Published : 29 Apr 2026, 09:40 AM
গোপালগঞ্জ চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি চক্ষু হাসপাতাল। এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন।
তবে চিকিৎসকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদই শূন্য থাকায় সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে অন্যদের। সেবা গ্রহীতারাও এখানে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ শাহিন ইকবাল বলেন, হাসপাতালটির বয়স ১০ হয়েছে। বেশ কিছু সংকট থাকলেও এর মধ্যে হাসাপাতালটির চিকিৎসাসেবা দেশের বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠির কাছে সমাদৃত হয়েছে।
হাসপাতালের দপ্তর থেকে জানা গেছে, ১০ টাকার টিকেট কেটে খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন বিভাগের মানুষ এখান থেকে চোখের চিকিৎসা গ্রহণ করেন। চোখের প্রায় সব রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ এখানে পাওয়া যায়। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৭৫ রোগীর চোখের অপারেশন করা হয়। ছানিসহ কয়েকটি রোগের অপারেশন বিনামূল্যেই করা হয়।

চিকিৎসকের দুই-তৃতীয়াংশ পদই শূন্য
হাসপাতালটিতে ৯১ চিকিৎসকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৩৭ চিকিৎসক। বাকি ৫৪টিই পদ শূন্য।
এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১১ পদের বিপরীতে মাত্র দুজন, জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১১টি পদের মধ্যে তিনজন আছেন। ইনডোর, আউটডোর ও ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৫৪টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৮ জন কর্মরত।
এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপকের দুটি পদ শূন্য রয়েছে। আবাসিক সার্জন তিনজনের স্থলে রয়েছেন মাত্র একজন। ট্রেনিং লেকচারারের দুটি পদই শূন্য।

দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি
হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বলছেন, ছোটোখাটো সমস্যায় ভালো চিকিৎসা পেলেও অপারেশনের রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার হানোয়ার গ্রাম থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন প্রভাষ চন্দ্র বিশ্বাস (৫৬)। তিনি বলেন, “চোখ দিয়ে পানি পড়ে। কখনো-কখনো ময়লা আসে। এখানে ডাক্তার চোখের নেত্রনালী অপারেশনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ডাক্তার কম থাকায় অপারেশনের তারিখ পেতে দেরি হচ্ছে। এ নিয়ে যশোর থেকে চারবার এ হাসপাতালে এসেছি।”
অবশেষে অপারেশনের তারিখ পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “বুধবার ডাক্তার অপারেশন করবেন বলে জানিয়েছেন। তাই আজ (মঙ্গলবার) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।
“আমার মতো অনেক রোগীকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। অপারেশনের রোগীদের একাধিকবার হাসপাতালে আসতে হয়। শুনেছি চিকিৎসক কম আছে, তাই এ অবস্থা চলছে।”

ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদরদি এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার মাতুব্বর (৭৮) বলেন, “চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছে। তাই ভাঙ্গা থেকে এসে এ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার দেখানোর সময় লম্বা সিরিয়াল ছিল, তাই ডাক্তার দেখাতে দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। ডাক্তার ফ্রি চোখের ড্রপ ও ওষুধ দিয়েছে। ডাক্তার বলেছে, এতে ঠিক হয়ে যাবে।”
খুলনার তেরখাদা উপজেলার কামারোল গ্রামের আশালতা বিশ্বাস (৬০) বলেন, “বাম চোখে কিছুই দেখি না। ডান চোখে ঝাপসা-ঝাপসা দেখি। এতে চলাফেরা করতে সমস্যা হয়। হাসপাতালের লম্বা সিরিয়াল শেষে চোখের ডাক্তার দেখিয়েছি।
“ডাক্তার চোখের বায়োমেট্রিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়েছেন। ডাক্তার আবার আগামী সপ্তাহে আসতে বলেছেন। তারপর অপারেশনের সিরিয়াল দিয়ে দেবেন। শুনেছি অপারেশন করার আগে এখানে বেশ কয়েকবার আসতে হবে।”

