Published : 27 Aug 2026, 02:41 PM
চাঁদপুরে স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হঠাৎ উধাও হওয়ার বিষয়টি নিয়ে শহরে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সোনার লেনদেন ও ঋণের বোঝার বিষয়টি এসেছে।
১৯ অগাস্ট থেকে শহরের কালীবাড়ী সড়কের ভাড়া বাসায় পরিবারটির ঘর তালাবদ্ধ। পিন্টু দাসের মোবাইল ফোন বন্ধ। শহরের আখন্দ মার্কেটের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে।
এর মধ্যেই কয়েকজন ব্যবসায়ী পিন্টু দাসের কাছে টাকা ও সোনা পাওনা থাকার দাবি করেছেন।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, “পিন্টু দাসের মোবাইল নম্বর ২০ অগাস্টের পর থেকে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তিনি বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন- এমন তথ্য পাওয়া গেছে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, ঋণের বোঝা থেকে বাঁচতে তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে থাকতে পারেন। তবে এটি প্রাথমিক ধারণা। তার অবস্থান খুঁজে বের করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।”
তিনি বলেন, “ব্যবসায়ী আত্মগোপনে গেছেন, নাকি তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে- তা নিশ্চিত হতে পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”
পিন্টু দাসের বাড়ি মূল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায়। তিনি অনেক সময় ধরে চাঁদপুরে আছেন। এখানে তার আত্মীয়বাড়ি রয়েছে। তিনি প্রথমে সোনার দোকানে কাজ করতেন। পরে নিজেই দোকান দেন। কুমিল্লা ও মুদাফফরগঞ্জে পিন্টু দাসের আত্মীয়-স্বজন রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পিন্টু দাস আখন্দ মার্কেটে পাঁচ-ছয় মাস আগে দোকান দিয়েছেন। এর আগে জোরপুকুরপাড় এলাকায় পাঁচ-ছয় বছর এবং নিউমার্কেটে প্রায় তিন বছর তিনি স্বর্ণের ব্যবসা করেছেন।
পিন্টু দাসের মাসতুতো বোন ও চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্ট্রান ছাত্র ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক উপমা দে বলেন, “পিন্টু দাস পরিবার নিয়ে চাঁদপুর শহরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার ওপর ‘ঋণের চাপ’ ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।
“তাকে হুমকি দেওয়ার কথাও শুনেছি। তাই তিনি পরিবার নিয়ে কোথাও চলে গেছেন কি না, সেটিও আমরা নিশ্চিত নই।”
চাঁদপুর শহরের আখন্দ মার্কেটের নিচতলায় ‘এস কে শিল্পালয়ের’ মালিক পিন্টু দাস। তিনি স্ত্রী রিমি দাস, তাদের ছেলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম দাস ও রুপম দাসকে নিয়ে শহরের কালীবাড়ি এলাকায় মদিনা মার্কেট মহল্লায় আবদুল গফুর খানের সৌর ভিলার চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় তাকতেন। তারা সেখানে আট মাস ধরে ভাড়া থাকতেন।
বাড়ি মালিকের ছেলে মোহাম্মদ রাসেল খান শনিবার চাঁদপুর সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে বলা হয়েছে, ১৯ অগাস্ট থেকে পিন্টু নিখোঁজ। পরদিন সকালে তার বাসা তালাবদ্ধ দেখা যায়।
রাসেল খান বলেন, “পিন্টুর মোবাইল বন্ধ, দোকানও বন্ধ। বাসা তালাবদ্ধ থাকায় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে থানায় জিডি করেছি। বাসার মালামাল তিনি নিয়ে গেছেন কিনা, সেটিও আমরা নিশ্চিত নই।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্ক মজুমদার বলেন, পিন্টু দাস ও তার পরিবারের সদস্যদের আসবাবপত্রসহ রাতের আঁধারে বাসা থেকে চলে যেতে দেখেছেন এলাকাবাসী।
সোনা লেনদের তথ্য
পিন্টুর কাছে টাকা পাওনা থাকার দাবি করেছেন শহরের ইচলি এলাকার বাসিন্দা আবুল বারাকাত পাটওয়ারী। তার দাবি, পিন্টুর কাছে তার ছয় লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। সোনার গহনা তৈরি বাবদ লেনদেনের কারণে তিনি এই টাকা পান।
তিনি বলেন, “পিন্টু দাস সম্প্রতি আমাকে তিনটি চেক দিয়েছিল। ছয় লাখ টাকার সেই চেক নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে দেখি, টাকা নেই। এখন তার কোনো খবর পাচ্ছি না। আমি এ বিষয়ে মামলা করব।”
আখন্দ মার্কেটে পিন্টুর দোকানের পাশের নেহা শিল্পালয়ের পরিচালক বাবুল কর্মকার বলেন, “কয়েক দিন ধরে পিন্টুর দোকান বন্ধ। তার কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি সোনা ও টাকার লেনদেন করতেন। গহনা সময়মত সরবরাহ করা নিয়ে তার সঙ্গে কারও কারও বাকবিতণ্ডাও হত। তবে তার আচার-আচরণ ভালো ছিল।”
তিনি বলেন, পিন্টু নিখোঁজ হওয়ার আগে তার এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় কারণে চার দিন দোকান বন্ধ ছিল। এরপর থেকে দোকান আর খোলেননি তিনি।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মানিক পোদ্দার বলেন, পিন্টুর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ক্রেতার লেনদেন ছিল বলে তিনি জানেন।
মানিক পোদ্দারের ভাষ্য, একজন ব্যবসায়ী পিন্টুর কাছে এক ভরি দুই আনা স্বর্ণ পাওনা ছিলেন। পরে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়ে আট আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যবসায়ী এখনও পিন্টুর কাছে আরও ১০ আনা সোনা পাবেন।
মানিক পোদ্দার বলেন, “পিন্টুকে বিভিন্ন সময় অভাব-অনটনের কথা বলতে শুনেছি। তার সঙ্গে অন্য ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদেরও লেনদেন ছিল বলে শুনেছি। তিনি কেন নিখোঁজ হয়েছেন, সেটি তদন্তের পর পুলিশই ভালো বলতে পারবে।”
পিন্টুর আরেক প্রতিবেশী মেসার্স সুখরঞ্জন কর্মকারের পরিচালক অমর কর্মকার বলেন, পিন্টু আখন্দ মার্কেটে বেশিদিন আগে আসেননি। তার সঙ্গে খুব বেশি কথা না হলেও ব্যবহার ভালো ছিল।
অমর কর্মকার বলেন, “পিন্টুর সঙ্গে লোকজনের লেনদেন ছিল। তবে দোকান কেন বন্ধ, বাসা কেন তালাবদ্ধ- এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।”
চাঁদপুর মডেল থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ বলেন, পিন্টু দাসসহ পরিবারের চার সদস্য আত্মগোপন করেছেন বলেই মনে হচ্ছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ‘নিখোঁজ’ হওয়ার খবর ছড়াচ্ছেন। এটি ঠিক না।”
পিন্টু দাসের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও থানায় কেউ আসেনি বা অভিযোগ দেয়নি।
আরও পড়ুন: