Published : 19 Sep 2026, 12:01 AM
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট থেকে যে সংকট শুরু হয়েছিল, তা এ বছর দশম বছরে পড়েছে। একদিকে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আর অন্যদিকে ক্রমে কমতে থাকা আন্তর্জাতিক সহায়তা, এই দুইয়ে মিলে এ সংকট বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এশিয়ার পরাশক্তি ও বৃহৎ দেশ হিসেবে চীন অনেকবারই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ বারবার চীনকে এ সংকট সমাধানে জোরাল ভূমিকার রাখার জন্য অনুরোধ করে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির ডিরেক্টর অব স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস কলামিস্ট ড. আজিম ইব্রাহিম মনে করছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তা করলে চীন বহুমাত্রিকভাবেই লাভবান হতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার আরব নিউজে প্রকাশিত এক কলামে তিনি লেখেন, “প্রায় এক দশক ধরে বারবার প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য আবার আঞ্চলিক কূটনীতির দিকেই ঝুঁকছে। চলতি মাসে ঢাকা ঘোষণা করেছে, তারা চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিকল্পনা করছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জোর দিয়ে বলেছেন, দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এই বাস্তুচ্যুতির চূড়ান্ত সমাধান কেবল রাজনৈতিক পথেই সম্ভব। তবে বাংলাদেশ শুরু থেকেই বলে আসছে, যে কোনো প্রত্যাবাসন অবশ্যই হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, সম্মানজনক এবং টেকসইভাবে।
“এই প্রক্রিয়ায় চীনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। কারণ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশের সঙ্গেই বেজিংয়ের জোরাল সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশেই তাদের বড় আকারের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার প্রত্যক্ষ তাগিদ আছে। এছাড়া বেইজিং বহু বছর ধরে রোহিঙ্গা কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০১৯ সালে তারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া গঠনে সহায়তা করেছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া।
“সুতরাং নতুন করে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল একটি মানবিক সংকট বা বোঝা হিসেবে না দেখে, বরং এমন একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ করে দেয়, যেখানে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ দিন দিন আরও একই বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে।”
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরও স্থিতিশীল হলে চীন একাধিক উপায়ে লাভবান হবে মন্তব্য করে আজিম ইব্রাহিম এর কয়েকটি দিক তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে তিনি বলছেন, “চীন তার আঞ্চলিক সংযোগ ও যোগাযোগ বিস্তারের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে রাখাইন এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বেইজিং ও মিয়ানমার সরকার ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের’ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিয়াউকফিয়ু গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পও আছে।
“এছাড়া মিয়ানমার উপকূলের সঙ্গে চীনকে যুক্ত করা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনগুলো ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলকে বিশাল কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। চলতি বছরের জুনে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং এর চীন সফরকালে দুই দেশের সরকারই এই করিডোর এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
“রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তাই কোনোভাবেই চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে যায় না। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দরকার সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া, কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি, নিরাপদ পরিবহন রুট এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর বিপরীতে ক্রমাগত সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি ঠিক উল্টো পরিবেশ তৈরি করে। ফলে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক সমাধান চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে ব্যাহত করার বদলে বরং আরও পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।”
একই কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মন্তব্য করে তার ভাষ্য, বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি বছরের চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন এখন ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ গঠনের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করছে; যা নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা চলতি মাসেও আবার আলোচনা করেছেন।
এখানেই রোহিঙ্গা সংকট সরাসরি অর্থনৈতিক ভূগোলের সঙ্গে এসে মিলে যায়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্তকারী যে কোনো করিডোরকে এমন একটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে যেতে হবে, যেখানকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এতদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে থমকে আছে। সে জন্য রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে পারে আরও গভীর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার মূল ভিত্তি।
আজিম ইব্রাহিমের মতে, এখানে একটি দরকারি শিক্ষার বিষয় রয়েছে। কারণ মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রায়ই দুটি ভিন্ন নীতিগত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে, দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতি পুরো অঞ্চলের ওপরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চীন এর আগেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করতে পেরেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বেইজিং আগের ত্রিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্কে প্রত্যাবাসন ও সংলাপের পাশাপাশি রাখাইন সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গিটি এখন গভীর বিবেচনার দাবি রাখে।
“শরণার্থীদের শুধু সীমান্ত পার করলেই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রত্যাবাসনের পর সমাজ টিকিয়ে রাখতে মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়। কাজেই অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। সঠিকভাবে রূপরেখা তৈরি করা গেলে, এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে যেখানে রাজনৈতিক সমাধান টেকসই রূপ নেয়।
“এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে চীনের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। খুব কম দেশেরই মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং একই সাথে বড় আকারের অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ সচল করার সক্ষমতা রয়েছে। তাই এই সমন্বয় এমন সব সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, যা কেবল কূটনৈতিক চাপ বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকা অন্য কোনো পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়।”
আজিম ইব্রাহিমের মতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের আরেকটি বড় সুবিধা হল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ। কারণ মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক কারণে সীমিত। কিন্তু বেইজিং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আবার বাংলাদেশের সঙ্গেও তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বেইজিংয়ের সফল কূটনৈতিক মধ্যস্থতা তাদের বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্যগুলোকেও জোরাল করবে বলেও মনে করেন তিনি। আজিম ইব্রাহিম বলছেন, “চীন ক্রমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিপূরক হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে। রোহিঙ্গা সংকট বেইজিংকে তা বাস্তবে করে দেখানোর এমন সুযোগ দিচ্ছে, যা দ্বারা তারা পরীক্ষা করতে পারে তাদের এই মডেলটি ঠিক কতটা কার্যকর।”
রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হলে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া প্রবল চাপ হ্রাস পাবে। সেইসঙ্গে মিয়ানমার তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে স্থিরতা ফিরে পাবে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এই কলামিস্ট বলেন, “এতে চীন আরও নিরাপদ অবকাঠামো, শক্তিশালী আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি এবং উভয় দেশের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুফল ভোগ করবে। বিস্তার ঘটবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের। সর্বোপরি বঙ্গোপসাগর পুরো এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে আরও সমন্বিত ও সংযুক্ত হয়ে উঠবে।”