স্বল্প খরচের চিকিৎসায় স্বস্তি
অপেক্ষাজনিত কারণে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়লেও স্বল্প খরচে চিকিৎসা পেয়ে সন্তুষ্টির কথাও জানিয়েছেন রোগীরা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ফরিদপুর জেলার শিবচর উপজেলার বহেরাতলা গ্রামের যতীন বিশ্বাস (৬৫) বলেন, “চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসি। পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষে ডাক্তার ছানি শনাক্ত করেন। পরে বিনামূল্যে অপারেশন করে দিয়েছে। তবে চিকিৎসক সংকটে দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে।”
মাত্র ১০ টাকার টিকেট কেটেই সব সেবা পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “হাসপাতালটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি রয়েছে। এখন চোখের আলো ফিরে পেয়ে, আমি খুবই উপকৃত হয়েছি।”
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বড়নাল গ্রামের কামরুজ্জামান কলি (৫৮) বলেন, “রেটিনা বিভাগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়েছি। চিকিৎসক চোখের ড্রপ ও খাবার ওষুধ লিখেছেন। হাসপাতাল থেকে এসব ওষুধ ফ্রি দিয়েছেন।”
চিকিৎসক সংকটে সেবা পেতে একটু দেরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারপরও চিকিৎসা সেবা পেয়ে আমি খুশি। এখন আর হাজার হাজার টাকা খরচ করে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকা-খুলনা যেতে হয় না। চিকিৎসক সংকট নিরসন করলে, সেবার মান আরো বৃদ্ধি পাবে। আমর মতো আরো অনেক অসহায় মানুষ এ সেবা পাবেন।”
হাসপাতালে বসে কথা হয় রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সদরের আব্দুল হালিমের (৫৯) সঙ্গে। তিনি বলেন, “রাজশাহী থেকে ট্রেনে রাতে গোপালগঞ্জ এসেছি। চোখ দিয়ে পানি ও ময়লা আসে। এ সমস্যা নিয়ে সকালে হাসাপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তারের পরামর্শ ভাল লেগেছে। হাসপাতাল থেকে প্রায় ৫০০ টাকা মূল্যের দুটি ড্রপ ফ্রি দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “প্রতিদিন আমাদের রাজশাহী অঞ্চল থেকে অনেকেই ট্রেনে করে এ হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসেন। তারা উপকার পেয়েছেন, জেনে আমিও এসেছি। ট্রেনে এসেছি, তাই ভাড়া সাশ্রয় হয়েছে।”
২০১০ সালে গোপালগঞ্জ শহরের ঘোনপাড়া এলাকায় ১৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ১৪৩ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। ২০১৫ সালের ৩০ জুন নির্মাণ কাজ শেষ হলে ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাসপাতালটির নাম পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নামকরণ করা হয়।
চিকিৎসকসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা সীমাবদ্ধতা-সংকটের মধ্যে দিয়েও হাসপাতালের রেটিনা, শিশু চক্ষু, অকুলো প্লাস্টিক, লো-ভিশন, ভিশন সেন্টার, লেজার ট্রিটমেন্ট, আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র, এমএলওপি কোর্সসহ বিভিন্ন বিভাগ চালু রয়েছে। এ ছাড়া এখানে নিয়মিত ছানিসহ বিভিন্ন রোগের অপারেশন করা হচ্ছে।
এখানে ল্যাবে প্রায়োজনীয় সব পরীক্ষা করা হয়। তবে পাঁচটি ফ্যাকো মেশিন, তিনটি অটো রিফ্লেকটো মিটারসহ কিছু যন্ত্রপাতি আপডেট, রেনভেশন ও নতুন করে সংযোজন করা হলে, এখান থেকেই আন্তর্জাতিক মানের চক্ষু রোগের সেবা দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
গোপালগঞ্জ চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ শাহিন ইকবাল বলেন, ঢাকার বাইরে চক্ষু রোগের সেবায় এটি একটি বড় হাসপাতাল। এখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সহজেই চোখের আধুনিক সেবা পান।
“কিন্তু এখানে মেশিনারিজসহ কিছু সমস্যার পাশাপাশি চিকিৎসক সংকট রয়েছে। এগুলো নিরসনে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত এগুলোর সমাধান হবে। সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।”
গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর বলেন, “গোপালগঞ্জের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার মানে আমূল পরিবর্তন আনতে আমি কাজ শুরু করেছি। চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে সব সমস্যার সমাধান করব। এখান থেকে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন।”