুল্লাহপাড়া, মাঙ্গালা, নলবন্ন্যা, ফাদংচা ও হাসুরাতা এলাকা অবস্থিত। এসব এলাকায় মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই চৌকি ঘিরেই চলছে এই সংঘর্ষ।

তিনি বলেন, “শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মিয়ানমারের মংডু শহরের আশপাশের প্রচুর গোলাগুলি শব্দ শোনা যায়। তবে রাতভর কোনো ধরনের শব্দ শোনা যায়নি। শনিবার সকাল থেকে কিছুক্ষণ পরপর বিকট শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে। সেই সঙ্গে গোলাগুলির শব্দ কানে ভেসে আসে। দুপুরের পর শব্দ শোনা যাচ্ছে না।”

শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা নবী হোসেন বলেন, শুক্রবার রাতে মিয়ানমার সীমান্ত শান্ত ছিল। কিন্তু শনিবার সকালে বিকট শব্দে এপারের মাটি কেঁপে উঠেছে। এতে তারা ভীত হয়ে পড়েছেন।

বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “হঠাৎ টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিকট শব্দ ও গোলাগুলি খবর পাওয়া গেছে। সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্কের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক স্পিডবোটে টহল দেওয়া হচ্ছে। কোনো অনুপ্রবেশকারীকে ঢুকতে দেওয়া হবে না।”

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, “মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তে বসবাসরত মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।”